Image description

প্রায় ১৩ মাস কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পেয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেত্রী সেলিনা হায়াৎ আইভী। গতকাল বুধবার রাত ১০টার দিকে গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। মুক্তির পর তার আইনজীবী জানিয়েছেন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের পরবর্তী নির্বাচনে অংশ নেবেন সাবেক এ মেয়র।

কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার শিরিন আক্তার বলেন, ‘আজ (বুধবার) রাত ১০টা ৮ মিনিটে সেলিনা হায়াৎ আইভী কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। এদিন সন্ধ্যায় আসা আইভীর জামিনের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করা হয়। পরে তিনি তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কারাগার ত্যাগ করেন। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ১২টি মামলা রয়েছে। সব মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া জামিন পাওয়ার পর তা আপিল বিভাগেও বহাল রাখা হয়।’

কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (এআইজি) জান্নাত উল ফরহাদ জানান, গতকাল বুধবার হাইকোর্টের ক্রিমিনাল মিস নং-১৩৪১২/২৬ এবং নারায়ণগঞ্জের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের স্মারক নং-৭৭৩ অনুযায়ী জামিনের আদেশ কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছায়। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারের স্মারক নং-১৪৫৭ অনুযায়ী নারায়ণগঞ্জের ৯টি মামলায় সেলিনা হায়াৎ আইভীর জামিনের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। তার বিরুদ্ধে অন্য কোনো আটকাদেশ না থাকায় তিনি মুক্তি পেয়েছেন।

কারা কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ৯ মে সেলিনা হায়াৎ আইভীকে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগের নিজ বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারে স্থানান্তর করা হয়।

আইভীর মুক্তির সময় কারাগার ফটকে তার আইনজীবী ও স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন। কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর আইভী একটি গাড়িতে ওঠেন। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি।

আইভীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট আওলাদ হোসেন বলেন, ‘আইভীর বিরুদ্ধে হওয়া মামলাগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। মামলাগুলোর সঙ্গে তিনি কোনোভাবেই জড়িত নন। গত বছরের মে মাসে নারায়ণগঞ্জের বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এক বছরেরও বেশি সময় তিনি কারাবন্দি ছিলেন। আমরা আইনিভাবে উনার মুক্তির জন্য সর্বোচ্চ আদালত থেকে ন্যায়বিচার পেয়েছি। তবে হাইকোর্ট তাকে জামিন দেওয়ার পরও রাষ্ট্রপক্ষ জামিনের আদেশ বাতিল করার জন্য চেম্বার জজে যায়। আপিল বিভাগ শুনানি শেষে হাইকোর্টের দেওয়া আদেশ বহাল রাখে। এতে আইভীর মুক্তি পেতে বাধা কাটে।’

তিনি বলেন, ‘মুক্তির পর সরাসরি নারায়ণগঞ্জের দেওভোগে তার বাড়ির পথে রওনা হয়েছেন। তিনি আইনি লড়াই চালিয়ে যাবেন এবং ভবিষ্যতে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে অংশ নেওয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে।’

চব্বিশের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ঘটনায় হত্যাসহ পৃথক ১০ মামলায় গত ১০ মে আইভীকে হাইকোর্টের দেওয়া জামিন বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ সেদিন এ আদেশ দেন। হাইকোর্ট ওই ১০ মামলায় জামিন দিলে সাবেক মেয়রকে আরও দুই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে ৩০ এপ্রিল সেই দুই মামলাতেও জামিন দেন হাইকোর্ট। এ দুটি মামলায় ১৭ মে জামিন বহাল রাখেন চেম্বার আদালতের বিচারক।

এর আগে এ দুই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর প্রক্রিয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন আইভী। রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গত ২৬ এপ্রিল হাইকোর্ট রুলসহ আদেশ দেন। রুলে শুধু হয়রানি ও অপদস্থ করার উদ্দেশ্যে বারবার এবং মিথ্যা প্রকৃতির মামলায় আবেদনকারীকে জড়ানোর কার্যক্রম কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া তাকে গ্রেপ্তার না দেখাতে এবং গ্রেপ্তার ও হয়রানি না করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, রুলে সেটিও জানতে চাওয়া হয়।

চব্বিশের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ঘটনায় হত্যাসহ পৃথক পাঁচ মামলায় সাবেক মেয়র আইভীর জামিন বিষয়ে দেওয়া রুল ২০২৫ সালের নভেম্বরে যথাযথ ঘোষণা করে বিচারপতি এ এস এম আবদুল মোবিন ও বিচারপতি মো. সগীর হোসেনের হাইকোর্ট বেঞ্চ জামিন দেন। সেই জামিনাদেশ স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালতে আবেদন করে। তখন জামিন স্থগিত করা হয়। এ পাঁচটির মধ্যে তিনটি হত্যা মামলা ও বাকি দুটি হত্যাচেষ্টা মামলা। পরে ১৮ নভেম্বর তাকে আরও পাঁচ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এই পাঁচ মামলায় বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ার ও বিচারপতি শেখ আবু তাহেরের হাইকোর্ট বেঞ্চ ২৬ ফেব্রুয়ারি জামিন দেন।

পাঁচ মামলার মধ্যে যে চার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে, সেগুলো হলো ফতুল্লা থানায় করা বাসচালক আবুল হোসেন মিজি হত্যা, আব্দুর রহমান হত্যা, মো. ইয়াছিন হত্যা ও পারভেজ হত্যা মামলা। হামলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে অন্য মামলাটি হয়েছে সদর মডেল থানায়। এরপর রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করে। গত ৫ মার্চ হাইকোর্টের দেওয়া জামিনাদেশ স্থগিত করেন চেম্বার আদালত। একই সঙ্গে শুনানির জন্য নিয়মিত বেঞ্চে পাঠান। পরে ১০ মামলায় আপিল বিভাগে শুনানি হয়। শুনানি শেষে সবগুলোতে জামিন বহাল রাখা হয়।

২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার মেয়র ছিলেন সেলিনা হায়াৎ আইভী। পরে নবগঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের টানা তিনটি নির্বাচনে জয়ী হন তিনি। আইভী নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতির দায়িত্বও পালন করছেন।