দেশের প্রায় অর্ধেক মাদরাসা সরকারি কারিকুলাম ও পাঠ্যবই অনুসরণ করে। যদিও দীর্ঘদিন যাবত শিক্ষানীতি, জাতীয় পাঠ্যক্রম ও আমলাতান্ত্রিক নানা রীতি পদ্ধতির অনুসরণের নামে আলিয়া মাদরাসাকে ইসলামী শিক্ষা, সুন্নাহ অনুসরণ, আদব আখলাক ও তাহযীব তামাদ্দুনের যে বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিশেষায়িত মাদরাসা শিক্ষা চলার কথা, সেই ধারা থেকে বিচ্যুত করে ধর্মহীন ছাপযুক্ত সাধারণ শিক্ষার কাতারে নামিয়ে আনার একটি চেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে।
যেমন, পাঠ্যপুস্তকে অশোভনীয় ছবি, ভেতরের পাঠে ইসলামী তাহযীব তামাদ্দুন বিরোধী শব্দ, বাক্য, বর্ণনা ও গল্প এবং পাঠের ভেতর অমুসলিম নামের প্রাচুর্য, ইংরেজি পাঠ্য বইয়ে সালামের জায়গায় পশ্চিমা সংস্কৃতির শব্দ ব্যবহার, কথোপকথন শিক্ষায় হিন্দু ছেলের সাথে অকারণেই মুসলিম মেয়ের অংশগ্রহণ ইত্যাদি সূক্ষ্ম অশোভনীয় কারসাজি লক্ষ্য করা গেছে।
মাদরাসায় সরকারি সাধারণ নীতির আওতায় অমুসলিম শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগের চেষ্টা হয়েছে। প্রিন্সিপাল পদে বদলীর সুযোগে হিন্দু ভদ্রলোকও মাদরাসার প্রিন্সিপাল হয়েছেন। মাদরাসা বোর্ডের কথা তো বলারই অপেক্ষা রাখে না। মন্ত্রণালয়ের মাদরাসা বিভাগ অধিদপ্তর ও মাদরাসা বোর্ড কোনো প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও অমুসলিম কর্মকর্তায় ভরা। মাদরাসা শিক্ষক ও কর্মচারীদের সংগঠন বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীনকে বিগত সরকারের প্রায় পুরোটা সময় বিশেষ করে শেষ দিকে দুই সেক্যুলার চেতনায় বিশ্বাসী মন্ত্রীর সময়ে এসব অশোভনীয় ও অন্যায্য সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করে এবং বাস্তব ক্ষেত্রে নানা কৌশলে মাদরাসাকে হেফাজত করার কাজে লেগে থাকতে হয়েছে। এমনও সময় গেছে যে, ধর্মীয় বোধহীন শিক্ষামন্ত্রী, উপমন্ত্রী প্রভৃতির কাছে কথা বলা, স্বারকলিপি দেয়া বা আলোচনায় বসা পর্যন্ত ফলপ্রসূ ছিল না। কারণ, মাদরাসা সম্পর্কে তাদের কোনো মনোযোগ বা আগ্রহই ছিল না। মাদরাসায় মহিলা শিক্ষিকা ও অমুসলিম শিক্ষক দেয়ার আইনগত নির্দেশকে খুবই কৌশলে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য এই সংগঠনকে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়েছে। সারাদেশে উপরের শ্রেণীগুলোতে সহশিক্ষা মেনে নিতে হয়েছে। বড় বড় প্রতিষ্ঠান যাদের আর্থিক সংগতি ও সামাজিক শক্তি রয়েছে তারা নারী ও পুরুষ শিক্ষার্থীর জন্য আলাদা ক্যাম্পাস করতে সক্ষম হলেও সারাদেশের অনার্স কোর্স বা উচ্চ শ্রেণীর মাদরাসাগুলো সহশিক্ষা প্রচলনে বাধ্য হয়েছে।
