Image description
সংবিধান সংস্কার ইস্যু

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন শেষ হয়েছে গত বুধবার। তবে বাজেট আলোচনাকে ছাপিয়ে এই অধিবেশন জুড়ে সংসদ উত্তপ্ত ছিল সংবিধান সংস্কার, জুলাই সনদ তথা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি, সীমান্তে পুশইন, মদ ও জুয়া (নিষিদ্ধকরণ) বিলসহ নানা ইস্যুতে। সংবিধান সংস্কার ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ইস্যুতে দুই মেরুতে অবস্থান নিয়ে সরকার ও বিরোধী দল। এই ইস্যুতে তাদের মধ্যে বাড়ছে দূরত্ব। গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবিতে অনড় বিরোধী জোট। তবে সরকারি দলের তরফে বলা হয়েছে, বিদ্যমান সংবিধানে এমন কোনো পরিষদের অস্তিত্ব নেই।

গণভোটের রায় বাস্তবায়নে বিরোধী দল দ্বিতীয় যে শপথটি নিয়েছে সেটি অবৈধ। তাই বিএনপি’র স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার করতে হবে। আর সংবিধান সংস্কার করতে হলে অবশ্যই সংবিধান সংস্কার পরিষদের কমিটিতে আসতে হবে। এসব ইস্যুতে একাধিবার তুমুল বিতর্ক হয় সংসদে। শেষে বিরোধী দলের প্রতিনিধি ছাড়াই সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিশেষ কমিটি গঠিত হয়। এর প্রতিবাদে সংসদে থেকে ওয়াকআউট করে বিরোধী দল। এসব বিতর্ক জিইয়ে রেখেই শেষ হয়েছে দ্বিতীয় অধিবেশন। এ অধিবেশনে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পাসের পাশাপাশি বিল পাস হয়েছে ১০টি। সংসদীয় কমিটি গঠন হয়েছে ১১টি। এ ছাড়া কার্য উপদেষ্টা কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে অধিবেশনে ২৬ কার্যদিবসে মোট ৪৮ ঘণ্টা ৫১ মিনিট আলোচনা হয়। এতে অংশ নেন ৩১৬ জন সংসদ সদস্য।

গণভোটের রায় ও সংবিধান সংস্কার ইস্যু: সংসদে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কার ইস্যুতেই মূলত মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে। বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, সরকার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করেছে। জনগণের অভিপ্রায় ও মতামতকে কোনোভাবেই অগ্রাহ্য বা অপমান করা উচিত নয়। গণভোটের গণরায়কে পাশ কাটিয়ে যদি সংবিধান সংশোধনী কমিটি গঠন করা হয়, তাহলে সেটি তারা গ্রহণ করবেন না। বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, প্রায় ৬৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ গণভোটে যে মতামত দিয়েছেন, সেটিকে এভাবে উপেক্ষা করা হলে ভবিষ্যতে জনগণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারাবে। জনগণের রায়কে অসম্মান করার প্রতিবাদে তারা শুধু কমিটিতে অংশ নেবেন না। জবাবে সরকারি দলের পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন সংস্কার আদেশ’ রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে জারি করা হয়েছে।

এটি সংবিধানের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ এবং আদালতে বিচারাধীন বিষয়ও রয়েছে। তাই সংসদের বাইরে বিকল্প কোনো কাঠামোর মাধ্যমে সংবিধান পরিবর্তনের সুযোগ নেই। তিনি বলেন, সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইন প্রণয়ন ও সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের এবং ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনগণ সেই ক্ষমতা সংসদকে দিয়েছে। ফলে সংবিধান সংশোধনের একমাত্র বৈধ পথ সংসদীয় প্রক্রিয়া। তিনি আরও বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হলেও আগে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। সংসদ যদি ভবিষ্যতে সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিধান সংযোজন করে, তখন সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হবে।

সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি গঠন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে প্রধান করে সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি গঠন হয়েছে। বিরোধীদল এই পরিষদে নাম না দেয়ায় প্রস্তাবিত ১৭ সদস্যের মধ্যে ১২ সদস্যের বিশেষ এই কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্যান্য সদস্যরা: আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, বিএনপির চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম, এমপি জয়নাল আবেদীন, মীর হেলাল উদ্দিন, ফারজানা শারমিন, শাকিলা ফারজানা, মাহমুদুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের জুনায়েদ আবদুর রহিম সাকী, বিজেপির আন্দালিভ রহমান পার্থ, গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. অলিউল্লাহ। বিরোধী দলের জন্য ৫টি পদ খালি রাখা হয়েছে। বিরোধী দল বিশেষ কমিটিতে যোগ দিতে চাইলে যেকোনো সময় নাম অন্তর্ভুক্তির সুযোগ রাখা হয়েছে।

তাড়াহুড়ো করে আইন পাস: অধিবেশনের শেষ দিনগুলোতে আইনপ্রণয়নে সময় না দেয়া এবং কোনো নোটিশ ছাড়া সম্পূরক এজেন্ডায় বিল পাস করার ইস্যুতে সংসদ উত্তাল হয়ে ওঠে। বিশেষ করে কোনো স্থায়ী কমিটির যাচাই-বাছাই ছাড়াই মাত্র ৩০ মিনিটে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ বিল, ২০২৬’ পাস এবং ‘বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় বিল’ ও ‘পাবলিক এক্সামিনেশন বিল’ উত্থাপন করায় বিরোধী দল এর তীব্র প্রতিবাদ জানায়। সংসদ সদস্যদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ না দিয়ে এভাবে আইন পাসের প্রক্রিয়াকে অধিকার লঙ্ঘন আখ্যা দিয়ে বিরোধী দল সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে।

জাতীয় ইস্যুতে ঐক্যের বার্তা: ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারের পুনরুত্থানসহ জাতীয় ইস্যুতে ঐক্যের বার্তা দিয়েছে সরকার ও বিরোধী দল। দুই পক্ষই ফ্যাসিবাদী শক্তিকে ফিরতে না দেয়ার ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ থাকার ঘোষণা দিয়েছে। অধিবেশনের শেষদিন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, সংসদের রীতি অনুযায়ী আমাদের মধ্যে মতভিন্নতা থাকবে, তবে শত্রুতা নয়। প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের পরিবর্তে থাকবে ন্যায়পরায়ণতা। বাংলাদেশ আর যাতে কখনো কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদ-স্বৈরাচার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে এবং এই প্রিয় মাতৃভূমি আর যাতে তাঁবেদারি রাষ্ট্রে পরিণত না হয়- সেই প্রশ্নে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে জাতীয় ঐক্য অটুট থাকবে। কোনোভাবেই কোনো ধরনের চরমপন্থা বা উগ্রবাদকে প্রশ্রয় দেবে না। এ সময় সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে সমর্থন ও সাধুবাদ জানান।