আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার সম্পর্ক নিয়ে গুঞ্জন নতুন নয়। দলটির দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে ‘রেহানা বলয়’, ‘হাসিনা বলয়’ কিংবা দুই বোনের অনুসারীদের মধ্যে নীরব প্রতিযোগিতার নানা গল্প রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘুরে বেড়িয়েছে। কিন্তু এসব আলোচনার বিপরীতে দলটির নেতাদের বড় একটি অংশ বরাবরই বলে এসেছে, শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার ব্যক্তিগত কিংবা রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে যে ধরনের বিভক্তির কথা বলা হয়, তার দৃশ্যমান কোনো প্রমাণ কখনো পাওয়া যায়নি।
সাবেক সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক গোলাম মাওলা রনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক মন্তব্যে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আনেন। তিনি বলেন, “শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানার মধ্যকার সম্পর্ক যা দেখি, তাতে মনে হয় না তাদের মধ্যে বিরোধ আছে। আর দলের মধ্যে কারা শেখ রেহানাপন্থী, তা নিয়ে অনেক গল্পগুজব শুনলেও বাস্তবে আমি কাউকে খুঁজে পাইনি। যেমন আমাকে বলা হতো শেখ রেহানার লোক, অথচ ছোট আপার সঙ্গে মুখোমুখি দেখা তো দূরের কথা, কোনো দিন ফোনেও কথা হয়নি।”
রনির এই মন্তব্য আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে চলমান নানা জল্পনা-কল্পনার মধ্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। কারণ তিনি একসময় আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ছিলেন এবং দলটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তার বক্তব্যের সঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মূল্যায়নেরও মিল পাওয়া যায়। তাদের মতে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব প্রশ্নে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার মধ্যে কোনো প্রকাশ্য বা প্রমাণযোগ্য বিরোধের তথ্য কখনো সামনে আসেনি।
বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে গত ৩ জুন প্রকাশিত ইংরেজি দৈনিক টাইমস অব বাংলাদেশ-এর একটি প্রতিবেদনের পর। ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, আওয়ামী লীগ পুনর্গঠনের উদ্যোগে শেখ হাসিনা নাকি শেখ রেহানার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের রাজনৈতিকভাবে দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন এবং দল পরিচালনার ক্ষেত্রে আগের মতো রেহানার মতামতকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আওয়ামী লীগের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার কারণ খুঁজতে গিয়ে শেখ হাসিনা দলের ভেতরে একধরনের আত্মসমালোচনার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন এবং সেই প্রক্রিয়ায় কথিত ‘রেহানা বলয়’ চাপের মুখে পড়েছে।
তবে প্রতিবেদনটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, সেখানে উত্থাপিত প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ দাবি ‘দলীয় সূত্র’, ‘একাধিক নেতা’, ‘বিদেশে অবস্থানরত নেতা’ কিংবা ‘অভ্যন্তরীণ সূত্র’-এর বরাতে তুলে ধরা হয়েছে। কোনো দাবির পক্ষে প্রকাশ্য বক্তব্য, লিখিত দলিল বা সংশ্লিষ্ট নেতাদের প্রত্যক্ষ মন্তব্য উপস্থাপন করা হয়নি। এমনকি শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার মধ্যে রাজনৈতিক মতবিরোধ রয়েছে—এমন দাবির পক্ষেও প্রতিবেদনে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য বা প্রমাণ দেওয়া হয়নি। বরং প্রতিবেদনের মধ্যেই বলা হয়েছে, দুই বোনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক আন্তরিক রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের মতো পরিবারকেন্দ্রিক ঐতিহ্যের একটি দলে বিভিন্ন নেতার সঙ্গে শেখ রেহানা বা তার পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত যোগাযোগ থাকতেই পারে। কিন্তু সেটিকে সরাসরি পৃথক রাজনৈতিক বলয় বা বিকল্প ক্ষমতাকেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করতে হলে তার পক্ষে আরও শক্তিশালী তথ্য-প্রমাণ প্রয়োজন।
দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার সম্পর্ক বরাবরই ঘনিষ্ঠ বলেই পরিচিত। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হওয়ার সময় দুই বোনই দেশের বাইরে ছিলেন। সেই ট্র্যাজেডির পর দীর্ঘ নির্বাসন, দেশে ফেরা এবং আওয়ামী লীগের পুনর্গঠনের পুরো পথচলায় শেখ রেহানা নেপথ্যের ভূমিকায় ছিলেন। তিনি কখনো সক্রিয় দলীয় পদে আসেননি, নির্বাচনে অংশ নেননি এবং প্রকাশ্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব গ্রহণেরও চেষ্টা করেননি।
আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের বক্তব্যেও সাধারণত শেখ রেহানাকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগ্রহণকারী নয়, বরং পরিবারের সদস্য ও পরামর্শক হিসেবেই তুলে ধরা হয়েছে। ফলে তাকে কেন্দ্র করে ‘স্বতন্ত্র রাজনৈতিক কেন্দ্র’ গড়ে ওঠার যে আলোচনা মাঝে মাঝে শোনা যায়, তার বেশির ভাগই অনানুষ্ঠানিক রাজনৈতিক কথাবার্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে।
আওয়ামী লীগের বর্তমান বাস্তবতাও এই আলোচনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দলটি সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে। দলটির বহু নেতা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, অনেকে আত্মগোপনে রয়েছেন, আবার অনেকে মামলার মুখোমুখি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক গণমাধ্যমের বিশ্লেষণে আওয়ামী লীগের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সাংগঠনিক পুনর্গঠন, নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা এবং রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ফিরে পাওয়ার প্রশ্নকে তুলে ধরা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের ভেতরে নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই আলোচনাকে শেখ হাসিনা বনাম শেখ রেহানার দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখার পক্ষে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান ভিত্তি খুব সীমিত। বরং বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব এখনো শেখ হাসিনাকেন্দ্রিক। ইংরেজি ভাষার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণেও আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা হলেও শেখ রেহানাকে কখনো বিকল্প রাজনৈতিক নেতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি। বরং সজীব ওয়াজেদ জয়, দলীয় জ্যেষ্ঠ নেতারা বা নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা বেশি হয়েছে।
প্রথম সারির রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আওয়ামী লীগের ইতিহাসে নেতৃত্বের প্রশ্নে বড় ধরনের বিভক্তি দেখা দিলে তার কিছু না কিছু প্রতিফলন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, বিবৃতি, পাল্টা বিবৃতি কিংবা নেতাদের প্রকাশ্য অবস্থানে দেখা যেত। কিন্তু শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার ক্ষেত্রে তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। দুই বোনের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধের অভিযোগ কখনোই প্রকাশ্যে আসেনি। এমনকি আওয়ামী লীগের সংকটময় সময়গুলোতেও রেহানা প্রকাশ্যে শেখ হাসিনার অবস্থানের বিরোধিতা করেছেন—এমন নজিরও নেই।
রাজনীতিতে গুঞ্জন, অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিংবা প্রভাব বিস্তারের আলোচনা নতুন কিছু নয়। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন নিয়োগ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কিংবা ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর প্রভাব নিয়ে বিতর্ক ছিল এবং সেসব বিতর্কে শেখ রেহানার নামও নানা সময়ে অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় এসেছে। কিন্তু কোনো অভিযোগই আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে এসব আলোচনাকে তথ্যভিত্তিক রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করার আগে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন বিশ্লেষকেরা।
তাদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো দলটি কীভাবে সাংগঠনিক পুনর্গঠন করবে, জনসমর্থন পুনরুদ্ধার করবে এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের কাঠামো গড়ে তুলবে। শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার সম্পর্ককে কেন্দ্র করে যে আলোচনা চলছে, তা এখনো পর্যন্ত রাজনৈতিক গুঞ্জনের পর্যায়েই বেশি রয়েছে। কারণ এ ধরনের বিরোধের পক্ষে নির্ভরযোগ্য ও যাচাইযোগ্য তথ্য এখনো সামনে আসেনি।
গোলাম মাওলা রনির মন্তব্যও মূলত সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। তার বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়েছে আওয়ামী লীগের ভেতরে বহু বছর ধরে প্রচলিত নানা গল্পের সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতার ফারাক। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ভাষায়, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, নেতৃত্বের রূপান্তর নিয়েও আলোচনা হতে পারে; কিন্তু শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো শক্ত প্রমাণ এখনো জনপরিসরে অনুপস্থিত।