ইতঃপূর্বে সাধারণ শিক্ষার সাথে মাদরাসা শিক্ষার পাঠ্য বইয়ে বিশেষায়িত শিক্ষা হওয়ার কারণে এক ধরনের উপস্থাপনগত পার্থক্য ছিল। যেমন, মাদরাসার ইংরেজি বইয়ে ইসলাম, আল্লাহর পরিচয়, রাসূল সা. এর বৈশিষ্ট্য, মুসলিম মনীষীদের আখলাক ও শিক্ষা বিষয়ক প্রবন্ধ থাকতো। অন্য বিষয়গুলোতেও মাদরাসার বইয়ে বোর্ড কর্তৃক মুসলিম তাহযীব তামাদ্দুনের প্রতি খেয়াল রেখে টেক্সট সংযোজন করা হতো। বর্তমানে আধুনিক শিক্ষা ও মাদরাসার বেলায় এমন পার্থক নেই বললেই চলে। সব ধর্মের শিক্ষার্থীরা যে ধর্মহীন বিষয়াবলী পড়ে, শিশু থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত মাদরাসার ক্ষেত্রেও একই বই পাঠ্য রয়েছে। যেটুকু বৈশিষ্ট্য মাদরাসার বেলায় আছে, সেটিও দূর করে একমুখী ভাবধারা চালু করার জন্য প্রতিনিয়ত চেষ্টা চলেছে।
সম্প্রতি একজন মাদরাসার প্রিন্সিপাল ২০২৬ সালে সরকার কর্তৃক পরিমার্জিত মাদরাসার নতুন পাঠ্য বইয়ের বিভিন্ন অসংগতি ও সমস্যা তুলে ধরে সংবাদপত্রে নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন। এতে মৌলিকভাবে যে কয়েকটি বিষয় উঠে এসেছে, তার মধ্যে বাংলাদেশের ৯০% মুসলমানের আকিদা বিশ্বাস, তাদের অনুসৃত হানাফি মাজহাব, তাদের সমাজ ও সংস্কৃতিতে হাজার বছর ধরে প্রচলিত সুন্নাহ, মুতাওয়াতার আমল, দীনি ট্রাডিশন ও পূর্বসূরীদের কনভেনশন, রীতি রেওয়াজ ইত্যাদি লঙ্ঘন করে একটি প্রান্তিক চিন্তার প্রতিফলন ঘটানো হয়েছে বলে বোঝা যাচ্ছে। উপমহাদেশে ব্রিটিশ যুগে জন্ম নেয়া একটি মাজহাব অস্বীকারকারী চিন্তা থেকে বর্তমান যুগে কিছুটা ব্যাপ্তি লাভকারী একটি ধারণা, ৯০% মুসলমানের কোরআন সুন্নাহ ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণাদি দিয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় কাজ আমল সুন্নাহ ও ঐতিহ্যকে বিতর্কিত এবং বাতিলযোগ্য প্রতীয়মান করার চেষ্টাও নানা অঙ্গনে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এই উগ্র ও বিচ্ছিন্ন চিন্তাধারার অনুসারীরা গত ১৪০০ বছরের উম্মাহর নন্দিত মনীষী ও মহানায়কদের আকিদা ও ধর্মীয় বিশ্বাসকে ভুল সাব্যস্ত করার দুঃসাহস দেখায়। তারা প্রশ্ন তুলে ফিকহের ইমামগণের আকিদা নিয়ে। মুসলিম জাতির জন্য আকিদা শাস্ত্র ব্যাখ্যা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়বস্তুর নির্মাতা ইলমুল কালামের ইমামগণের আকিদা নিয়ে। পঞ্চম শতাব্দির মুজাদ্দিদ হযরত ইমাম গাযালীর আকিদা নিয়ে। ক্রুসেডবিরোধী যুদ্ধের সফল সেনানায়ক বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয়ী গাজী সালাহউদ্দীন আইয়ুবির আকিদা নিয়ে। এমনকি দীর্ঘ ৬০০ বছর বিশ্ব মুসলিম খেলাফত ও বৈশ্বিক রাষ্ট্র কর্তৃত্বের নেতৃত্বদানকারী উসমানীয় প্রধান খলিফাদের আকিদা নিয়ে। আকিদার নতুন সংজ্ঞা তৈরি করে তারা অতীতের সব ইসলামী মহান ব্যক্তিত্ব ও নেতৃবৃন্দের ধর্মীয় বিশ্বাসকে সংশয়িত এবং ভ্রান্ত প্রমাণ করার প্রয়াস পায়। প্রতিষ্ঠিত ও প্রচলিত সুন্নাহকে তাদের নিজস্ব ব্যাখ্যা ও ধারণার আলোকে ভুল প্রমাণিত করে।
