Image description

বেঁচে থাকার তাগিদে মানুষ ঘাম ঝরানো পরিশ্রম করে। সেই কষ্টের অর্থ দিয়ে নিজের জন্য কিংবা পরিবার পরিজন ও স্বজনের জন্য খাবার কিনে। ভাত-মাছ তরি-তরকারির পাশাপাশি ফলমূল, মুখরোচক খাবার ও বেকারি সামগ্রি কিনে। সুস্থতার জন্য কিনতে হয় ওষুধ। কিন্তু তার কোনটি কী ভেজাল ছাড়া আছে? সন্ধান পেলেও ব্যস্ত জীবনে কী শুধু খাবার সামগ্রি কেনার জন্য আদৌ দূরদূরান্তে যেতে পারবে? এক কথায় এটি সম্ভব না। এই যখন বাস্তবতা তখন দেশের মানুষ তাদের দৈনন্দিন চাহিদা পূরণে বাজার ঘাটে, দোকানে, ফুটপাতে বা হাতের কাছে প্রয়োজনীয় যা পায় কিনে নেয়।

পাতে উঠা প্রতিদিনের এসব খাবারের সঙ্গেই মানবদেহে ঢুকছে ‘বিষ’। মাছ, মাংস, ফল, মসলায় অতি মুনাফার লোভে মেশানো হচ্ছে ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান। শিশু খাদ্য-দুধ তৈরি হচ্ছে ক্যামিকেল দিয়ে। জিলাপিতে দেওয়া হচ্ছে হাইড্রোজ। জীবন রক্ষাকারী ওষুধেও মেশানো হচ্ছে ভেজাল। ফ্লেভার ও কাপড়ে ব্যবহৃত রং মিশিয়ে বানানো হচ্ছে ফলের জুস। পাশাপাশি অপরিপক্ব ফল পাকাতে ব্যবহার করা হচ্ছে কার্বাইড ও হরোমন। যা শুধু সাধারণ মানুষই নয়, শিশুসহ অসুস্থ রোগীর পেটেও যাচ্ছে। নিত্যদিনের খাবারে বিষ মেশানো ভেজাল খাবারে জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের খাদ্যচক্রে এসব খাবার চক্রাকারে ঢুকে দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। বাড়ছে ক্যানসার, কিডনি ও লিভারসহ নানা নানা জটিল রোগীর সংখ্যা।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) ও বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই), জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও মাঠ প্রশাসনও বলছে বাজারে ভেজালের মাত্রা বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া বিভিন্ন পণ্যে পটাশিয়াম অ্যালুমিনিয়াম সালফেট, সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট ও সারফেস অ্যাকটিভের মতো রাসায়নিক ও ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। আচার, সস, চিপস, মুড়ি, ফলের রস, বাচ্চাদের জুস, চানাচুর, মরিচ-হলুদের গুঁড়া, ঘি, পাউডার দুধ, সরিষার তেল, মাখন, সয়াবিন তেল, ডালডা, মধুসহ নানা পণ্যে এসব ভেজাল ধরা পড়েছে। ল্যাব টেস্টে চিপসের ৬৫ শতাংশে অ্যাক্রিলামাইড পাওয়া গেছে। সম্প্রতি খাবারের স্বাদ ও সুগন্ধির জন্য ব্যবহৃত কেওড়া ও গোলাপজল পরীক্ষায়ও রাসায়নিক শনাক্ত হয়েছে।

বিএফএসএর প্রতিবেদনে ভয়াবহ তথ্য : গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের এপ্রিল-১০ মাসে বাজার থেকে ১ হাজার ৭৫৬টি নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করে ৫৮৬টি খাবারেই ভেজাল ও দূষণ পাওয়া গেছে। ১১২টি নমুনায় সরাসরি ভেজাল উপাদান শনাক্ত হয়েছে। ৮২টি খাদ্যপণ্য পরীক্ষায় গড়ে ৪০ শতাংশ খাদ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহনীয় মাত্রার চেয়ে ৩ থেকে ২০ গুণ বেশি নিষিদ্ধ ডিডিটি ও অন্যান্য বিষাক্ত উপাদান মিলেছে। পরীক্ষায় ফলমূলে ৩৫ শতাংশ ও শাকসবজিতে ৫০ শতাংশ কীটনাশকের উপস্থিতি ধরা পড়ে। চালের ১৩টি নমুনায় অতিমাত্রায় আর্সেনিক এবং ৫টিতে ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে। হলুদের গুঁড়ার ৩০টি নমুনায় সিসাসহ ভারী ধাতু এবং লবণে পাওয়া গেছে সহনীয় মাত্রার চেয়ে ২০ থেকে ৫০ গুণ বেশি সিসা। এছাড়া মুরগি ও মাছেও মিলেছে ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শামীম আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাবার এখন নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে। সবকিছু চোখের সামনেই হচ্ছে। এসব খাবারে শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। বিষ মিশ্রিত খাবার মানুষের পেটে গিয়ে হজমে সমস্যা থেকে শুরু করে পাতলা পায়খানা ও ক্যানসারের মতো জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। ভেজাল খাবার লিভার ও কিডনির মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কার্যকারিতা নষ্ট করে ফেলছে।

