অর্থনীতি নিয়ে বড় স্বপ্ন আছে। আছে প্রতিশ্রুতিও। কিন্তু বিনিয়োগে গতি নেই। বিনিয়োগ থমকে থাকায় নতুন কর্মসংস্থানের আশায় দিন গুনছে লাখো তরুণ। ইতিহাস বদলে দেওয়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল কথাই ছিল কর্মসংস্থান। আর কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মূল শর্ত হলো দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো। কিন্তু দেশে বিনিয়োগসংক্রান্ত তিনটি সূচকই বলছে ভিন্ন কথা। বর্তমানে দেশে বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণ আশঙ্কাজনক হারে কমছে। একইভাবে কমছে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো অনিশ্চয়তা। সেই অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। অর্থমন্ত্রীর ‘সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতিবিবৃতি’তে সেই অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকিগুলোর কথা তুলে ধরা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই দেশে বিনিয়োগে বড় কয়েকটি সমস্যা রয়েছে। এগুলো হলো-জ্বালানি সংকট, দুর্নীতি, ঋণের উচ্চ সুদ, নানা ধরনের করের চাপ, ডলারের ঘাটতি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং সরকারের অবৈজ্ঞানিক নীতি। এসব বাধা দূর করতে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় কিছু ঘোষণা আছে। কিন্তু ঘোষণা বাস্তবায়নের সক্ষমতা নেই। তবে সরকার বলছে, বিনিয়োগ বাড়াতে তারা ব্যাপক পরিকল্পনা নিয়েছে।
জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, বর্তমানে বিনিয়োগে চরম মন্দা চলছে। আর এই মন্দার প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়েছে। অর্থনীতি এখন খাদের কিনারায়। তিনি বলেন, বক্তৃতা-বিবৃতিতে অনেক কথা বলা যায়। কিন্তু দেশের বিদ্যমান বাস্তবতা মানতে হবে। বর্তমানে দেশের অর্থনীতি বিপদে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে আছে অর্থনীতি। বাজেটে সবচেয়ে বড় ব্যয় ঋণের সুদ পরিশোধ। পুঁজি সংগ্রহের খাতগুলো নষ্ট হয়েছে। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীরা ভরসা পাচ্ছে না। এটি যে কোনো দেশের অর্থনীতির জন্য অস্বাভাবিক। তিনি বলেন, এ অবস্থায় বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো সবচেয়ে জরুরি।
সরকারের বিদ্যমান নীতি-কাঠামো বজায় থাকলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে না। এটি একেবারে পরিষ্কার বিষয়। তিনি আরও বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে হলে সরকারকে নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। প্রথমত বর্তমানে শিল্পঋণের সুদের হার খুব বেশি। এই হারে সুদ দিয়ে মুনাফা সম্ভব নয়। ফলে মানুষ কেন বিনিয়োগ করবে? এছাড়াও সাধারণ মানুষের হাতে টাকা নেই। আর এই অবস্থা বহাল থাকলে বিনিয়োগকারীরা আগ্রহী হবেন না, এটিই স্বাভাবিক। প্রবীণ এই অর্থনীতিবিদ বলেন, অবস্থার উত্তরণে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। সহজভাবে বললে, সরকার নিজেই বিনিয়োগে নেতৃত্ব দেবে।
জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর যুগান্তরকে বলেন, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশে অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, তা অস্বীকার করা যাবে না। আমরা এই সমস্যা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। তিনি বলেন, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা পর্যাপ্ত জ্বালানি নেই। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এই সমস্যা আরও বাড়িয়েছে। আমরা জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশে জ্বালানি মজুতসহ বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছি। এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে বিনিয়োগকারীরা এর সুফল পাবেন।
দ্বিতীয়ত বিনিয়োগের আরেকটি সমস্যা হলো অর্থায়নের অভাব। এই সমস্যা দূর করতে আমরা বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছি। ইতোমধ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি উদ্ভাবনী অর্থায়ন স্কিম বা প্যাকেজ এনেছি। ব্যবসা ও লজিস্টিকসকে সচল করতে চট্টগ্রামের লজিস্টিক হাব উন্নয়ন এবং বন্ধ কলকারখানা দ্রুত চালু করার জন্য প্রথম দিন থেকে ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। মুদ্রা ও রাজস্বনীতির মধ্যে একটি চমৎকার সমন্বয়ের উদ্যোগ নিয়েছি। বেকারত্বের অভিশাপ দূর করতে শিক্ষাব্যবস্থাকে আমূল বদলে কারিগরি, বহুভাষিক শিক্ষা এবং ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ আইডিয়া চালু করা হচ্ছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে বিনিয়োগ পরিবেশ ফিরে আসবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি দেশের বিনিয়োগের চিত্র তিনটি সূচক থেকে পাওয়া যায়। কোনো দেশে বিনিয়োগ হলে প্রথমত বেসরকারি খাতের ঋণ বিতরণ বাড়বে। দ্বিতীয়ত মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি বাড়বে। তৃতীয়ত শিল্পের কাঁচামাল আমদানি বাড়বে। কিন্তু সূচকগুলোর বাস্তবতা একেবারেই হতাশাজনক। বর্তমানে সব সূচকই নেতিবাচক। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ। সর্বশেষ চলতি বছরের মে মাসে তা ৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে মে মাস পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণের স্থিতি ১৮ লাখ ২৫ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা। আগের বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের মে মাসে এই স্থিতি ছিল ১৭ লাখ ৪৭ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশেরও কম।
এর মানে হলো বিনিয়োগকারীরা ঋণ নিচ্ছে না। একই চিত্র মূলধনী যন্ত্র ও শিল্পের কাঁচামালে। গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে মূলধনী যন্ত্র আমদানির এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ১৩৭ কোটি মার্কিন ডলার। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ১৫৩ কোটি ডলার। অর্থাৎ ৯ মাসে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে ১০ দশমিক ৪৩ শতাংশ। একই সময়ে (জুলাই-মার্চ) শিল্পের কাঁচামাল আমদানির জন্য এলসি (ঋণপত্র) নিষ্পত্তি হয়েছে এক হাজার ৭১৪ কোটি ডলার। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল এক হাজার ৮১২ কোটি ডলার। অর্থাৎ আলোচ্য সময়ে কাঁচামাল আমদানি ৫ দশমিক ৪২ শতাংশ কমেছে। এর মানে হলো তিনটি সূচকই বলছে, দেশে বিনিয়োগ কমছে। বছরে ২০ লাখ লোক শ্রমবাজারে আসছে। কিন্তু কর্মসংস্থান নেই। একের পর এক বন্ধ হচ্ছে শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এতে কর্মসংস্থানের বাজার আরও সংকুচিত হচ্ছে।
সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) অবস্থা সবচেয়ে ভয়াবহ। যদিও ২০২৫ সালে নিট এফডিআই আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩৯ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর পরও এই বিনিয়োগ জিডিপির তুলনায় মাত্র দশমিক ৪৫ শতাংশ। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কোনো দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ রিপোর্টকে অনেক গুরুত্ব দেয়। এই রিপোর্টের মূল কথা হলো সহজে ব্যবসা করার সূচক। বর্তমানে ১৯০টি দেশের মধ্যে এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৮তম। অর্থাৎ এখানে চাইলে সহজে ব্যবসা করা যায় না।
এই রিপোর্টে বাংলাদেশে ব্যবসার ক্ষেত্রে ছোট বড় ১৭টি প্রতিবন্ধকতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে সবার আগে সামনে এসেছে দুর্নীতি। এছাড়াও উল্লেখযোগ্য হলো-প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতি, ঋণের উচ্চ সুদের পরও পুঁজি মিলছে না, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। কিন্তু এর কোনো সমস্যারই সমাধান হয়নি। বাংলাদেশের জন্য এটি অনেক পুরোনো গল্প। তবে সরকার এ অবস্থার পরিবর্তনের কথা বলছে। আর আগামী কয়েক বছরে জিডিপির ২.৭ শতাংশ এফডিআই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
এদিকে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে বিনিয়োগ বাড়াতে নানা পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই বৈশ্বিক সংকট সামনে আসে। এবারের বাজেটেও ইশতেহারের প্রতিফলন আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে।
জানতে চাইলে ইভেন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) যুগান্তরকে বলেন, বিনিয়োগের জন্য স্থিতিশীলতা দরকার।
এজন্য সবাই রাজনৈতিক সরকারের অপেক্ষা করেছিল। এখন রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। এতে অনেক সমস্যা তৈরি হয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকিতে পড়েছে। ঋণের সুদ উচ্চ, বিশ্ববাজারে শিল্পের কাঁচামালের দাম বেড়েছে। বাড়ছে মূল্যস্ফীতি, সরকারের উন্নয়ন বাজেট কমছে। অর্থনীতিতে চাহিদা কমে আসছে। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রবৃদ্ধি নিয়ে আর কেউ চিন্তা করছে না।
কীভাবে টিকে থাকা (সারভাইভ করা) যায়, সবাই সে চেষ্টা করছে।
অর্থনীতির ইতিহাস বলে, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম কিংবা চীনের মতো দেশগুলো দ্রুত শিল্পায়নের মাধ্যমে অর্থনীতির আকার বাড়িয়েছে। তাদের সাফল্যের পেছনে ছিল দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, নীতির ধারাবাহিকতা এবং বেসরকারি খাতকে কেন্দ্র করে প্রবৃদ্ধির কৌশল। বাংলাদেশও সেই পথেই হাঁটতে চায়। সেক্ষেত্রে বড় প্রশ্ন হলো বিনিয়োগের ইঞ্জিন পূর্ণগতিতে চলবে কিনা। এর জবাব মিলবে আগামী কয়েক বছরের বিনিয়োগ পরিবেশ, সংস্কারের গতি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার সক্ষমতার ওপর।