হানাফি মাজহাবের প্রামাণ্য ও প্রতিষ্ঠিত নানা আমলকে তারা ভিন্ন কোনো হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে ভুল প্রমাণিত করার চেষ্টা করে। মদীনা শরীফের অনুসৃত সাহাবী ও তাবেয়ী সমাজের নামাজ, ইবাদত, আমল আখলাককে নিজেদের উদ্দেশ্যমূলক রেফারেন্স দিয়ে বাতিল প্রমাণিত করে। অথচ, হাদীসের কিতাব গ্রন্থিত ও সংকলিত হওয়ার ২০০ বছর আগে থেকে মুজতাহিদ ইমাম ও ফকীহবৃন্দের নিকট গ্রহণযোগ্য ইবাদত ও আমলকে কখনো বিচ্ছিন্ন বর্ণনা বা সুন্নাহরূপে সাব্যস্ত নয় এমন বিচ্ছিন্ন হাদীসের বাহ্যিক শব্দের দ্বারা বাতিল ঘোষণা দেয়। এমনকি নবী করিম সা. এর নির্দেশিত সুন্নাহর আলোকে খোলাফায়ে রাশেদীন বিশেষ করে খলিফা উমর রা. ও তৃতীয় খলিফা হযরত ওসমান রা. এবং উম্মুল মুমেনীন হযরত আয়েশা রা. কর্তৃক জারীকৃত বিধিগত নির্দেশনাকে, যা সমস্ত সাহাবীগণ মেনে নিয়ে ইজমায় পরিণত করেছেন, সে হুকুমকেও (নাউজুুবিল্লাহ) অন্যায় ও বিদ‘আত বলার দুঃসাহস দেখায়। এরা নির্দ্বিধায় ৯০ ভাগ মুসলমানের নামাজ হয় না, ইবাদত হয় না, জানাজার নামাজ সহীহ হয় না বলে ফতোয়া দিয়ে থাকে। যদিও ইসলামের শুরু থেকে সাহাবীগণের আইন ব্যাখ্যায় নিজেদের মাজহাব ছিল। বর্তমানেও বিশ্বের সব মুসলমান উম্মাহর নিকট গ্রহণযোগ্য চারটি মাজহাবের অনুসারী। যেসব দেশে মাজহাব মানা হয় না বলে কেউ কেউ দাবি করে, সেসব দেশেও হাম্বলী মাজহাব রাষ্ট্রীয় মাজহাব হিসাবে স্বীকৃত। অনেক দেশে মালেকী ও শাফেয়ী মাজহাব অনুসরণ করা হয়। আর বিশ্বের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান হানাফি মাজহাবের অনুসারী।
২০২৬ সালের পরিমার্জিত মাদরাসার পাঠ্য বইয়ে এদেশের মুসলমানদের কোরআন হাদীসসম্মত আকিদা, তা‘আমুল, তাযকিয়া ও ইহসানকে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। অনেক জায়গায় স্পষ্ট হানাফি ফিকাহ বর্ণনা না করে অন্য হাদীস বা অন্য মাজহাবের শিক্ষা উল্লেখ করে কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের মনে দ্বিধা সংশয় তৈরির প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। যেমন, অনেক ইবাদত বা আমল এমন রয়েছে যা পালন করা একাধিক পন্থাই সুন্নাহসম্মত। তবে, শিক্ষার্থীদের পাঠ্য বইয়ে নিজের সমাজে প্রচলিত সুন্নাহ দৃঢ়ভাবে শিক্ষা দেওয়াই কর্তব্য। হাদীস বা ফিকাহ শাস্ত্রে উচ্চতর গবেষণার সময় কোনো শিক্ষার্থী সাবজেক্ট হিসাবেই তুলনামূলক ফিকাহ অধ্যয়ন করতে পারে। তখন সে নিজের সমাজের জন্য গ্রহণযোগ্য ও পালনীয় সুন্নাহ এবং ইসলামে বর্ণিত অন্যান্য সুন্নাহ সম্পর্কে উচ্চতর পড়াশোনার সুযোগ পাবে। এমন বিষয় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাঠ ও পরীক্ষায় থাকার বিষয় নয়। কোনো কোনো বইয়ে এমন সব ভুল বিষয়ও প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যা নিয়ে বিচ্ছিন্ন চিন্তার লোকজন এবং মুসলিম বিশ্ব ও বাংলাদেশের সাধারণ আলেম সমাজের মধ্যে ভিন্নমত শতবছর ধরে চলমান। প্রমাণাদি নিয়ে বাহাছ বিতর্কে বসলে এসব ভুল বিচ্ছিন্ন ও উদ্দেশ্যমূলক দাবি ধোপে টিকে না।