খাবারে কাপড়ের রং : ফুড গ্রেডের নামে খাবারে শিল্পে ব্যবহৃত কাপড়ের রাসায়নিক রং ব্যবহারের প্রমাণ পেয়েছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের তদারকি টিম। রাজধানীর বেইলি রোডের ‘কাচ্চি ভাই’ রেস্টুরেন্টে অভিযান পরিচালনা করে এর সত্যতা পেয়েছিল। কাচ্চি ভাইয়ের দায়িত্বে থাকা ম্যানেজার এটাকে ‘ফুড গ্রেড’ রং হিসাবে দাবি করার সঙ্গে সঙ্গে সেই রং দুটি গ্লাসে ঢেলে দায়িত্ব থাকা ম্যানেজার ও তার সহকারীকে খেতে বললে তারা খেতে রাজি হননি। পরে কাচ্চির সঙ্গে মিশিয়ে খেতে বলা হয়। তাতেও রাজি হননি। তারা স্বীকার করেন এগুলো কাপড়ে ব্যবহারের রং।

মিষ্টি ও জিলাপি তৈরিতে হাইড্রোজ : মিষ্টি ও জিলাপি তৈরিতে ব্যবহার হচ্ছে ক্ষতিকর রাসায়নিক হাইড্রোজ। মিষ্টির রং ফকফকে সাদা ও জিলাপি মচমচে রাখার জন্য এই ক্যামিকেল মেশানো হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালকা করে হাতেনাতে এর প্রমাণ পেয়েছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।

সম্প্রতি রাজধানীর খিলগাঁও এলাকার একটি মিষ্টির দোকানে মিষ্টি বিক্রেতাকে অধিদপ্তরের কর্মকর্তা আব্দুল জব্বার মণ্ডল একটি ডিব্বা দেখিয়ে জানতে চান, এগুলো কি? বিক্রেতা বলেন এটা হাইড্রোজ। এ সময় আরেক কর্মকর্তা বলেন, এই বিষ মিশিয়ে আপনারা অন্যায় করছেন। এই বিষ মানুষের পেটে গেলে ক্যানসারের মতো বড় বড় রোগে আক্রান্ত হবে সাধারণ মানুষ।

নামিদামি মোড়কে নকল স্যালাইন বাজারে : আশুলিয়ায় বেস্ট টেস্টি ফুড ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান বিএসটিআইয়ের অনুমোদন ছাড়া অবৈধ কারখানায় নামিদামি কোম্পানির মোড়কে খাবার স্যালাইন তৈরি করে। পাশাপাশি টেস্টি আম হজমি, পালস্ চকলেট, টেস্টি ডাব, ভিটাসি সিভিট ও কাফ চকলেট উৎপাদন করা অবস্থায় হাতেনাতে ধরা পড়ে প্রতিষ্ঠানটি। ৮ মে বিষয়টি জানাজানি হয়।

ক্যামিকেল রং দিয়ে তৈরি হচ্ছে সেমাই : রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর এলাকায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি হচ্ছে ভেজাল সেমাই। সেখানে ক্যামিকেল রং দিয়ে তৈরি সেমাই বিভিন্ন দেশের ব্র্যান্ডের প্যাকেট করে বাজারে ছাড়া হচ্ছিল। ভোক্তা অধিদপ্তর অভিযান পরিচালনা করে সত্যতা পায়।

পামওয়েলের সঙ্গে রং দিয়ে সরিষার তেল তৈরি : পাবনার সাঁথিয়া উপজেলায় পামওয়েলের সঙ্গে রং মিশিয়ে সরিষার তেল উৎপাদন করায় দুটি প্রতিষ্ঠানকে লাখ টাকা জরিমানা করে ভোক্তা অধিদপ্তর পাবনা কার্যালয়।

ফল পাকাতে কার্বাইড ও হরমোনের ব্যবহার : ২৯ এপ্রিল সাতক্ষীরা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে কেমিক্যাল ও কার্বাইড দিয়ে পাকানো প্রায় ৯ হাজার কেজি অপরিপক্ব আম জব্দ করে পুলিশ। পুলিশ জানায়, এসব আম কেমিক্যাল ও কার্বাইড ব্যবহার করে অপরিপক্ব অবস্থাতেই পাকানো হয়েছিল। সম্প্রতি সময় একাধিক অভিযানে সাদা চিনিতে টেক্সটাইল রং মিশিয়ে নকল লাল চিনি বানিয়ে তা বিক্রি করার সত্যতা পায় ভোক্তা অধিদপ্তর।

ইবনেসিনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডায়েটিশিয়ান সিরাজাম মুনিরা যুগান্তরকে বলেন, যে খাবার থেকে রোগী সুস্থতার জন্য পুষ্টি পাওয়ার কথা, সেই খাবারেই মিশে থাকে ভেজাল, ক্ষতিকর রাসায়নিক, অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক বা ভারী ধাতু। এমনকি শিশুদের বিষমাখা খাবার খাওয়ার ফলে বিভিন্ন ধরনের অ্যালার্জি, সংক্রমণ ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। দুধ থেকে শুরু করে মাছ, মাংস, ফলমূল, শাকসবজি প্রায় সব খাদ্যগোষ্ঠীতেই এখন ভেজালের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এসব খাবারে ক্যানসার, কিডনি ও লিভারসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, খাদ্যে বিষ ও ভেজাল রোধে সরকার ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৫, নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯ প্রণয়ন করেছে। এমনকি ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনেও খাদ্যে ভেজাল দেওয়া ও বিক্রির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু এসব আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় জনগণ ভেজাল খাদ্যের বিষে নীল হচ্ছে।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টি) ড. মোহাম্মদ মোস্তফা যুগান্তরকে বলেন, আমরা বাজার থেকে পণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবে টেস্ট করি। সেখানে ভেজাল পেলে ওইসব পণ্যের কোম্পানিগুলোকে চিঠি দেই। আবারও নমুনা সংগ্রহ করে ফলোআপ করি। সেক্ষেত্রে যদি দেখি পণ্যের ভেজাল আছে ও ওইসব কোম্পানি বাজার থেকে ভোজাল পণ্য উঠিয়ে না নেয়, সেক্ষেত্রে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করি।