ব্যাংকের উচ্চ সুদহার, তারল্য সংকট এবং সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের কারণে বেসরকারি খাত পর্যাপ্ত অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এর ফলে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি কমে গেছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে। ব্যাংক ঋণের সংকোচন ব্যবসা-বাণিজ্যকে দুর্বল করে দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা।
গতকাল রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত বাজেট সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এ সংলাপের আয়োজন করে। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিগত সরকার নিজেদের স্বার্থে প্রায় ১ হাজার ৩০০ প্রকল্প গ্রহণ করেছিল, যার অনেকগুলোই বর্তমান সরকার বাতিল করেছে। তবে যেসব প্রকল্পের ৮০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে সেগুলোর কাজ চলবে। তিনি বলেন, অনেক প্রকল্পই বাস্তবে জনগণের তেমন কোনো কাজে আসছে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংস্কার প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এনবিআর এমন একটি সমস্যা, যার সমাধান আমাদের করতেই হবে। নীতি প্রণয়নের জন্য একটি পৃথক সংস্থা এবং ব্যবস্থাপনার জন্য আরেকটি সংস্থা গঠন করা হবে।’
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি বলেন, ‘যেমন চলছে তেমনই চলবে’-এ ধরনের সংস্কৃতি আর রাখা হবে না। প্রকল্পের শুরু থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সময় ও ব্যয়ের সীমা নির্ধারণ করা হবে। কোথায় বিলম্ব হচ্ছে এবং কেন হচ্ছে তা চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বাজেট একদিকে অর্থনৈতিক দলিল, অন্যদিকে সামাজিক অঙ্গীকারের দলিল। এখন প্রয়োজন বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ এবং প্রতি তিন মাস অন্তর অগ্রগতি পর্যালোচনা। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ সংকট এবং মধ্যবিত্তের দুর্বলতা মোকাবিলায় বাজেটে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘বাজেট শুধু বরাদ্দের দলিল নয়, এটি একটি জীবন্ত নথি হওয়া উচিত।’ জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, অবাস্তব রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ও উচ্চ বাজেট ঘাটতির কারণে প্রস্তাবিত বাজেট প্রশ্নবিদ্ধ। সরকারের অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণ বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। মধ্যবিত্তের ওপর করের চাপ বৃদ্ধি এবং কৃষি খাতে পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দেওয়ার ফলে অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় কাক্সিক্ষত ব্যয় নিশ্চিত করতে হলে জিডিপির প্রায় ২৩ শতাংশ ব্যয় প্রয়োজন, যেখানে বর্তমানে তা ১৩ শতাংশের কাছাকাছি। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে দারিদ্র্য ৭ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব, তবে বাস্তবায়ন ঝুঁকি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি ও বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনা বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট, উচ্চ সুদহার, ব্যাংক ঋণ সংকোচন এবং এনবিআর সংস্কারের ধীরগতি ব্যবসা খাতকে দুর্বল করে দিচ্ছে। ইতোমধ্যে বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। কর্মসংস্থান রক্ষা এবং বিদ্যমান শিল্প টিকিয়ে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান এবং গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মন্টু ঘোষসহ অন্যরা।