হাক্কানী, রাব্বানী আলেম সমাজ ইসলামে তাজকিয়া, ইহসান, আধ্যাত্মিকতা ও তরীকতে বিশ্বাসী। আরব আজমের সর্বত্র গত ১৪০০ বছর ধরেই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ এ নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। বিচ্ছিন্ন কোনো গ্রুপ বা উপদল যদি নিজেদের নেতা ও চিন্তাবিদদের তৈরি নতুন দলীল প্রমাণ বা সংজ্ঞার আলোকে গোটা মুসলিম উম্মাহর শরীয়াহ ও সুন্নাহসম্মত আকিদা, বিশ্বাস, আমল ও ইবাদতকে নিজেদের মনের মতো করে ভুল সাব্যস্ত করে, সেটা তাদের বলয়েই সীমাবদ্ধ বিষয়। যেমনটি অতীত যুগেও ব্যক্তির একক ধারণা ও আকিদার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতো। বৃহত্তর আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ তাদেরকে এসব আকিদার ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন ও পরিত্যাজ্য বলে গণ্য করেছেন। কিন্তু এমন ব্যক্তি কোনো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ফোরাম বা কমিটির মধ্যে এসব বিচ্ছিন্ন চিন্তা বহন করলে এবং এদের মাধ্যমে পাঠ্য বই সংশোধন, পরিমার্জন করানো হলে দেশ জাতি ও নতুন প্রজন্মের জন্য বিশাল ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী ও দায়িত্বশীল উর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দের উচিত আলোচনায় চলে আসা বিতর্কিত এসব বিষয় পুনর্মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা।
এ পর্যায়ে বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আব্দুল মালেক, কওমী ও আলিয়া থেকে সর্বজনমান্য শিক্ষাবিদ, জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি ও দেশের প্রকৃত জ্ঞানী ওলামায়ে কেরামের মাধ্যমে বিতর্কিত ও আলোচিত বিষয়গুলো পর্যালোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত করা।
২০২৬ সালের আলিয়া মাদরাসার পাঠ্য বই বাংলাদেশের ৯০ ভাগ মুসলমানের অনুসৃত সুন্নাহ, সঠিক আকিদা, রীতি, ঐতিহ্য, আধ্যত্মিকতা ও এই সমাজের অনুসৃত ফিকাহর আলোকে তৈরি হতে হবে। পাঠ্য বইকে ধারণ করতে হবে ৯০ ভাগ মুসলমানের আধ্যাত্মিক চেতনা।
মাদরাসার পাঠ্যবইয়ে নব্বই ভাগ মুসলমানের আধ্যাত্মিক চেতনাবিরোধী পরিমার্জন : শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়
উবায়দুর রহমান খান নদভী
দেশের প্রায় অর্ধেক মাদরাসা সরকারি কারিকুলাম ও পাঠ্যবই অনুসরণ করে। যদিও দীর্ঘদিন যাবত শিক্ষানীতি, জাতীয় পাঠ্যক্রম ও আমলাতান্ত্রিক নানা রীতি পদ্ধতির অনুসরণের নামে আলিয়া মাদরাসাকে ইসলামী শিক্ষা, সুন্নাহ অনুসরণ, আদব আখলাক ও তাহযীব তামাদ্দুনের যে বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিশেষায়িত মাদরাসা শিক্ষা চলার কথা, সেই ধারা থেকে বিচ্যুত করে ধর্মহীন ছাপযুক্ত সাধারণ শিক্ষার কাতারে নামিয়ে আনার একটি চেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে।
