টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে তিস্তা নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এরই মধ্যে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে অন্তত ৩ হাজার পরিবার। এ ছাড়া রংপুরে শংকরদহ মহিপুর তিস্তা সেতু রক্ষা বাঁধে ভাঙন দেখা দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর তীররক্ষা বাঁধেও ধস নেমেছে। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
লালমনিরহাট : তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় তীরবর্তী চরাঞ্চলের মানুষের ঘরবাড়িতে পানি প্রবেশ করেছে। লালমনিরহাটের পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল রায় জানিয়েছেন, এরই মধ্যে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে অন্তত ৩ হাজার পরিবার। তিনি বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে।
সূত্র জানায়, গতকাল দুপুর ১২টায় ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানিপ্রবাহ বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। এর আগে সকাল ৬টায় পানির স্তর ছিল বিপৎসীমার ৩৫ সেন্টিমিটার নিচে। শনিবার একই সময়ে তা ছিল ১৩ সেন্টিমিটার নিচে। ফলে পানি বাড়া-কমার এ প্রবণতায় উদ্বেগ বেড়েছে নদী তীরবর্তী মানুষের মধ্যে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তিস্তার পানি বাড়ায় কালীগঞ্জের, শৈলমারী, নোহালী, আমিনগঞ্জ, আদিতমারীর মহিষখোচা, বালাপাড়া, গোবর্ধন, সদরের কালমাটি-চরাচপুর, চর হরিণ, হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী, দোয়ানী, সানিয়াজান, সিঙ্গিমারী, সিন্দুর্না, পাটিকাপাড়া ও ডাউয়াবাড়ি ইউনিয়নের বিভিন্ন চরের প্রায় ৩ হাজার পরিবারের ঘরবাড়িতে পানি প্রবেশ করেছে। পাশাপাশি নিম্নাঞ্চলের বাদাম খেত, আমন ধানের বীজতলা, মিষ্টিকুমড়াসহ নানা ফসল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
চর সিন্ধুনার ওমর আলী জানান, ভোর থেকে ঘরে পানি প্রবেশ করেছে, স্ত্রী সন্তান নিয়ে বিপাকে রয়েছেন। চর বালাপাড়া গ্রামের আক্কাস মিয়া বলেন, হঠাৎ ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। চরম বিপাকে পড়েছি। তিস্তাপাড়ের কৃষক সুমন মিয়া বলেন, তিস্তার পানি বাড়ছে-কমছে। এতে আমরা আতঙ্কে আছি। পানি আরও বাড়লে আমন ধানের বীজতলার চারা নষ্ট হয়ে যাবে। চর ইসলির বাসিন্দা লেবু মিয়া বলেন, হঠাৎ ঘরে পানি প্রবেশ করেছে, পাশাপাশি চরে আবাদ করা সবজি খেতগুলো তলিয়ে গেছে। হাতীবান্ধার গড্ডিমারী গ্রামের কৃষক আনোয়ারুল হক বলেন, সকাল থেকে পানি বাড়ছে। শুনছি ভারত পানি ছেড়ে দিয়েছে। পানি এভাবে বাড়তে থাকলে চরাঞ্চলের ধানের চারা, বাদাম ও মিষ্টিকুমড়াসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি হবে। কালীগঞ্জ উপজেলার চর শৌলমারী এলাকার কৃষক নজরুল ইসলাম জানান, তাদের চরটি নদীর পানিতে ডুবে গেছে। তারা এখনো বাড়িতে অবস্থান করছেন, তবে পানি আরেকটু বাড়লে তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হবে।
ডালিয়া পয়েন্টের পানি পরিমাপক নুরুল ইসলাম বলেন, গতকাল সকাল থেকে তিস্তার পানি বাড়ছে। দুপুর ১২টায় তা বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। পানি নিয়ন্ত্রণে ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে। ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, ভারত গজলডোবা ব্যারাজের গেট খুলে দিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যারাজের সব জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে। নদী তীরবর্তী মানুষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
