দিনাজপুরের বিরলে রেললাইনে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় পড়ে ছিল ময়না বেগম (৩৫) নামে এক নারীর লাশ। দেহ থেকে হাত বিচ্ছিন্ন। কাঁধ থেঁতলে গেছে। মুখমণ্ডল ট্রেনের চাকায় নিচে পড়ে বিকৃত হয়ে গেছে। লাশ চেনার উপায় নেই। সেই সঙ্গে খণ্ডবিখণ্ড লাশ দেখে আঁতকে উঠবেন যে কেউ। প্রথম দেখায় মনে হবে চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়েছেন ওই নারী। গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায় পুলিশ। ছিন্নবিচ্ছিন্ন লাশে সবই যেন ট্রেনের চাকার আঘাত। প্রথমে পুলিশের ধারণা এটি আত্মহত্যা। কিন্তু লাশের গলায় রশির দাগ দেখে সন্দেহের আবির্ভাব হয় পুলিশের। পরিচয় শনাক্তের পর বেরিয়ে আসে এটি সাধারণ কোনো আত্মহত্যা নয়। পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে ওই নারীকে অন্যত্র নৃশংসভাবে হত্যার পর তাঁর স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন আত্মহত্যার নাটক সাজাতে ফেলে রেখেছিল রেললাইনে।
গত ৩১ মার্চ রাতে ময়মনসিংহের কেওয়াটখালী রেল ব্রিজসংলগ্ন রেললাইন থেকে মাসুদুল হক (৪৫) নামে এক ব্যক্তির ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা করা হয়। কারও বিরুদ্ধে পরিবারের অভিযোগ না থাকায় বিনা ময়নাতদন্তে লাশ হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু তিন সপ্তাহ পরই পরিবার জানতে পারে মাসুদুল হকের সঙ্গে জমিসংক্রান্ত বিরোধ চলছিল তাঁর ভাইদের। ঘটনা নতুন মোড় নেয়। দুইজনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা করে মৃতের ছেলে তৌফিক। লাশের আবার ময়নাতদন্ত করা হয়। যার রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছেন তদন্তকারীরা। পুলিশের ধারণা, এ ঘটনার পেছনেও লুকিয়ে থাকতে পারে লোমহর্ষক কোনো হত্যারহস্য। শুধু এই দুই ঘটনাই নয় গত সাড়ে পাঁচ বছরে এমন বেশ কয়েকটি ঘটনা রয়েছে, যা প্রথমে আত্মহত্যা মনে হলেও পরবর্তী তদন্তে হত্যা মামলায় রূপান্তর হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ড গোপনের হটস্পট হয়ে উঠেছে রেলপথ। অন্যত্র হত্যার পর রাতের আঁধারে লাশ ফেলে যাওয়া হচ্ছে রেললাইনে। ট্রেন গেলে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাচ্ছে লাশ। এতে করে সাক্ষীপ্রমাণের অভাবে অনেক হত্যার ঘটনাই ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে। রেলওয়ে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, গত সাড়ে পাঁচ বছরে রেলপথ ৫ হাজার ৬২৭ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
এর মধ্যে ২৬টি ঘটনা হত্যায় রূপান্তর হয়েছে। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেললাইন থেকে উদ্ধার হওয়া লাশের ময়নাতদন্তে হত্যার আলামত পাওয়া খুবই কঠিন। কারণ লাশের অবস্থা এমন হয়ে যায়, সেখান থেকে খুনের আলামতসংক্রান্ত কোনো কিছু উদ্ধার করা যায় না। এজন্য দুর্বৃত্তরা কাউকে অচেতন করে রেললাইনে ফেলে রেখে হত্যা করতে পারে। আর পুলিশ ভিসেরা পরীক্ষার আবেদন না করায় নিহত ব্যক্তিদের ভিসেরা সংরক্ষণ করে অচেতনের বিষয়টিও পরীক্ষা করা হয় না।
মৃত্যুর কারণ নিয়ে সন্দেহ হলে অনেক চিকিৎসক হত্যা, আত্মহত্যা কিংবা দুর্ঘটনাজনিত-এসব কিছুই উল্লেখ করেন না। রেলওয়ে পুলিশের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, রেললাইনে পাওয়া লাশের মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশই আত্মহত্যা। ১০ শতাংশ অসুস্থতাজনিত কারণে মৃত্যু। আর ৩০ শতাংশ মৃত্যু ঘটছে কানে মোবাইল ফোন বা হেডফোন লাগিয়ে অসচেতনভাবে চলাচলের কারণে। বাকি ১০ শতাংশ হত্যা ও অন্যান্য মৃত্যু। প্রায় ৩ হাজার ২০০ কিলোমিটার রেলপথের ৯৮ শতাংশ এলাকাই রাতে অন্ধকারে ঢাকা থাকে। অনেক এলাকা থাকে নির্জন। আর এই সুযোগটাই নিচ্ছে অপরাধীরা।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন অপরাধ কমাতে হলে লাইন ঘেঁষে সিসি ক্যামেরা ও বাতি স্থাপন এবং সচেতনতা জরুরি। রেলওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘কিছু কিছু ক্ষেত্রে হত্যাকাণ্ড ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে রেললাইনে লাশ ফেলে দেওয়া হয়। আমরা তদন্ত করছি, খুনের ঘটনায় জড়িত আসামিদের গ্রেপ্তার করছি। ট্রেন এবং রেলপথের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আমরা সর্বদা তৎপর রয়েছি।’
পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অন্য অপরাধ : হত্যা গোপনই নয়-রেললাইনে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডাকাতি, চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ। তৎপর রয়েছে পকেটমার ও অজ্ঞান পার্টির সদস্যরাও। রেলওয়ে পুলিশের পরিসংখ্যানও বলছে অপরাধের অভয়রণ্য হয়ে উঠেছে রেলপথ। পরিসংখ্যান বলছে, গত সাড়ে পাঁচ বছরে রেলের বিভিন্ন অপরাধের মামলা হয়েছে ৩ হাজার ৭৭১টি। এর মধ্যে ২০২১ সালে ৪৫৯টি, ২০২২ সালে ৭৮৬টি, ২০২৩ সালে ৬৪৭টি, ২০২৪ সালে ৬৪৫টি, ২০২৫ সালে ৮৫১টি এবং চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত ৩৮৩টি মামলা হয়েছে।
উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে ডাকাতি ও চুরির ঘটনা। ২০২১ সালে মাত্র সাতটি ডাকাতির ঘটনা ঘটলেও শুধু ২০২৫ সালেই (গত বছর) ৫৩টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। আর চলতি বছরের ছয় মাসেই ১৭টি ডাকাতি হয়েছে। গত বছর চুরির ঘটনা ঘটেছে ১৫২টি। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ৫৮টি চুরির ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়াও গত সাড়ে পাঁচ বছরে ১ হাজার ৬৭৩টি মাদক মামলা, ৯৯টি চোরাচালান মামলা, ৭৯টি হত্যাকাণ্ড, অস্ত্র আইনে ৩৮টি, নারী নির্যাতন ৮২টি, শিশু নির্যাতন ১৬টি ও অন্যান্য ৮৫৭টি মামলা দায়ের হয়েছে।