পরিবেশদূষণ, বন উজাড় ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশের জীববৈচিত্র্য ও প্রাণপ্রকৃতি আজ নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। প্রতিনিয়ত তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, নদীভাঙন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি এখন পরিবেশ রক্ষার গুরুত্বকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এ অবস্থায় গতকাল বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হয়েছে বিশ্ব পরিবেশ দিবস।
পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং টেকসই উন্নয়নের গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতি বছর এ দিবস পালন করা হয়। এ বছর বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পরিবেশবাদী সংগঠন নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে। বৃক্ষরোপণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, র্যালি, সেমিনার এবং সচেতনতামূলক প্রচারণার মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণের বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে মূল উদ্দেশ্য।
এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘প্রকৃতি থেকে প্রেরণা, জলবায়ুর জন্য, আমাদের ভবিষ্যতের জন্য’। এই প্রতিপাদ্যে বিশ্ব পরিবেশ দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়: প্রকৃতি ও পরিবেশের সুরক্ষা মানবজাতির অস্তিত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতা ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমেই গড়ে উঠতে পারে একটি নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর ভবিষ্যৎ। তবে অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, আমরা পরিবেশ রক্ষার পরিবর্তে প্রতিনিয়ত নানাভাবে পরিবেশদূষণ করছি। রাসায়নিক বর্জ্য-গৃহস্থালি বর্জ্যে প্রতিনিয়ত নদী দূষিত হচ্ছে। পলিথিনে দূষিত হচ্ছে মাটি পানি, অবৈধ ইটভাটা, মেয়াদহীন বাসে ও কলকারখানার ধোঁয়ায় দূষিত হচ্ছে বাতাস। এ ছাড়া নির্বিচারে বন উজাড় করার ফলে জীববৈচিত্র্য ও প্রাণপ্রকৃতি হুমকির মুখে।
সব মিলিয়ে পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে হারিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের ঋতুবৈচিত্র্য। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গ্রীষ্ম মৌসুমের তাপপ্রবাহ এখন বর্ষাকাল পর্যন্ত বর্ধিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জুন, জুলাই এমনকি আগস্টেও থাকছে তাপপ্রবাহ। বর্ষা মৌসুমেও মানুষকে সহ্য করতে হচ্ছে অস্বাভাবিক গরম।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু স্বাভাবিক আবহাওয়ার পরিবর্তন নয়; বরং জলবায়ু পরিবর্তনের বড় একটি সংকেত। বর্ষা এখন আর আগের মতো নিয়ম মেনে আসছে না। কখনো দেরিতে শুরু হচ্ছে, কখনো দীর্ঘ বিরতি দিচ্ছে, আবার কোনো সময় স্বল্প সময়ে হচ্ছে অতিবৃষ্টি। মাঝে আবার তৈরি হচ্ছে খরা, তীব্র গরম, ভ্যাপসা আবহাওয়া। সাধারণত জুনের শুরু থেকে বাংলাদেশে মৌসুমি বায়ু প্রবেশ করে। এ মাসে অনেক বেশি বৃষ্টিও হয়। বছরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৃষ্টি ঝরে এ মাসটিতে।
কিন্তু আবহাওয়া অধিদফতরের চলতি জুন মাসের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস বলছে, এ বছর স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টি হতে পারে। তাপমাত্রা থাকতে পারে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। দু-তিনটি মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহও হতে পারে। এছাড়া এবার জুন, জুলাই ও আগস্ট: এই তিন মাসে দেশে ৮ থেকে ১০টি বিচ্ছিন্ন মৃদু (৩৬-৩৭.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস) থেকে মাঝারি (৩৮-৩৯.৯ ডিগ্রি সে.) ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। এছাড়া চলতি বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টি হতে পারে স্বাভাবিকের চেয়ে কম। ফলে আবহাওয়াবিদরা এই পরিবর্তনের সম্ভাবনা অনেকটা অস্বাভাবিক বলছেন। আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ বলেন, এ বছরের জুন মাসের প্রথমার্ধে দেশে মৌসুমি বায়ু (বর্ষাকাল) বিস্তার লাভ করতে পারে। তবে এ অবস্থায়ও চলতি মাসে একাধিক তাপপ্রবাহের আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে বাতাসে আর্দ্রতার (হিউমিডিটি) পরিমাণ ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত রয়েছে। ফলে প্রকৃত তাপমাত্রা যতটা, মানুষের শরীরে অনুভূত তাপমাত্রা তার চেয়ে অনেক বেশি মনে হচ্ছে। একই কারণে রাতেও গরম কমছে না।
