কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে পুলিশের সতর্কবার্তাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন দলটির নেতাকর্মীরা। ২৩ জুন সামনে রেখে দেশে ও বিদেশে একাধিক বৈঠক হয়েছে। এসব বৈঠকে কর্মী-সমর্থকদের সক্রিয় করার ওপর জোর দেওয়া হয়। বিশেষ করে কলকাতার বৈঠক থেকে ঢাকাসহ সারা দেশে মিছিলের ছক তৈরির খবর পাওয়া গেছে।
পুলিশের পক্ষ থেকেও দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে উদ্ভূত যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বাহিনীর সদস্যরা।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) পুলিশ সদর দপ্তর থেকে এ বিষয়ে একটি ‘জরুরি বার্তা’ পাঠানো হয়। এতে সারা দেশে পুলিশ সদস্যদের প্রয়োজনীয় সতর্কতার পাশাপাশি ‘নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা’ নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ডিআইজি (কনফিডেন্সিয়াল) মো. কামরুল আহসানের সই করা ওই চিঠিতে পুলিশ সুপারদের (এসপি) আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গোয়েন্দা তথ্যে জানা গেছে, আওয়ামী লীগকে ঠেকাতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও দলটির ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিতে পারেন। এতে সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি রয়েছে।
সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যক্রমের মাধ্যমে যাতে জননিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয়, সে জন্য সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সম্ভাব্য নাশকতা ও সহিংসতা প্রতিরোধে মাঠপর্যায়ে অতিরিক্ত নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।’
রাজধানীর প্রবেশমুখসহ বিভিন্ন এলাকায় শুক্রবার (১৯ জুন) থেকে পুলিশের তল্লাশি শুরু হয়েছে। ঢাকার বিভিন্ন থানায় অপরাধীদের গ্রেপ্তার অভিযানও অব্যাহত রয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, সরকারি স্থাপনা, রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর এলাকা এবং বিভিন্ন প্রবেশপথে বাড়তি পুলিশ মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেজিং অ্যাপ ও বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
কলকাতার নিউমার্কেটে বৈঠক
পুলিশের নির্দেশনা গণমাধ্যমে আসার পরপরই কলকাতার নিউমার্কেট এলাকায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের পলাতক নেতারা এক বৈঠকে মিলিত হন।
ঢাকা মহানগরের একাধিক যুবলীগ নেতা, ফেনী আওয়ামী লীগ, কুমিল্লা ছাত্রলীগ এবং চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও খুলনা এলাকার বেশ কিছু নেতাকর্মী ওই বৈঠকে অংশ নেন। পুলিশের সতর্কবার্তাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি সফল করার ওপর জোর দেন তারা।
ওই বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, কর্মসূচি বাস্তবায়নে নতুন করে পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। এর অংশ হিসেবে ঢাকাসহ দেশের সব জেলা বেশ কয়েকজন নেতার মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়।
ঢাকার দায়িত্বে যারা
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে রাজধানী ও জেলা পর্যায়ে মিছিলকে প্রধান কর্মসূচি হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি এড়িয়ে কর্মসূচি সফল করতে স্থান ও সময় নির্ধারণ করে সুনির্দিষ্ট কৌশল অনুসরণ করা হচ্ছে। পোস্টারিং ও লিফলেট বিতরণেরও প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, পুরান ঢাকার একাধিক স্থানে মিছিলের আয়োজন করবেন ঢাকার সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন। কেরানীগঞ্জ ও কামরাঙ্গীরচর এলাকায় মিছিল পরিচালনা করবেন দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহীন আহমেদ। মিরপুরের রূপনগর ও পল্লবী এলাকার দায়িত্ব পেয়েছেন উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বাপ্পী।