যেমন, পাঠ্যপুস্তকে অশোভনীয় ছবি, ভেতরের পাঠে ইসলামী তাহযীব তামাদ্দুন বিরোধী শব্দ, বাক্য, বর্ণনা ও গল্প এবং পাঠের ভেতর অমুসলিম নামের প্রাচুর্য, ইংরেজি পাঠ্য বইয়ে সালামের জায়গায় পশ্চিমা সংস্কৃতির শব্দ ব্যবহার, কথোপকথন শিক্ষায় হিন্দু ছেলের সাথে অকারণেই মুসলিম মেয়ের অংশগ্রহণ ইত্যাদি সূক্ষ্ম অশোভনীয় কারসাজি লক্ষ্য করা গেছে।
মাদরাসায় সরকারি সাধারণ নীতির আওতায় অমুসলিম শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগের চেষ্টা হয়েছে। প্রিন্সিপাল পদে বদলীর সুযোগে হিন্দু ভদ্রলোকও মাদরাসার প্রিন্সিপাল হয়েছেন। মাদরাসা বোর্ডের কথা তো বলারই অপেক্ষা রাখে না। মন্ত্রণালয়ের মাদরাসা বিভাগ অধিদপ্তর ও মাদরাসা বোর্ড কোনো প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও অমুসলিম কর্মকর্তায় ভরা। মাদরাসা শিক্ষক ও কর্মচারীদের সংগঠন বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীনকে বিগত সরকারের প্রায় পুরোটা সময় বিশেষ করে শেষ দিকে দুই সেক্যুলার চেতনায় বিশ্বাসী মন্ত্রীর সময়ে এসব অশোভনীয় ও অন্যায্য সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করে এবং বাস্তব ক্ষেত্রে নানা কৌশলে মাদরাসাকে হেফাজত করার কাজে লেগে থাকতে হয়েছে। এমনও সময় গেছে যে, ধর্মীয় বোধহীন শিক্ষামন্ত্রী, উপমন্ত্রী প্রভৃতির কাছে কথা বলা, স্বারকলিপি দেয়া বা আলোচনায় বসা পর্যন্ত ফলপ্রসূ ছিল না। কারণ, মাদরাসা সম্পর্কে তাদের কোনো মনোযোগ বা আগ্রহই ছিল না। মাদরাসায় মহিলা শিক্ষিকা ও অমুসলিম শিক্ষক দেয়ার আইনগত নির্দেশকে খুবই কৌশলে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য এই সংগঠনকে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়েছে। সারাদেশে উপরের শ্রেণীগুলোতে সহশিক্ষা মেনে নিতে হয়েছে। বড় বড় প্রতিষ্ঠান যাদের আর্থিক সংগতি ও সামাজিক শক্তি রয়েছে তারা নারী ও পুরুষ শিক্ষার্থীর জন্য আলাদা ক্যাম্পাস করতে সক্ষম হলেও সারাদেশের অনার্স কোর্স বা উচ্চ শ্রেণীর মাদরাসাগুলো সহশিক্ষা প্রচলনে বাধ্য হয়েছে।
ইতঃপূর্বে সাধারণ শিক্ষার সাথে মাদরাসা শিক্ষার পাঠ্য বইয়ে বিশেষায়িত শিক্ষা হওয়ার কারণে এক ধরনের উপস্থাপনগত পার্থক্য ছিল। যেমন, মাদরাসার ইংরেজি বইয়ে ইসলাম, আল্লাহর পরিচয়, রাসূল সা. এর বৈশিষ্ট্য, মুসলিম মনীষীদের আখলাক ও শিক্ষা বিষয়ক প্রবন্ধ থাকতো। অন্য বিষয়গুলোতেও মাদরাসার বইয়ে বোর্ড কর্তৃক মুসলিম তাহযীব তামাদ্দুনের প্রতি খেয়াল রেখে টেক্সট সংযোজন করা হতো। বর্তমানে আধুনিক শিক্ষা ও মাদরাসার বেলায় এমন পার্থক নেই বললেই চলে। সব ধর্মের শিক্ষার্থীরা যে ধর্মহীন বিষয়াবলী পড়ে, শিশু থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত মাদরাসার ক্ষেত্রেও একই বই পাঠ্য রয়েছে। যেটুকু বৈশিষ্ট্য মাদরাসার বেলায় আছে, সেটিও দূর করে একমুখী ভাবধারা চালু করার জন্য প্রতিনিয়ত চেষ্টা চলেছে।
