Image description

২৩ জুন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। তবে এবার দলটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আবহ সম্পূর্ণ ভিন্ন। নজিরবিহীন এক রাজনৈতিক সংকটে আবর্তিত আওয়ামী লীগ।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রথমে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। পরে বিএনপি ক্ষমতায় এসে পুরো দলই নিষিদ্ধ করেছে। সারা দেশে দলের নেতাকর্মীদের ধরপাকড় চালাচ্ছে পুলিশ।

বর্তমানে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের অনেকে প্রবাসে, অনেকে কারাগারে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ের প্রায় সব স্তরের নেতারা আত্মগোপনে। এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক অঙ্গনে ও জনমনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আওয়ামী লীগ কি আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে? নাকি চিরতরে হারিয়ে যাবে দেশের ইতিহাসের অন্যতম প্রধান এই রাজনৈতিক শক্তি?

গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকায় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ গঠনের মধ্য দিয়ে এই দলের যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধারণ করে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে নামকরণ হয় ‘আওয়ামী লীগ’।

বাহান্নর ভাষা আন্দোলন, ৫৪-র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৫৬-র শাসনতন্ত্র আন্দোলন এবং ৬২-র শিক্ষা আন্দোলনে অগ্রভাগে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগ। ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া ঐতিহাসিক ‘ছয় দফা’র ধারাবাহিকতায় বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয় দলটি। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ এবং ১৯৭১ সালে শেখ মুজিবের আহ্বানে ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগঠিত হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের অধীনে ৯ মাসের সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ।

 সংকট ও পুনরুত্থান

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের স্থপতি রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর আওয়ামী লীগের ওপর প্রথম বড় বিপর্যয় নেমে আসে। দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে মুজিব কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আবার ক্ষমতায় ফেরে আওয়ামী লীগ। তবে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনকাল দলটির জন্য যেমন ছিল উন্নয়ন ও অর্জনের, তেমনই এটিই ডেকে আনে তাদের চরম বিপর্যয়।

দলটির শাসনকালের শেষ বছরগুলোতে ব্যাংক খাতের চরম অব্যবস্থাপনা, হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি এবং মেগা প্রজেক্টের আড়ালে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ ওঠে। দেশের অর্থনীতিতে একটি বিশেষ সিন্ডিকেট তৈরি হয়, যা বাজার ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে ধ্বংস করে। পাশাপাশি ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের বিতর্কিত ও একতরফা নির্বাচনগুলোর মাধ্যমে দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। জনগণের ভোটাধিকার হরণের এই প্রক্রিয়া দলটিকে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

একই সাথে বিরোধী মত দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যথেচ্ছ ব্যবহার, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং গোপন বন্দিশালার প্রকাশ দলটির ভাবমূর্তিকে আন্তর্জাতিকভাবে মারাত্মক ক্ষুণ্ন করে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচার গুলি এবং কয়েক শ’ মানুষের মৃত্যুর ঘটনা দলটির নৈতিক ভিত্তি ধসিয়ে দেয়। এরই চূড়ান্ত পরিণতিতে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।

বর্তমান সংকট ও বাস্তবতা

বিগত সরকারগুলোর আমলেও আওয়ামী লীগ বহুবার সংকটে পড়েছে, নেতাকর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন হয়েছে। কিন্তু এবারের সংকট অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে গভীর ও মৌলিক।

প্রথমত, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পর বর্তমান বিএনপি সরকার দলটিকে আইনগতভাবে নিষিদ্ধ করায় দলটির প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, দলের শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যন্ত প্রায় সব স্তরের নেতৃত্ব হয় দেশের বাইরে, নয়তো কারাগারে বা আত্মগোপনে থাকায় দল পরিচালনার জন্য কোনো দৃশ্যমান চেইন অব কমান্ড বা সমন্বয়কারী নেই। তৃতীয়ত, জুলাই-আগস্টের সহিংসতা এবং দীর্ঘদিনের দুঃশাসনের কারণে সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের মধ্যে দলটির প্রতি চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ রয়ে গেছে।

এছাড়াও আওয়ামী লীগের ‘সামান্য চেনা-পরিচিত’ নেতাকর্মীদের ধরপাকড় চালাচ্ছে পুলিশ। দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিককে সামনে রেখে পুলিশের এই তৎপরতা বহুগুণ বেড়ে গেছে। ফলে আড়ালে-আবডালেও দল পুনর্গঠনের কাজ করতে পারছেন না নেতাকর্মীরা।

আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কী?

তবে একটি দল নিষিদ্ধ হলেই তার আদর্শ বা বিশাল সমর্থক গোষ্ঠী রাতারাতি বিলীন হয়ে যায় না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এবং ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে।

প্রথমত, এটি নির্ভর করছে নেতৃত্বের সংস্কার ও আত্মোপলব্ধির ওপর। আওয়ামী লীগ যদি তাদের অতীত ভুল, দুর্নীতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো স্বীকার করে জনগণের কাছে ক্ষমা না চায়, তবে তাদের গ্রহণযোগ্যতা ফিরে পাওয়া অসম্ভব। শেখ হাসিনা-পরবর্তী নতুন ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতৃত্ব সামনে আসতে পারবে কি না, তা এখন একটি বড় প্রশ্ন।

দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তির, বিশেষ করে ভারত ও পশ্চিমা বিশ্বের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আওয়ামী লীগ নিজেদের কতটা প্রাসঙ্গিক রাখতে পারে, তার ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করছে।

তৃতীয়ত, বর্তমান বিএনপি সরকারের পারফরম্যান্স এখানে বড় ভূমিকা রাখবে। নতুন সরকার দেশের অর্থনীতি ও আইনশৃঙ্খলা কতটা স্থিতিশীল রাখতে পারবে—তার ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করবে। সাধারণত ক্ষমতাসীন দলের ব্যর্থতা বা রাজনৈতিক মেরুকরণ দীর্ঘমেয়াদে বিরোধী শক্তিকে পুনরুত্থানের সুযোগ দেয়।

এছাড়া সরকারও জানে এখনো আওয়ামী লীগের বিশাল জনসমর্থন আছে। তাই অতিমাত্রায় দমনপীড়নে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেলে বিস্ফোরণোম্মুখ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও সরকারের বিবেচনায় রাখতে হবে।

কোনো সন্দেহ নেই যে, স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত আওয়ামী লীগের নাম। কিন্তু দলটির দীর্ঘদিনের একনায়কতান্ত্রিক মনোভাব এবং শেষ সময়ের চরম সহিংসতা তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে। আইনি নিষেধাজ্ঞা এবং নেতৃত্বের শূন্যতার কারণে নিকট ভবিষ্যতে দলটির প্রকাশ্যে ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা ক্ষীণ।

তবে আওয়ামী লীগ যদি নিজেদের খোলনলচে বদলে সম্পূর্ণ নতুন ও গণতান্ত্রিক ধারায় পুনর্গঠিত করতে পারে এবং দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক সমীকরণে কোনো বড় পরিবর্তন আসে, তবেই হয়তো তারা দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আবার রাজনীতিতে ফেরার চেষ্টা করতে পারে। তা না হলে নিষিদ্ধ দল হিসেবে আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকতে হতে পারে দেশের অন্যতম প্রাচীন এই দলটিকে।