মোহাম্মদপুর, আদাবর ও শ্যামলীর দায়িত্ব নিয়েছেন ডিএনসিসির ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীব। ইতোমধ্যেই তার নেতৃত্বে জুলাই জাদুঘর এলাকায় মিছিল হয়েছে।
ধানমন্ডি ও আশপাশের এলাকায় মিছিলের নেতৃত্ব দেবেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সভাপতি রাজিবুল ইসলাম বাপ্পি। শ্যামপুর, কদমতলী ও জুরাইন এলাকায় ছোটন কমিশনারসহ আরও কিছু নেতাকর্মীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
পল্টন ও মতিঝিলসহ কিছু এলাকায় কোনো মিছিলের আয়োজন রাখা হয়নি।
স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসূচির প্রস্তুতি
নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুবলীগের এক নেতা বলেন, ‘কেন্দ্রীয় কর্মসূচির পাশাপাশি অনেক নেতাকর্মীরা স্থানীয় পর্যায়ে র্যালি, আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিলের মতো কর্মসূচির মাধ্যমে দলের হাইকমান্ডকে চমক দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে। এমন কর্মসূচি এই মুহূর্তে ঝুঁকিপূর্ণ হলেও নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে সংগঠিত হওয়ার তৎপরতা দেখাতে এমন আয়োজন করা হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশের সতর্কতাকে অনেকেই রাজনৈতিক চাপ হিসেবে দেখছেন। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটিকে কর্মীদের আরও উজ্জীবিত করে তুলছে। এরই মধ্যে গণভবনের সামনে মিছিল এবং মহাখালী এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের মতো কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। ফলে পুলিশ প্রশাসনের সতর্কবার্তা এবং দলীয় প্রস্তুতির মধ্যে একধরনের অঘোষিত চ্যালেঞ্জ এরই মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে।’
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সংগঠক সাজ্জাদ হোসেন সজিব এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের এই সক্রিয়তা শুধু সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনের বিষয় নয়, বরং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেদের অবস্থান ও জনসম্পৃক্ততার বার্তা দেওয়ারও একটি প্রচেষ্টা।’
তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ছিল, আছে, থাকবে। এই বার্তা দেশবাসীর কাছে পৌঁছাতে কর্মসূচির বিকল্প নেই। এতে পুলিশ যদি সতর্ক থাকে, আমাদের গ্রেপ্তার করে, সেটি আমাদের চিন্তার বিষয় নয়।’
ঢাকার বাইরে জোর প্রস্তুতি
কুমিল্লা জেলা দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ইসরাফিল পিয়াশ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘পুলিশের সতর্কবার্তার কথা শুনে আমার মিছিলের লোকসংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছি। ২৩ জুন অন্য সব জেলার চেয়ে কুমিল্লার মিছিল হবে মনে রাখার মতো।’
তিনি আরও বলেন, ‘জেলার বিভিন্ন এলাকায় লিফলেট বিতরণ ও পোস্টারিং করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিন জাতীয় ও দলীয় পতাকা নিয়ে মিছিল হবে। ছাত্রলীগ শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নয়, অন্য কোনো দল বা সংগঠনের সতর্কতাও আমলে নেয় না। ছাত্রলীগ গুলির সামনে দাঁড়ানোর চ্যালেঞ্জও গ্রহণ করে।’
প্রায় একই বক্তব্য ফেনী জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি তোফায়েল আহমেদ তপুর। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ফেনীতে গত কয়েক দিন ধরে পোস্টারিং হয়েছে। আগামী কয়েক দিনও পোস্টারিং ও লিফলেট বিতরণ করা হবে। কেন্দ্রীয় কর্মসূচির পাশাপাশি আমাদের জেলায় হাজার হাজার লোকের অংশগ্রহণে একাধিক মিছিল হবে।’
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রস্তুতি সম্পর্কে পুলিশ সদর দপ্তরের এক এআইজি নাম প্রকাশ না করার শর্তে এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রাজনৈতিক কর্মসূচিসহ সব সময়ই চ্যালেঞ্জের মধ্যে থাকে। তবে বর্তমান সময়টা পুলিশের জন্য একটু বেশি চ্যালেঞ্জিং। আওয়ামী লীগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যতটা জানান দিচ্ছে, ২৩ তারিখ তেমনটা দেখাতে পারবে না।’