সংকট-সংগ্রাম-নেতৃত্বে দেড় দশক ধরে ‘অতন্দ্রপ্রহরী’ হিসেবে বিএনপি মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করে আসছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। হিসাব বলছে, তিনি বিএনপির সবচেয়ে দীর্ঘকালের মহাসচিব। দলের আগামী কাউন্সিলে এই পদে যে পরিবর্তন আসছে, তা এখন অনেকটাই নিশ্চিত।
তাহলে কে হচ্ছেন বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব? দলের অভ্যন্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপির অষ্টম মহাসচিব হিসেবে মোটাদাগে আলোচনায় রয়েছেন তিনজন। তারা হলেন- স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন এবং সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
দিনক্ষণ চূড়ান্ত না হলেও চলতি বছরের ডিসেম্বর সামনে রেখে জাতীয় কাউন্সিলের প্রস্তুতি শুরু করেছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। এ লক্ষ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদারের পাশাপাশি সারা দেশে জেলা, উপজেলা ও তৃণমূল পর্যায়ের কমিটি গঠন এবং পুনর্গঠনের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
দীর্ঘ এক দশক পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া দলের সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল ঘিরে নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। আর সেই আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দলের শীর্ষ নেতৃত্বে সম্ভাব্য পরিবর্তনের প্রশ্ন, বিশেষ করে মহাসচিব পদে নতুন মুখ আসার সম্ভাবনা।
পরবর্তী মহাসচিব কে হবেন, তা নিয়ে বিএনপির অভ্যন্তরে যেমন আলোচনা চলছে, তেমনি রাজনৈতিক অঙ্গনেও চলছে নানা বিশ্লেষণ।
আলোচনায় থাকা তিন নেতারই রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা। তারা প্রত্যেকেই ছাত্রদলের সাবেক নেতা এবং জিয়া পরিবারের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত। একই সঙ্গে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছেও তারা গ্রহণযোগ্য বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
বর্তমান সরকারে তিনজনই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন। সালাহউদ্দিন আহমদ দায়িত্ব পালন করছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে, ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন আর রুহুল কবির রিজভী মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও শিল্পবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তিন সম্ভাব্য প্রার্থীর মধ্যে সালাহউদ্দিন আহমদের নামই সবচেয়ে বেশি আলোচিত। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তার প্রভাব এবং তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিতি তাকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। জাতীয় স্থায়ী কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে দলের বিভিন্ন কৌশলগত সিদ্ধান্ত প্রণয়নে ভূমিকা রেখে আসছেন।
অন্যদিকে, অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনকে সংগঠক হিসেবে মূল্যায়ন করেন বিএনপি নেতারা। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি, বিভাগীয় সমাবেশ ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড সফলভাবে বাস্তবায়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। মাঠপর্যায়ে তার গ্রহণযোগ্যতাও রয়েছে। প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খােলদা জিয়ার চিকিৎসাসেবায় নিজেকে সদা নিয়োজিত রাখায় তিনি জিয়া পরিবারেরও বিশ্বস্ত সঙ্গী।
রুহুল কবির রিজভীকে দলের নেতাকর্মীরা ‘ত্যাগী নেতা’ হিসেবেই বেশি মূল্যায়ন করেন। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে সক্রিয় উপস্থিতি, মামলা-হামলা মোকাবিলা এবং দলের দুঃসময়ে দৃঢ় অবস্থানের কারণে নেতাকর্মীদের কাছে তিনি বিশেষভাবে জনপ্রিয়। তবে শেষ পর্যন্ত এই তিনজনের বাইরেও অন্য কোনো নেতার নাম সামনে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিএনপির সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, প্রতি তিন বছর অন্তর কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও দীর্ঘ সময় ধরে সরকারবিরোধী আন্দোলন, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং সাংগঠনিক ব্যস্ততার কারণে তা সম্ভব হয়নি বলে দলটির নেতারা জানিয়েছেন। সেই কাউন্সিলের মাধ্যমেই দলের সপ্তম মহাসচিব নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এর আগে তিনি সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০১১ সালের ১৬ মার্চ তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর তিনি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান এবং পরে স্থায়ীভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মহাসচিব হিসেবে মির্জা ফখরুলের পুরো সময়টিই ছিল বিএনপির জন্য কঠিন ও চ্যালেঞ্জের। একদিকে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে ছিলেন, অন্যদিকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান অবস্থান করছিলেন লন্ডনে। ফলে দেশের ভেতরে কার্যত দলের প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন মির্জা ফখরুল। বারবার কারাবরণ, রাজনৈতিক চাপ ও প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে সক্ষম হন এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্বের পরিচয় দেন।
প্রায় দুই দশক পর বিএনপি আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে। বর্তমানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন মির্জা ফখরুল। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, ‘আমি খুবই ক্লান্ত। আগামী কাউন্সিল পর্যন্ত থাকতে হচ্ছে। কাউন্সিলের পর অবসর নিতে চাই। আমার অনেক বয়স হয়ে গেছে, অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি।’
দলীয় অঙ্গনে আরও একটি আলোচনা জোরালো হয়েছে— অবসরের পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখা যেতে পারে। যদিও এ বিষয়ে দলীয়ভাবে এখনো কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়নি।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত সাতজন নেতা মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব ছিলেন অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। এরপর পর্যায়ক্রমে দায়িত্ব পালন করেন মোস্তাফিজুর রহমান, কে এম ওবায়দুর রহমান, আবদুস সালাম তালুকদার, আবদুল মান্নান ভূঁইয়া, খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী সাইয়েদুল আলম বাবুল বলেছেন, দীর্ঘদিন পর জাতীয় কাউন্সিল সামনে রেখে সারা দেশে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কমিটি গঠন, পুনর্গঠন এবং আংশিক কমিটিগুলো পূর্ণাঙ্গ করার কাজ চলছে। এর মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বললেন, বাজেট নিয়ে দল এখন ব্যস্ত রয়েছে। উপযুক্ত সময়ে কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে। তার মতে, এখন নতুনদের যুগ। তরুণ নেতৃত্বকে সামনে নিয়ে আসার সময় এসেছে। নতুন ও পুরনো নেতৃত্বের সমন্বয়ে একটি সুন্দর ও কার্যকর কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তবে মহাসচিব পদে পরিবর্তন আসবে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে সেলিমা রহমান বললেন, ‘সে ব্যাপারে দল এবং দলের চেয়ারম্যানই সিদ্ধান্ত নেবেন।’