দেশের নির্বাচনী রাজনীতির উত্তাপ এখন আর দেশের সীমানায় আটকে নেই। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা লাখো বাংলাদেশি ভোটারকে ঘিরেও শুরু হয়েছে আগাম রাজনৈতিক প্রস্তুতি। ২০৩১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ইউরোপের প্রবাসী ভোটের মাঠে সাংগঠনিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে জামায়াত ও তাদের জোটসঙ্গী এনসিপি। একদিকে তরুণ প্রজন্মকে টার্গেট করে নতুন রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলছে এনসিপি, অন্যদিকে সামাজিক সংগঠন ও বিভিন্ন কমিউনিটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রবাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ ধরে রাখছে জামায়াত।
এর বিপরীতে ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দেশে এখনো সাংগঠনিক কমিটি গুছিয়ে উঠতে পারেনি বিএনপি। ফলে দলটির অনেক নেতার রাজনৈতিক তৎপরতা সীমাবদ্ধ রয়েছে হোটেল, রেস্টুরেন্ট কিংবা নিজেদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক বৈঠকে। বিএনপির ভেতরকার নেতারাই আশঙ্কা করছেন, এখনই ইউরোপের ভোটারদের নিয়ে পরিকল্পিতভাবে মাঠে না নামলে আগামী নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটে বড় ধরনের সুবিধা নিতে পারে জামায়াত-এনসিপি জোট।
এই আশঙ্কার পেছনে রয়েছে গত নির্বাচনের ভোটের হিসাবও। নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটে জামায়াত পেয়েছে ৪ লাখ ৮৮ হাজার ১১৪ ভোট। মোট প্রদত্ত পোস্টাল ভোটের ৪৫ দশমিক ৮৮ শতাংশই গেছে দলটির বাক্সে। বিএনপি পেয়েছে ৩ লাখ ২২ হাজার ১৪৪ ভোট, যা মোট ভোটের ৩০ দশমিক ২৮ শতাংশ। আর জামায়াতের জোটসঙ্গী এনসিপি পেয়েছে ৫২ হাজার ৮৪০ ভোট বা ৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ।
হিসাব বলছে, জামায়াত ও এনসিপি মিলে প্রবাস থেকে পাঠানো মোট পোস্টাল ভোটের অর্ধেকেরও বেশি পেয়েছে। ফলে আগামী নির্বাচনে প্রবাসী ভোট যে আর ‘প্রান্তিক ভোট’নয়, বরং ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ একটি ফ্যাক্টর হতে পারে—গত নির্বাচনের ফলই তার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইউরোপের তরুণ ভোটেই এনসিপির নজর
এই বাস্তবতা মাথায় রেখে ইউরোপে দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে এনসিপি। দলটির ইউরোপের একাধিক সংগঠক জানিয়েছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে পড়তে যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থী এবং তরুণ পেশাজীবীরাই তাদের প্রধান লক্ষ্য।
এনসিপির কৌশলটি মূলত নতুন প্রজন্মকে কেন্দ্র করে। বিদেশে পড়তে যাওয়া অনেক তরুণ বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আগে সম্পৃক্ত ছিলেন না। তাঁদের রাজনীতিতে আগ্রহী করে বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করতে চাইছে দলটি।
ইতোমধ্যে জার্মানি, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ইতালি, পর্তুগাল, ফিনল্যান্ড ও পোল্যান্ডে কমিটি গঠন করেছে এনসিপি। ইউরোপের অন্য দেশগুলোতেও শিক্ষার্থী ও তরুণ পেশাজীবীদের নিয়ে সংগঠন তৈরির কাজ চলছে। অর্থাৎ নির্বাচনের কয়েক মাস আগে ভোটার খোঁজার বদলে কয়েক বছর আগে থেকেই একটি নির্দিষ্ট প্রজন্মকে রাজনৈতিকভাবে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছে দলটি।
এনসিপির ডায়াস্পোরা অ্যালায়েন্স নেতা ও জার্মানিতে জুলাই আন্দোলনের সংগঠক আরাফাত আলিফ বলেন, ‘আমরা শুধু দিবসকেন্দ্রিক কর্মসূচির মধ্যে নেই। এনসিপিকে জার্মানির পাশাপাশি পুরো ইউরোপে সংগঠিত করার জন্য কাজ করছি। আমরা তরুণদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। আমরা বিশ্বাস করি, জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করে তরুণ প্রজন্ম এনসিপিকেই নিজেদের রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গ্রহণ করবে।’
দলীয় অফিসের বাইরে জামায়াতের সংগঠন
এনসিপি যেখানে নতুন প্রজন্মের দিকে নজর দিয়েছে, সেখানে জামায়াতের কৌশল কিছুটা ভিন্ন। ইউরোপে দলটির কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত সংগঠকদের ভাষ্য, সামাজিক সংগঠন, বিভিন্ন সমিতি ও কমিউনিটি কার্যক্রমের মাধ্যমে তারা দীর্ঘদিন ধরেই প্রবাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করেছে।
