Image description
স্থানীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থিতা

কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের পদধারী নেতাকর্মীদের স্থানীয় সরকার (সিটি, পৌরসভা এবং জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদ) নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য করার প্রস্তাব দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। এসব নির্বাচনের প্রস্তাবিত আচরণ বিধিমালায় এমন বিধান যুক্ত করতে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) চিঠি দিয়েছে দলটি। চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘সরকার কর্তৃক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো রাজনৈতিক দলের পদধারী বা সক্রিয় নেতাকর্মীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করার বিধান সংযোজন করতে হবে।’ ইসির কর্মকর্তারা জানান, এ ধরনের সুপারিশ যুক্ত করা হলে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। তারা আরও জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমন বিধান যুক্ত করেছে এএমএম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন বর্তমান কমিশন। ফলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ওই নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। অবশ্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় প্রতীকে হওয়ার যুক্তিতে আচরণ বিধিমালায় ওই বিধান যুক্ত করার বিষয়ে ইসি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার যুগান্তরকে বলেন, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। ওই আইন অনুযায়ী এই দলটির নেতাকর্মীরা নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবে না। আমরা নির্বাচন কমিশনকে ওই বিষয়টি জানিয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে মতামত দিয়েছি। তিনি বলেন, ইসি এ বিষয়ে পদক্ষেপ না নিলে যে পরিস্থিতি তৈরি হবে তার দায় কমিশনকে নিতে হবে।

সূত্র আরও জানাচ্ছে, প্রস্তাবিত আচরণ বিধিমালার বিষয়ে বিকল্পধারা বাংলাদেশ, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ আরও কয়েকটি দল বিভিন্ন সুপারিশ দিয়েছে। একইভাবে এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক ইসির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. মোহাম্মদ জকরিয়া, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবি, ইউএন ওমেন, অ্যাকশন এইড, নির্বাচন কর্মকর্তা ও বিভিন্ন ব্যক্তিও তাদের প্রস্তাব ইসিতে জমা দিয়েছেন। এসব প্রস্তাবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মেয়র ও চেয়ারম্যানদের শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক ও কাউন্সিলর ও সদস্যদের যোগ্যতা এসএসসি বা সমমান হওয়ার সুপারিশ করেছে ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ। এছাড়া নির্বাচনে কোনো প্রার্থীর পক্ষে বা বিপক্ষে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান-এনজিও’র ভূমিকা বন্ধের বিধান যুক্তের প্রস্তাব করেছেন ড. মোহাম্মদ জকরিয়া। আর মনোনয়ন বাণিজ্য বন্ধের বিধান যুক্ত এবং আচরণবিধি লঙ্ঘনে প্রার্থিতা বাতিলের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করার বিষয়ে জোর দিয়েছে টিআইবি। তবে ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপিসহ বেশির ভাগ নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল কোনো সুপারিশ ইসিতে জমা দেয়নি। খসড়া আচরণ বিধিমালার ওপর সুপারিশ জমা দেওয়ার সময় গত ৩০ জুন শেষ হয়েছে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, আমাদের প্রস্তাবিত আচরণ বিধিমালার ওপর বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল, প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও সংগঠন থেকে বিভিন্ন ধরনের সুপারিশ পেয়েছি। ওইসব সুপারিশ ইসির কর্মকর্তারা যাচাই-বাছাই করছেন। আগামী মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনের একটি সভা হওয়ার কথা রয়েছে। ওই সভায় এসব সুপারিশ উপস্থাপন করা হবে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অযোগ্য করার দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার কমিশনের। কমিশন সভার সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত কিছু বলা যাচ্ছে না।

জানা গেছে, আগামী অক্টোবরে স্থানীয় সরকারের কয়েকটি স্তরে নির্বাচন করতে চায় ইসি। আগস্টের শেষে বা সেপ্টেম্বরে এসব নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে। শুরুতে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে এই নির্বাচন সামনে রেখে ইসি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করবে না। এ কারণে সিটি, পৌরসভা এবং জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের খসড়া আচরণ বিধিমালার ওপর মতামত নিয়েছে ইসি।