সাধারণত রাতে তাপমাত্রা ২৪ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এখন অনেক জায়গায় তা ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি থাকছে। এর প্রধান কারণ হলো: বাতাসে অতিরিক্ত জলীয়বাষ্প এবং আকাশে মেঘের উপস্থিতি। দিনের বেলায় সূর্যের তাপে যে তাপ সঞ্চিত হয়, তা রাতের বেলায় সহজে বের হতে পারে না। ফলে রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থেকে যায়। দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য কমে গেলে মানুষের অস্বস্তি বেড়ে যায়। বিশেষ করে শ্রমজীবী ও বাইরে কাজ করা মানুষ বেশি ভোগান্তিতে পড়েন। উচ্চ আর্দ্রতার কারণে শরীরের ঘাম সহজে শুকায় না। ফলে গরমের অনুভূতি আরো তীব্র হয়। আবহাওয়া অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, গত কয়েক বছর ধরে বর্ষায় তাপপ্রবাহ অব্যাহত ছিল। জুন, জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে সাধারণত বৃষ্টির মৌসুম। তবে একই সময়ে হিটওয়েভ বা তাপপ্রবাহ থাকে দেশের বিভিন্ন স্থানে।
গত বছরের জুন মাসে দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ বৃষ্টি কম হয়েছিল। রাজধানী ঢাকায় যা ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৪৪ শতাংশ কম। মাসটিতে ২৪ দিন বৃষ্টি হওয়ার তথ্য রেকর্ড করে আবহাওয়া অফিস। কিন্তু বেশির ভাগ দিনেই বৃষ্টির পরিমাণ ছিল খুবই সামান্য; বরং বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় মাসজুড়ে ছিল ভ্যাপসা গরম। এছাড়া ২০২৫ সালে জুলাই মাসে পাঁচটি তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস ছিল। বৃষ্টিও হয়েছিল স্বাভাবিকের চেয়ে কম। ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে দেশে বিচ্ছিন্নভাবে দুটি মৃদু (৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি) তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। এছাড়া মাসটিতে দিন ও রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ছিল। এছাড়া গত বছরের আগস্ট মাসে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশাল বিভাগে স্বাভাবিকের চেয়ে যথাক্রমে ১১ দশমিক ৯, ১১ দশমিক ১, ১৬ দশমিক ৫ এবং ১২ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টি কম হয়।
আবহাওয়া অধিদফতরের সূত্র বলছে, গত ১০ থেকে ১২ বছরের আবহাওয়ার ধারা বিশ্লেষণ করলে পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট প্রবণতা দেখা যায়। আগে সাধারণত মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে তাপপ্রবাহ হতো। বর্ষা শুরু হলে তাপপ্রবাহের প্রভাব অনেকটাই কমে যেত। কিন্তু এখন জুন, জুলাই এমনকি আগস্ট মাসেও তাপপ্রবাহের মতো পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ গরমের মৌসুম দীর্ঘ হচ্ছে। আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, বর্ষায় গরমের পেছনে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন অন্যতম একটি কারণ। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়ার ফলে আবহাওয়ার চরম বৈশিষ্ট্যগুলোর ধরন বদলে যাচ্ছে। কখন বৃষ্টি হবে, কখন তাপপ্রবাহ: এসবের স্বাভাবিক ছন্দে পরিবর্তন আসছে। বর্তমানে এল-নিনো সক্রিয় হওয়ায় এবার বর্ষায় তার প্রভাব থাকবে। স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টির আশঙ্কা বেশি। একই সঙ্গে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের পাশাপাশি স্থানীয় ও আঞ্চলিক নানা কারণও এতে ভূমিকা রাখছে।
বৃক্ষনিধন বা বন উজাড়ের ফলে, পরিবেশ বিপর্যয় ও জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণও। ফলে তাপমাত্রা খুব বেশি না হলেও শরীরে গরমের অনুভূতি কয়েক ডিগ্রি বেশি লাগে। এই পরিস্থিতিকে ‘হিট স্ট্রেস’ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ছাড়া বিগত দশক থেকে ঋতুতে নানা পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। বর্ষায় গরম বেড়ে যাচ্ছে। এ সময় তাপমাত্রার সঙ্গে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণও অনেক বেশি থাকে। ফলে শরীর থেকে ঘাম ঠিকমতো বাষ্পীভূত হতে পারে না। অস্বস্তি বেড়ে যায়। একই সঙ্গে বিভিন্ন রোগের প্রকোপও বাড়ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার মিলিত প্রভাবে শরীর স্বাভাবিকভাবে ঠাণ্ডা হতে পারে না। এতে ডিহাইড্রেশন, হিট অ্যাক্সেশন হয়। এ সময় আবহাওয়ার ঘন ঘন পরিবর্তনের কারণে সর্দি, কাশি, জ্বর ও শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন সংক্রমণও বাড়ছে।