Image description

নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের ছেলে খায়রুল ইসলাম সজীবের বিরুদ্ধে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজির অভিযোগ থাকার পরও পুলিশ তাকে কোনো মামলা ছাড়াই মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দিয়েছে।

রোববার তাকে ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে আটকের পর গভীর রাতে এই রহস্যজনক মুক্তি দেওয়া হয়। একজন এমপির ছেলেকে অপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকার পরও এভাবে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে এখন তীব্র সমালোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সরোয়ার আহমেদ এই ঘটনার সমালোচনা করে বলেন, চাঁদাবাজির মতো আমলযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে এফআইআর দায়ের করে তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো উচিত ছিল। তদন্তে দোষী না প্রমাণিত হলে পুলিশ আসামিকে অব্যাহতি দিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে পারত। তা না করে, পুলিশ একজন আসামিকে ওসির মাধ্যমে মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া অস্বাভাবিক ও আইনের লঙ্ঘন।

সজীবকে ছিলেন নারায়ণগঞ্জ যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক। তাকে আটক ও তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠার পর যুবদল থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এর আগে তিনি জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক পদে ছিলেন।

স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সজীবের বাবা আওয়ামী লীগ আমলে সোনারগাঁও উপজেলার চেয়ারম্যান থাকার সময় থেকেই সেখানে সজীবের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা শুরু হয়। ছাত্রদল ও যুবদলের পদধারী নেতা এবং জনপ্রতিনিধি বাবার পরিচিতির কারণে সজীবের একটি বড় কর্মী বাহিনী রয়েছে, যাদের অনেকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিসহ নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আছে।

সোনারগাঁওয়ে মেঘনা গ্রুপসহ বিভিন্ন বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কারখানা রয়েছে। মান্নান উপজেলা চেয়ারম্যান থাকার সময় থেকেই সজীব ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগ ছিল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার বাবা এমপি হওয়ার পর এই অভিযোগ আরও বাড়ে।

এর মধ্যে সিদ্ধিরগঞ্জ ইপিজেড ও পোশাক কারখানার ঝুট ব্যবসা জোর করে নিয়ন্ত্রণ করত সজীবের কর্মীরা। চাঁদা দিতে রাজি না হলে কারখানার মালবাহী গাড়ি আটকে রাখা হতো, যা নিয়ে নারায়ণগঞ্জের অনেকগুলো শিল্পগোষ্ঠীই চরম বিরক্ত।

সোনারগাঁও থানার একজন কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি সজীব একটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর মালিকের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করেন। দাবি পূরণ না হওয়ায় তিনি ওই শিল্পপতির গাড়ি আটকে রেখেছিলেন। পরে সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ করেন।

এই শিল্পগোষ্ঠীটি মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ কি না—সেই প্রশ্নে ওই পুলিশ কর্মকর্তা কিছু বলতে রাজি হননি। তবে শিল্পগোষ্ঠীটির একজন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, তাদের কোম্পানির গাড়ি আটকানো হয়েছিল।

এ ঘটনার পর ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও নারায়ণগঞ্জ ডিবির যৌথ দল সজীবকে আটক করে। নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিবি) হাসিনুজ্জামান জানান, চাঁদাবাজির সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে সজীবকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে ঢাকায় ডিএমপির ডিবি কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।

রোববার দুপুরে আটকের পর বিকাল ৫টার দিকে তাকে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এবং রাতে ঢাকায় আনা হয়।

কিন্তু আইনের স্বাভাবিক গতি রাতে হঠাতই থমকে যায়। জানা গেছে, ঘটনার রাতে এমপি আজহারুল ইসলাম মান্নান ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সমঝোতা বৈঠকে বসেন। এরপর গভীর রাত ২টার দিকে ডিবি কার্যালয় থেকে সজীবকে মুচলেকায় ছেড়ে দেওয়া হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মুচলেকায় মুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, এমপির পুত্র আইনের ঊর্ধ্বে নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রয়োজন মনে করায় তাকে নিয়েছিল। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পরও প্রশ্ন উঠছে, যদি তিনি আইনের ঊর্ধ্বে না-ই হবেন, তবে মামলা না করে কেন তাকে মাঝরাতে ছেড়ে দেওয়া হলো?

তবে মুচলেকাটি কী নিয়ে দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ প্রশাসনের কেউ স্পষ্ট করে কিছু বলছেন না। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী বলেন, এটি ডিএমপি বলতে পারবে, আমার কাছে তথ্য নেই। আবার ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম এটিকে ‘অফিসিয়াল ডকুমেন্ট’ অজুহাত দেখিয়ে তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান।

তবে ডিবির আরেক কর্মকর্তা জানান, মুচলেকায় লেখা রয়েছে যে তদন্তের প্রয়োজনে ডাকলে সজীব আসতে বাধ্য থাকবেন। সজীবের বিরুদ্ধে আগে যেসব মামলা ছিল তার অধিকাংশ প্রত্যাহার ও নিষ্পত্তি হয়েছে, অন্যগুলোতে তিনি জামিনে আছেন।

সজীবের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ সম্পর্কে সোনারগাঁও থানার ওসি গোলাম সারোয়ার বলেন, ‘হয়তো অভিযোগ থাকতে পারে আগে, আমি নতুন এসেছি। আমার কাছে কেউ অভিযোগও করেনি। আর আমরা তাকে ধরিনি, কেউ আমাদেরকে কিছু জানায়ওনি।’

অভিযোগের বিষয়ে কথা বলার জন্য খায়রুল ইসলাম সজীবের ফোনে চেষ্টা করা হলে তার দুটি নম্বরই বন্ধ পাওয়া যায়। তার বাবা এমপি আজহারুল ইসলাম মান্নানও ফোন কেটে দেওয়ায় তার কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।