রংপুর : উজানের ঢল ও টানা বৃষ্টিতে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের শংকরদহ মহিপুর তিস্তা সেতু রক্ষা বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ফলে সেতুসহ রংপুর-কাকিনা সড়ক হুমকির মুখে পড়েছে। জরুরি ব্যবস্থা না নিলে যেকোনো সময় সেতু ও সড়ক নদীগর্ভে চলে যেতে পারে। এ অবস্থার জন্য এলজিইডি ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বহীনতাকে দায়ী করছেন স্থানীয়রা। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, বিষয়টি এলজিইডির দেখার কথা। অপরদিকে এলজিইডির কর্মকর্তারা বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছেন। এ অবস্থায় স্থানীয়রা সেতু এবং সড়কটিকে বেওয়ারিশ বলে উল্লেখ করছেন।
গতকাল সকালে সরেজমিন ওই এলাকায় গিয়ে স্থানীয়দের ক্ষোভ লক্ষ্য করা গেছে। জানা গেছে, শনিবার সন্ধ্যা থেকে তিস্তায় পানি বাড়ায় সেতুটির উত্তর-পশ্চিম প্রান্তের রক্ষা বাঁধে ধস নামে। গতকাল সকাল পর্যন্ত ২৫/৩০ মিটার অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। সেখানে তৈরি হয়েছে প্রায় ৬০ ফুট গভীর গর্ত। এতে মহিপুর সেতু ও কাকিনাগামী সড়কে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত বছর বাঁধটির প্রায় ১০০ ফুট নদীগর্ভে বিলীন হয়েছিল। তখন ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে বাঁধের উজানে বাঁশের পাইলিং করে তা রক্ষার চেষ্টা করে এলজিইডি। পরবর্তী সময় টেকসই কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় পানির তীব্র স্রোতে এবার সেই পাইলিং ভেঙে গেছে। ফলে হুমকির মুখে পড়েছে সেতুর ওই এলাকা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, সড়ক ও সেতু এলজিইডির অধীনে। এখানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু করার নেই।
সিরাজগঞ্জ : যমুনা নদীতে পানি বাড়তে থাকায় তৈরি হয়েছে প্রবল স্রোত। এতে সিরাজগঞ্জ সদরে যমুনা নদীর ডান তীররক্ষা বাঁধের অন্তত ৪০ মিটার এলাকা ধসে গেছে। শনিবার দুপুর থেকে উপজেলার রতনকান্দি ইউনিয়নের বাহুকা গ্রামের ডান তীররক্ষা বাঁধ এলাকায় এ ধস শুরু হয়। এ ছাড়া নদী তীরের চৌহালী ও শাহজাদপুর এলাকার কয়েকটি পয়েন্টে ভাঙন দেখা গেছে। এতে বসতভিটা ও ফসলি জমি বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন নদী তীরবর্তী মানুষ। স্থানীয়রা জানান, শনিবার বিকালে হঠাৎ করে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বাহুকা গ্রামের যমুনা নদীর ডান তীর রক্ষা বাঁধ ধস নামতে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে প্রায় ৩০ মিটার এলাকা ধসে যমুনায় বিলীন হয়ে যায়।
অন্যদিকে, চৌহালীর চর সলিমাবাদে প্রায় ৩ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এবং শাহজাদপুরের সোনাতনী ইউনিয়নে ভাঙন শুরু হয়েছে। ভাঙনে প্রতিদিন বসতভিটা ও ফসলি বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এতে মানুষ সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী নাজমুল হোসাইন বলেন, বর্তমানে যমুনা নদীর পানি কখনো বাড়ছে আবার কখনো কমছে। এ কারণে যমুনার অরক্ষিত অঞ্চলের কিছু স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, পানির ঘূর্ণাবর্তনের কারণে বাঁধের ৩০ মিটার এলাকা ধসে গেছে। জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এ ছাড়াও চৌহালী এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। তবে শাহজাদপুরের সোনাতনী চর এলাকায় ভাঙন দেখা দিলেও কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ এই মুহূর্তে নেই।