গত নির্বাচনে পোস্টাল ভোট চালু হওয়ার পর এই নেটওয়ার্ককে নির্বাচনী প্রচারণায়ও কাজে লাগানো হয়েছে বলে দাবি জামায়াতপন্থী সংগঠকদের।
তাঁদের দাবি, প্রথমবারের মতো পোস্টাল ভোট চালুর সময় দলীয় প্রচারণা ও সাংগঠনিক কাঠামোর আওতায় যতটুকু মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছিল, তার মধ্যেই বিএনপির প্রায় দ্বিগুণ ভোট পেয়েছে জামায়াত। আগামী নির্বাচনের আগে আরও দীর্ঘ সময় হাতে থাকায় সেই সাংগঠনিক যোগাযোগ আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ভোটের পরিসংখ্যানও প্রবাসী ভোটের গুরুত্ব স্পষ্ট করছে। শুধু ইংল্যান্ড থেকে নির্বাচন কমিশনে পৌঁছেছে ১৮ হাজার ১২০টি পোস্টাল ভোট। ইতালি থেকে গেছে ১২ হাজার ১৫২টি। জার্মানি, ফ্রান্স, পর্তুগাল ও স্পেন থেকেও ৫ হাজারের বেশি করে পোস্টাল ভোট এসেছে। মানে কয়েক হাজার মাইল দূরে থাকা এই ভোটারদের একটি অংশও যদি সংগঠিতভাবে কোনো রাজনৈতিক দলের দিকে ঝুঁকে যায়, তা নির্বাচনের সামগ্রিক ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিএনপির বড় দুর্বলতা সংগঠন
এই জায়গাতেই বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বিএনপির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইতালি, পর্তুগাল, জার্মানি ও গ্রিসের মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোতে এখনো দলটির কার্যকর সাংগঠনিক কাঠামো নেই। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক তৎপরতাও অনেকটা বিচ্ছিন্ন।
বিএনপির ইউরোপ শাখার একজন শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘কোথাও বিএনপির কোনো কমিটি নেই। কোনো সাংগঠনিক কাঠামো নেই। যার যার মতো করে বিএনপির নেতারা হোটেল, রেস্টুরেন্টে মিটিং করছেন।’
তার মতে, গত নির্বাচনে জামায়াত যেভাবে সামাজিক সংগঠন ও সমিতির মাধ্যমে প্রবাসীদের কাছে পৌঁছেছে, বিএনপি যদি এখনই যোগ্য ও দক্ষ সংগঠকদের দিয়ে কমিটি না করে, তাহলে আগামী নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটে জামায়াত আরও বড় সুবিধা পেতে পারে।
তিনি বললেন, ‘বিদেশে যারা থাকেন, তারা শুধু প্রবাসী নন—তাঁরা সবাই ভোটার। তাঁদের কিছু ভোটও নির্বাচনের ফলাফল পাল্টে দিতে পারে।’
বিএনপির পাল্টা প্রস্তুতি শুরু
তবে বিএনপি বলছে, সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটাতে কাজ শুরু হয়েছে। ইউরোপের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন খোকন জানিয়েছেন, জার্মানি ও ইতালিতে যোগ্য ও দক্ষ নেতাদের সমন্বয়ে প্রাদেশিক কমিটি গঠনের চেষ্টা চলছে।
তিনি বললেন, ‘খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই কমিটি দেওয়া হবে। এরপর সবার সঙ্গে কথা বলে পুরো দেশের আহ্বায়ক কমিটি নেতারা যেভাবে চান, সেভাবেই দেওয়ার চেষ্টা করব। এছাড়া গ্রিস ও পর্তুগালের কমিটিও দ্রুত দেওয়ার চেষ্টা করছি।’
নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে ইউরোপে শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তোলার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার কাছে দায়িত্ব আমানত। প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া দায়িত্ব পালন করাই আমাদের কাজ। আমরা ইউরোপে নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী কমিটি ও সংগঠন করতে চাই। যে সংগঠন আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপিকে আবারও বিপুল ভোটে সংসদে নিতে সহযোগিতা করবে।’
ভোটের আগে ভোটার দখলের লড়াই
রাজনীতির মাঠে সাধারণত নির্বাচনের কয়েক মাস আগে প্রচারণা শুরু হয়। কিন্তু ইউরোপের প্রবাসী ভোটারদের ক্ষেত্রে সমীকরণটি যেন ভিন্ন। এখানে এখন চলছে ‘ভোটের আগে ভোটার দখলের’ প্রস্তুতি।
এনসিপি তরুণদের নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংগঠন গড়ছে, জামায়াত সামাজিক সংগঠন ও কমিউনিটির মাধ্যমে নিজেদের যোগাযোগ বিস্তৃত করছে। বিএনপিও এখন সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিচ্ছে।
ফলে ২০৩১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের মাটিতে ভোটের লড়াইয়ের পাশাপাশি ইউরোপের বাংলাদেশি কমিউনিটিতেও এক ধরনের রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা তৈরি করতে যাচ্ছে। আর পোস্টাল ব্যালটে কয়েক লাখ ভোটারের সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত দেশের ক্ষমতার সমীকরণে কতটা প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
