Image description
সালামের ছোঁয়ায় মেডিকেলে প্রশ্ন ফাঁসে কোটিপতি! ছাত্র জোগাড় করতেন ফার্মগেটের মোবাইল দোকানি সিআইডির অভিযোগপত্রে ২৯ জনের নাম

একটি প্রশ্নপত্র, গোপন নেটওয়ার্ক এবং এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা এক ভয়ংকর প্রতারণা। দেশের হাজারো মেধাবী শিক্ষার্থীর স্বপ্ন পেছনে ফেলে টাকার বিনিময়ে মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল একটি সংঘবদ্ধ প্রশ্ন ফাঁস চক্র।

২০০৫ থেকে ২০১৭; ছাপাখানার ভেতর থেকে শুরু হওয়া এই গোপন কারবার চলেছে টানা ১২ বছর। সম্প্রতি আদালতে জমা দেওয়া সিআইডির অভিযোগপত্রে উঠে এসেছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ছাপাখানার এক কর্মচারীর হাত ধরে পরীক্ষার আগেই প্রশ্নপত্র পৌঁছে যেত চক্রের হোতাদের হাতে। এরপর সেই প্রশ্ন ছড়িয়ে পড়ত সারা দেশে। এই কারবার করেই কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন চক্রের সদস্যরা।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, এই চক্রের মাস্টারমাইন্ড ছিলেন মো. আব্দুস সালাম খান। তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরোর প্রিন্টিং প্রেসে মেশিনম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মেডিকেল ও ডেন্টাল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র যেখানে ছাপা হতো, সেখানেই দায়িত্ব পালন করতেন তিনি। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রশ্নপত্র ছাপানো, প্যাকেটজাত করা কিংবা বিতরণের আগের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি গোপনে প্রশ্ন বের করে রাখতেন। পরে সেই প্রশ্নপত্র চক্রের হোতা জসিম উদ্দিন ভূঁইয়া মুন্নুর হাতে পৌঁছে দিতেন।

অভিযোগপত্র অনুযায়ী, জসিম উদ্দিনের সঙ্গে সালামের পরিচয় করিয়ে দেন তার বোনজামাই মো. আলমগীর হোসেন। এরপর জসিম সালামকে প্রশ্ন ফাঁসের প্রস্তাব দেন। সালাম রাজি হলে তারা মেডিকেল ও ডেন্টাল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করেন। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রশ্নপত্র ছাপানোর পুরো সময় সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রেসে অবস্থান করার কথা থাকলেও, সালাম সুযোগ বুঝে রাতে প্রেস থেকে বের হতেন এবং প্রশ্নপত্র জসিমের হাতে তুলে দিতেন। প্রশ্ন হাতে পাওয়ার পর শুরু হতো চক্রের বাণিজ্যিক কারবার। জসিম তার ভাই, বোন, বোনজামাই, বন্ধু এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মাধ্যমে সারা দেশে প্রশ্ন ছড়িয়ে দিতেন। পরীক্ষার আগে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের খুঁজে বের করা হতো। কোচিং সেন্টার, পরিচিত নেটওয়ার্ক এবং বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হতো।

একজন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ৭ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো বলে তদন্তে উঠে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকদের কাছ থেকে আগাম চেক, জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি এবং প্রবেশপত্রও সংগ্রহ করা হতো। ফার্মগেটের এক মোবাইল অ্যাকসেসরিজ দোকানি এসএম সানোয়ার হোসেনও এই চক্রের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। শিক্ষার্থী সংগ্রহের দায়িত্ব ছিল তার কাঁধে। ২০১৫ সালে তিনি জসিমের জন্য ১০ শিক্ষার্থী সংগ্রহ করেছিলেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরীক্ষার কয়েক দিন আগে এসব শিক্ষার্থীর কাছ থেকে কোটি টাকার সমপরিমাণ চেক সংগ্রহ করে চক্রের সদস্যদের হাতে তুলে দেওয়া হতো। তদন্তে আরও উঠে এসেছে, ২০১৫ সালে র‍্যাবের অভিযানে জসিম উদ্দিন ও তার কয়েকজন সহযোগী গ্রেপ্তার হলেও প্রশ্ন ফাঁস কার্যক্রম থেমে যায়নি।

পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী চক্রের অন্য সদস্যরা জসিমের স্ত্রী শারমিন আক্তার শিল্পীর কাছে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র পৌঁছে দেন। এরপর তিনি পরীক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রশ্ন বিতরণের কাজ করতেন। পরীক্ষার আগের রাতে জসিমের বাসায় শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন ও উত্তর পড়ানো হতো বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

সিআইডির তদন্তে থ্রি ডক্টরস কোচিং নামের একটি প্রতিষ্ঠানের জড়িত থাকার তথ্যও উঠে এসেছে। চক্রটির কার্যক্রম ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত। কেউ প্রশ্ন সংগ্রহ করতেন, কেউ শিক্ষার্থী খুঁজতেন, কেউ উত্তর সমাধান করতেন, আবার কেউ প্রশ্ন বিতরণ ও অর্থ আদায়ের কাজ করতেন।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ আছে, বিভিন্ন চিকিৎসক, কোচিং সেন্টারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং মধ্যস্থতাকারীরাও এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফাঁস হওয়া প্রশ্নের উত্তর সমাধান করে পরীক্ষার্থীদের সরবরাহ করা হতো এবং অনেক ক্ষেত্রে সেই প্রশ্ন পরীক্ষায় হুবহু মিলে যেত।

অভিযোগপত্রে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রশ্ন ফাঁসের মাধ্যমে এই চক্র বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদও অর্জন করেছে। জসিম উদ্দিনের নামে ৩৩টি ব্যাংক হিসাব, এফডিআর ও সঞ্চয়পত্রে ২১ কোটি টাকার বেশি জমা পাওয়া গেছে। একইভাবে ইউনুচউজ্জামান খানের হিসাবে ২১ কোটির বেশি, মুহাম্মদ ময়েজ উদ্দিনের হিসাবে ১৯ কোটির বেশি, শারমীন আরার হিসাবে প্রায় ৩ কোটি এবং আরও অনেক আসামির নামে কোটি কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তকারীদের মতে, এসব অর্থের বড় অংশই প্রশ্ন ফাঁস বাণিজ্য থেকে এসেছে।

সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা মো. মোহাইমিনুল ইসলাম অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন, এই চক্র ২০০৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রকাশ ও বিতরণ করেছে। অর্থের বিনিময়ে অপেক্ষাকৃত কম মেধাবী শিক্ষার্থীদের মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ করে দিয়ে তারা দেশের চিকিৎসা শিক্ষাব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তদন্ত শেষে ২৯ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ না পাওয়ায় ২১ জনের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।

২০২০ সালের ২০ জুলাই সিআইডির উপপরিদর্শক প্রশান্ত কুমার সিকদার বাদী হয়ে মিরপুর মডেল থানায় পাবলিক পরীক্ষা অপরাধ আইনে মামলাটি করেছিলেন। এখন আদালতে বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই দীর্ঘদিনের প্রশ্ন ফাঁস কেলেঙ্কারির পূর্ণ সত্য উদঘাটনের অপেক্ষা।

ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকীর মতে, প্রশ্ন ফাঁসের এ ঘটনা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তিকে দুর্বল করেছে। তাই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার সম্পন্ন করে ভবিষ্যতে এমন অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধে একটি শক্ত বার্তা দিতে চান তারা।