সম্প্রতি একজন মাদরাসার প্রিন্সিপাল ২০২৬ সালে সরকার কর্তৃক পরিমার্জিত মাদরাসার নতুন পাঠ্য বইয়ের বিভিন্ন অসংগতি ও সমস্যা তুলে ধরে সংবাদপত্রে নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন। এতে মৌলিকভাবে যে কয়েকটি বিষয় উঠে এসেছে, তার মধ্যে বাংলাদেশের ৯০% মুসলমানের আকিদা বিশ্বাস, তাদের অনুসৃত হানাফি মাজহাব, তাদের সমাজ ও সংস্কৃতিতে হাজার বছর ধরে প্রচলিত সুন্নাহ, মুতাওয়াতার আমল, দীনি ট্রাডিশন ও পূর্বসূরীদের কনভেনশন, রীতি রেওয়াজ ইত্যাদি লঙ্ঘন করে একটি প্রান্তিক চিন্তার প্রতিফলন ঘটানো হয়েছে বলে বোঝা যাচ্ছে। উপমহাদেশে ব্রিটিশ যুগে জন্ম নেয়া একটি মাজহাব অস্বীকারকারী চিন্তা থেকে বর্তমান যুগে কিছুটা ব্যাপ্তি লাভকারী একটি ধারণা, ৯০% মুসলমানের কোরআন সুন্নাহ ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণাদি দিয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় কাজ আমল সুন্নাহ ও ঐতিহ্যকে বিতর্কিত এবং বাতিলযোগ্য প্রতীয়মান করার চেষ্টাও নানা অঙ্গনে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এই উগ্র ও বিচ্ছিন্ন চিন্তাধারার অনুসারীরা গত ১৪০০ বছরের উম্মাহর নন্দিত মনীষী ও মহানায়কদের আকিদা ও ধর্মীয় বিশ্বাসকে ভুল সাব্যস্ত করার দুঃসাহস দেখায়। তারা প্রশ্ন তুলে ফিকহের ইমামগণের আকিদা নিয়ে। মুসলিম জাতির জন্য আকিদা শাস্ত্র ব্যাখ্যা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়বস্তুর নির্মাতা ইলমুল কালামের ইমামগণের আকিদা নিয়ে। পঞ্চম শতাব্দির মুজাদ্দিদ হযরত ইমাম গাযালীর আকিদা নিয়ে। ক্রুসেডবিরোধী যুদ্ধের সফল সেনানায়ক বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয়ী গাজী সালাহউদ্দীন আইয়ুবির আকিদা নিয়ে। এমনকি দীর্ঘ ৬০০ বছর বিশ্ব মুসলিম খেলাফত ও বৈশ্বিক রাষ্ট্র কর্তৃত্বের নেতৃত্বদানকারী উসমানীয় প্রধান খলিফাদের আকিদা নিয়ে। আকিদার নতুন সংজ্ঞা তৈরি করে তারা অতীতের সব ইসলামী মহান ব্যক্তিত্ব ও নেতৃবৃন্দের ধর্মীয় বিশ্বাসকে সংশয়িত এবং ভ্রান্ত প্রমাণ করার প্রয়াস পায়। প্রতিষ্ঠিত ও প্রচলিত সুন্নাহকে তাদের নিজস্ব ব্যাখ্যা ও ধারণার আলোকে ভুল প্রমাণিত করে।
