Image description

এমপিদের চাহিদার আলোকে বিভিন্ন এলাকায় ২০৪টি সেতু নির্মাণে আট হাজার কোটি টাকার রাজনৈতিক মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ (এলজিডি)। ‘উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রাম সড়কে দীর্ঘ সেতু নির্মাণ’ প্রকল্পের মাধ্যমে সরকারি দল বিএনপির এমপিদের এলাকায় এই ২০৪টি সেতু নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

নির্বাচনের আগে এই প্রকল্পের মাধ্যমে মাত্র ৬৩টি সেতু করার কথা থাকলেও এখন ২০৪টি সেতু নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৯৭টির এখনো কোনো সমীক্ষাই হয়নি। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক সেতুর অবস্থান, প্রয়োজনীয়তা, কারিগরি উপযোগিতা কিংবা ব্যয় সম্পর্কে প্রয়োজনীয় সমীক্ষা হয়নি। তার আগেই প্রায় আট হাজার কোটি টাকার প্রকল্পটি অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

যদিও এলজিইডির দাবি, পরবর্তী সময়ে এসব সেতুর সমীক্ষা করে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী, জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩১ মেয়াদে সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য সাত হাজার ৯৫৫ কোটি ৪৮ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় মোট ৪৩ হাজার ৮২ মিটার দীর্ঘ ২০৪টি সেতু নির্মাণের পাশাপাশি কক্সবাজারের টেকনাফ ও গাজীপুর সদর এলাকায় দুটি আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

ডিপিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০৪টি সেতুর মধ্যে ৯৭টির জন্য নতুন করে সমীক্ষা পরিচালনা করতে হবে।

সমীক্ষা শেষে প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতেই এসবের বাস্তবায়ন করা হবে। অর্থাৎ প্রকল্প অনুমোদনের সময়ও প্রায় অর্ধেক সেতুর চূড়ান্ত কারিগরি ও অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি হয়নি।

প্রকল্পটির ইতিহাস বেশ কয়েক দফা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। ২০১৩ সালে দীর্ঘ সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তারপর পৃথক একটি প্রকল্পে আটটি বিভাগের ৩০টি জেলার ৪৮টি উপজেলায় ৭৪টি সেতুর সমীক্ষা, নকশা ও ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়।

এর ভিত্তিতে ২০২৩ সালে ৩৮টি সেতু নিয়ে প্রায় তিন হাজার ৯৫২ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়। পরে প্রকল্পটি কয়েক দফা পুনর্গঠন করা হয়। ২০২৫ সালে ৬৩টি সেতু নিয়ে সংশোধিত ডিপিপি পাঠানো হলেও ২০২৬ সালে নির্বাচনের পর আবার নতুন করে ১৯৩টি সেতু যুক্ত হয়। এতে মোট সেতুর সংখ্যা বেড়ে ২০৪টিতে এবং প্রকল্প ব্যয় সাত হাজার ৯৫৫ কোটি ৪৮ লাখ টাকায় দাঁড়ায়।

প্রকল্পের আওতায় থাকা ৪৭ জেলার ১০৮ উপজেলার তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এর মধ্যে ১০৫টি উপজেলায়ই সরকারদলীয় সংসদ সদস্য রয়েছেন। মাত্র তিনটি উপজেলায় বিরোধী দলের সংসদ সদস্য। অন্যদিকে যোগাযোগ অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা থাকা সত্ত্বেও প্রকল্পের বাইরে রাখা হয়েছে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ সাতক্ষীরা এবং দারিদ্র্যপ্রবণ রংপুর ও কুড়িগ্রামের মতো পিছিয়ে থাকা জেলাগুলোকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অবকাঠামো প্রকল্পে এলাকা নির্বাচন হওয়া উচিত প্রয়োজন, সম্ভাব্যতা ও জনস্বার্থের ভিত্তিতে। কিন্তু তুলনামূলকভাবে বেশি প্রয়োজন থাকা কিছু জেলা বাদ পড়া এবং সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের এলাকার আধিক্য প্রকল্পটির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে দীর্ঘ সেতু নির্মাণ অবশ্যই প্রয়োজনীয়। তবে সমীক্ষা শেষ হওয়ার আগেই প্রায় আট হাজার কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদনের উদ্যোগ সুশাসন ও উন্নয়ন পরিকল্পনার দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নের জন্ম দেয়।

উন্নয়ন বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার এই প্রকল্প থেকে সফলতা পেতে চাইলে তাকে প্রকল্প বাস্তবায়নে আরো গুরুত্ব বাড়াতে হবে। ডিপিপিতে দেওয়া পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শেষ করতে হবে। জমি অধিগ্রহণের বিষয়গুলো দ্রুত সমাধান করতে হবে। স্থায়ী পরিচালক নিয়োগ দিতে হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে প্রকল্পে বরাদ্দ ও টেন্ডার যথাসময়ে করতে হবে। তা না হলে আগের প্রকল্পগুলোর মতোই হবে। তিন বছরের প্রকল্প শেষ করতে ১০ বছর লেগে যাবে।

পরিকল্পনা বিভাগের সাবেক সচিব মামুন আল রশীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, আগে প্রকল্প অনুমোদন দিয়ে পরে সমীক্ষা করলে সেই সমীক্ষা নিরপেক্ষ থাকে না; বরং প্রকল্পের ব্যয়কে বৈধতা দেওয়ার জন্যই তা পরিচালিত হয়। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও কারিগরি বিশ্লেষণের ভিত্তিতে প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ করা উচিত। তা না করে আগে থেকেই ব্যয় নির্ধারণ করা হলে সেটির কোনো বাস্তব ভিত্তি থাকে না। এ ছাড়া প্রকৃত প্রয়োজনের বদলে রাজনৈতিক বিবেচনায় বা নির্দিষ্ট এলাকার মানুষকে সন্তুষ্ট করতে প্রকল্প নেওয়া হলে তা জনস্বার্থের পরিবর্তে জনগণের অর্থের অপচয় ডেকে আনবে।

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের (এলজিডি) পরিকল্পনা, পরিবীক্ষণ, মূল্যায়ন ও পরিদর্শন অনুবিভাগের মহাপরিচালক মাহমুদুল হাসান বলেন, যেসব সেতুর সমীক্ষা ও নকশা সম্পন্ন হয়েছে, সেগুলোর কাজ অনুমোদনের পরই শুরু করা যাবে। বাকি ৯৭টি সেতুর সমীক্ষা প্রকল্পের আওতায়ই সম্পন্ন হবে এবং সমীক্ষা শেষে পর্যায়ক্রমে নির্মাণকাজ শুরু হবে।

তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে গড় ইউনিট ব্যয়ের ভিত্তিতে প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। বিস্তারিত নকশা ও সমীক্ষা শেষে ব্যয়ে যৌক্তিক পরিবর্তন আসতে পারে, যা স্বাভাবিক।