আরও জানা গেছে, জামায়াতে ইসলামী তাদের মতামতে নির্বাচনি প্রচারে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী-সংসদ-সদস্যসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের প্রভাব বিস্তারে নিষেধাজ্ঞার বিধান আরও স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছে। কোনোভাবে মন্ত্রী ও সংসদ-সদস্যরা যাতে নির্বাচনে প্রচারণা চালাতে না পারেন, সেই বিধান যুক্তের প্রস্তাব দিয়েছেন তারা। প্রায় একই ধরনের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ। দল দুটি বলেছে, আচরণ বিধিমালায় যে বিধান রয়েছে তা স্পষ্ট নয়। নির্বাচনের সময়ে মন্ত্রী ও সংসদ-সদস্যরা যাতে নিজ এলাকায় অবস্থান না করেন সেই বিষয়ে বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে। ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের নির্বিঘ্ন দায়িত্ব পালনের বিধান রাখারও দাবি জানিয়েছে জামায়াত, খেলাফত মজলিস ও ইসলামিক ফ্রন্ট।

এছাড়া স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে নিযুক্ত প্রশাসকদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার বিধান যুক্ত করা, নির্বাচনি প্রচারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারে আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রতিটি ওয়ার্ডে মহিলা সদস্যপদে সরাসরি নির্বাচন আয়োজন করা এবং সংরক্ষিত মহিলা সদস্যপদ বাতিল করা ও আচরণবিধি লঙ্ঘনে যার প্রার্থিতা বাতিল হবে-তাকে আপিলের সুযোগ দেওয়ারও সুপারিশ করেছে জামায়াতে ইসলামী।

ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ প্রার্থী হওয়ার ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা বেঁধে দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। এছাড়া অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, ঋণখেলাপি, দুর্নীতিবাজ ও টাকা পাচাকারীদের নির্বাচনে অযোগ্য করা এবং প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে সেনা মোতায়েনসহ বিভিন্ন দাবি জানিয়েছে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় প্রার্থিতা বাতিলের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ রাখা, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ রাখাসহ কয়েকটি প্রস্তাব দিয়েছে গণতন্ত্রী পার্টি। পাশাপাশি নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা, ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন এবং নির্বাচন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখাসহ কয়েকটি সুপারিশ করেছে দলটি।

সংস্থা, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির সুপারিশ : আচরণ বিধিমালার বিষয়ে বেশ কিছু সুপারিশ করেছেন এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক ইসির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. মোহাম্মদ জকরিয়া। তিনি নির্বাচনি প্রচারে কোনো প্রার্থীর পক্ষে বা বিপক্ষে এনজিও যাতে কোনো ভূমিকা রাখতে না পারে সেই বিধান যুক্তের প্রস্তাব করেছেন। তার অন্য প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে-কোনো প্রার্থীর পক্ষে বা বিপক্ষে ভোটারদের প্রভাবিত করতে জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল নম্বর ও মোবাইল ব্যাংকিং নম্বর সংগ্রহ এবং জান্নাত-জাহান্নাম, স্বর্গ-নরক ও পীর-ফকিরের নামে নির্বাচনি প্রচার বন্ধের বিধান যুক্ত করা।

জানতে চাইলে ড. মোহাম্মদ জকরিয়া যুগান্তরকে বলেন, সংসদ নির্বাচনে বেহেশতের টিকিট বিক্রি করতে দেখেছি। বাড়ি বাড়ি গিয়ে এনআইডি নম্বর সংগ্রহ করতে দেখেছি। কিছু এনজিও বিভিন্ন দল ও প্রার্থীর পক্ষে-বিপক্ষে কাজ করে। এসব বাস্তবতার ভিত্তিতে আচরণ বিধিমালা সংশোধনের সুপারিশ করেছি।

এদিকে নির্বাচনে ব্যয়ের স্বচ্ছতার ওপর জোর দিয়েছে টিআইবি। প্রতিষ্ঠানটি প্রস্তাবিত আচরণ বিধিমালার কয়েকটি ধারার অস্পষ্টতাও তুলে ধরেছে। সুপারিশে কোনো প্রার্থীর পক্ষে-বিপক্ষে নির্বাচনি প্রচারে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও বেতার ব্যবহার বন্ধের প্রস্তাব করেছে। এছাড়া নির্বাচনি ব্যয় মনিটরিং, বিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় প্রার্থিতা বাতিল করার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং হলফনামার তথ্য যাচাইসহ বিভিন্ন ধরনের সুপারিশ করেছে।