বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় মনোনয়ন পেতে পারেন বলে দলে প্রবল আলোচনা আছে। আনুষ্ঠানিকভাবে নাম ঘোষণা করা না হলেও রাষ্ট্রপতি পদে ঘুরেফিরে তাঁর কথাই বলছেন দলীয় নীতিনির্ধারকরা। যদিও দলীয় সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নের সর্বময় ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে অর্পণ করেছে। বিএনপি গতকাল নির্বাচন কমিশন থেকে দুটি মনোনয়নপত্র কিনেছে।
প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য এখন পর্যন্ত মনোনয়নপত্র না কিনলেও গতকাল রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। জোটের অন্যতম শরিক লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রমকে জোটের প্রার্থী করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে ১৩ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত। একাধিক প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট বেলা ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
আলোচনায় এগিয়ে মির্জা ফখরুল : বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া বিএনপির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন দলীয় মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শেষ পর্যন্ত তাঁকেই মনোনয়ন দিতে পারেন বলে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায় মনে করছে। দলীয় কয়েকজন নেতা জানান, দলের দীর্ঘদিনের মহাসচিবকেই রাষ্ট্রপতি পদে মনোনীত করা হবে। এ পদে মির্জা ফখরুলের নামটি অনেকটা নিশ্চিত বলে অনেকের ধারণা।
১ আগস্ট বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটি বৈঠকে রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী মনোনয়নের দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর ন্যস্ত করে। সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির মনোনীত প্রার্থীই দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া কার্যত নিশ্চিত।
দলের শীর্ষ পর্যায়ে কথা বলে জানা যায়, রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়াও ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম, দলীয় জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং ড. আবদুল মঈন খানের নাম আলোচনায় আছে। চারজনই বিএনপিতে পোড় খাওয়া নেতা হিসেবে সমাদৃত।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি, দলের প্রতি আনুগত্য এবং সংকটকালে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতার কারণে উল্লিখিত চারজনের মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম বেশি আলোচিত হচ্ছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় ও আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা সর্বজনবিদিত। বিশেষ করে গত ১৭ বছরের কঠিন সময়ে বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে মির্জা ফখরুলের সক্রিয় ভূমিকার কথা সর্বস্তরে প্রশংসিত। মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করে দলের ভিতরে-বাইরে সমান গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছেন তিনি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একজন পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির রাজনীতিক হিসেবেও মির্জা ফখরুলের আলাদা পরিচিতি রয়েছে। দলীয় প্রধান তারেক রহমানের সঙ্গেও তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্ক রয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ারও অত্যন্ত পছন্দ এবং স্নেহভাজন ছিলেন তিনি। মির্জা ফখরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। পরে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে বিএনপির ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। একই সময়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সহসভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বিএনপির এই মহাসচিব বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০০৯ সালের ডিসেম্বরে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিরোধী দলের মুখপাত্র হিসেবে গণমাধ্যমে তাঁর পরিচিতি আরও বাড়ে। ২০১১ সালের ২০ মার্চ বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর খালেদা জিয়া তাঁকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেন। ২০১৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে তিনি মহাসচিব নির্বাচিত হন। ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁর বিরুদ্ধে ১১১টি মামলা হয়েছে এবং ১১ বার তিনি কারাবরণ করেন।
হাসিনা সরকার দল ভাঙতে মির্জা ফখরুলকে চাপের পাশাপাশি বিভিন্ন সময় নানা প্রলোভনও দেয় বলে দেশের রাজনীতিতে আলোচনা আছে। কিন্তু তাঁকে টলাতে পারেনি। অনেকের মতে, নির্লোভ ফখরুল দলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি। তারেক রহমান লন্ডনে এবং বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে থাকার সময় দেশে দল ও আন্দোলনের দৃশ্যমান নেতৃত্বের অন্যতম মুখ ছিলেন মির্জা ফখরুল। এসব কারণে রাষ্ট্রপতি পদে তাঁর নামই বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আলোচনায়।
জামায়াতের প্রার্থী অলি আহমদ : রাষ্ট্রপতি পদে এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য। গতকাল রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে ১১-দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকের পর এ তথ্য জানান বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
দুটি মনোনয়নপত্র নিয়েছে বিএনপি : রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নিতে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে বিএনপি। গতকাল প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের কার্যালয় থেকে এ মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী একটি করে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন। তবে তাঁরা কার জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ইসি সূত্র জানায়, রাষ্ট্রপতি পদে একই ব্যক্তির নামে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দেওয়ার বিধান আছে। কারণ একটি মনোনয়নপত্রে কোনো ভুলত্রুটি থাকলে যাতে অন্যটি বিবেচনায় নেওয়া যায়। সদ্য বিদায়ি রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের নির্বাচনের সময়ও এমনটা করা হয়েছিল।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেন সংসদ সদস্যরা। সচরাচর ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিজয়ী হন। বিরোধী দল সাধারণত এ পদে প্রার্থী দেয় না। তাই ভোটাভুটির দরকার হয় না। তবে এবার জাতীয় সংসদের বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে।
রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনায় ছয় কমিটি গঠন : নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান সফলভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে ছয়টি কমিটি গঠন করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। গতকাল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ-সংক্রান্ত অফিস আদেশ জারি করা হয়।
এতে বলা হয়, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন গত ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য তফসিল ঘোষণা করেছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি প্রাপ্তির পরিপ্রেক্ষিতে নির্ধারিত দিন, তারিখ, সময় ও স্থানে রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান আয়োজিত হবে। এ শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান যথাযথ মর্যাদায় সুচারু ও সফলভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে এ কমিটিগুলো গঠন করা হলো।
কমিটি মধ্যে রয়েছে- মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব সমন্বয় ও সংস্কার ফারাহ শাম্মীর নেতৃত্বে সমন্বয় কমিটি, প্রশাসন ও বিধি অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. শামীম সোহেলের নেতৃত্বে ডকুমেন্টেশন ও রেকর্ড সংরক্ষণ কমিটি এবং অতিথি তালিকা প্রণয়ন ও আমন্ত্রণপত্র মুদ্রণ কমিটি, সমন্বয় অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ খালেদ হাসানের নেতৃত্বে আমন্ত্রণপত্র বিতরণ ও প্রাপ্তি যাচাই কমিটি, কমিটি ও অর্থনৈতিক অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. হুমায়ুন কবিরের নেতৃত্বে আসন ব্যবস্থাপনা কমিটি, আইন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব ইয়াসমিন বেগমের নেতৃত্বে অভ্যর্থনা কমিটি। নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।