হানাফি মাজহাবের প্রামাণ্য ও প্রতিষ্ঠিত নানা আমলকে তারা ভিন্ন কোনো হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে ভুল প্রমাণিত করার চেষ্টা করে। মদীনা শরীফের অনুসৃত সাহাবী ও তাবেয়ী সমাজের নামাজ, ইবাদত, আমল আখলাককে নিজেদের উদ্দেশ্যমূলক রেফারেন্স দিয়ে বাতিল প্রমাণিত করে। অথচ, হাদীসের কিতাব গ্রন্থিত ও সংকলিত হওয়ার ২০০ বছর আগে থেকে মুজতাহিদ ইমাম ও ফকীহবৃন্দের নিকট গ্রহণযোগ্য ইবাদত ও আমলকে কখনো বিচ্ছিন্ন বর্ণনা বা সুন্নাহরূপে সাব্যস্ত নয় এমন বিচ্ছিন্ন হাদীসের বাহ্যিক শব্দের দ্বারা বাতিল ঘোষণা দেয়। এমনকি নবী করিম সা. এর নির্দেশিত সুন্নাহর আলোকে খোলাফায়ে রাশেদীন বিশেষ করে খলিফা উমর রা. ও তৃতীয় খলিফা হযরত ওসমান রা. এবং উম্মুল মুমেনীন হযরত আয়েশা রা. কর্তৃক জারীকৃত বিধিগত নির্দেশনাকে, যা সমস্ত সাহাবীগণ মেনে নিয়ে ইজমায় পরিণত করেছেন, সে হুকুমকেও (নাউজুুবিল্লাহ) অন্যায় ও বিদ‘আত বলার দুঃসাহস দেখায়। এরা নির্দ্বিধায় ৯০ ভাগ মুসলমানের নামাজ হয় না, ইবাদত হয় না, জানাজার নামাজ সহীহ হয় না বলে ফতোয়া দিয়ে থাকে। যদিও ইসলামের শুরু থেকে সাহাবীগণের আইন ব্যাখ্যায় নিজেদের মাজহাব ছিল। বর্তমানেও বিশ্বের সব মুসলমান উম্মাহর নিকট গ্রহণযোগ্য চারটি মাজহাবের অনুসারী। যেসব দেশে মাজহাব মানা হয় না বলে কেউ কেউ দাবি করে, সেসব দেশেও হাম্বলী মাজহাব রাষ্ট্রীয় মাজহাব হিসাবে স্বীকৃত। অনেক দেশে মালেকী ও শাফেয়ী মাজহাব অনুসরণ করা হয়। আর বিশ্বের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান হানাফি মাজহাবের অনুসারী।
২০২৬ সালের পরিমার্জিত মাদরাসার পাঠ্য বইয়ে এদেশের মুসলমানদের কোরআন হাদীসসম্মত আকিদা, তা‘আমুল, তাযকিয়া ও ইহসানকে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। অনেক জায়গায় স্পষ্ট হানাফি ফিকাহ বর্ণনা না করে অন্য হাদীস বা অন্য মাজহাবের শিক্ষা উল্লেখ করে কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের মনে দ্বিধা সংশয় তৈরির প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। যেমন, অনেক ইবাদত বা আমল এমন রয়েছে যা পালন করা একাধিক পন্থাই সুন্নাহসম্মত। তবে, শিক্ষার্থীদের পাঠ্য বইয়ে নিজের সমাজে প্রচলিত সুন্নাহ দৃঢ়ভাবে শিক্ষা দেওয়াই কর্তব্য। হাদীস বা ফিকাহ শাস্ত্রে উচ্চতর গবেষণার সময় কোনো শিক্ষার্থী সাবজেক্ট হিসাবেই তুলনামূলক ফিকাহ অধ্যয়ন করতে পারে। তখন সে নিজের সমাজের জন্য গ্রহণযোগ্য ও পালনীয় সুন্নাহ এবং ইসলামে বর্ণিত অন্যান্য সুন্নাহ সম্পর্কে উচ্চতর পড়াশোনার সুযোগ পাবে। এমন বিষয় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাঠ ও পরীক্ষায় থাকার বিষয় নয়। কোনো কোনো বইয়ে এমন সব ভুল বিষয়ও প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, যা নিয়ে বিচ্ছিন্ন চিন্তার লোকজন এবং মুসলিম বিশ্ব ও বাংলাদেশের সাধারণ আলেম সমাজের মধ্যে ভিন্নমত শতবছর ধরে চলমান। প্রমাণাদি নিয়ে বাহাছ বিতর্কে বসলে এসব ভুল বিচ্ছিন্ন ও উদ্দেশ্যমূলক দাবি ধোপে টিকে না।
হাক্কানী, রাব্বানী আলেম সমাজ ইসলামে তাজকিয়া, ইহসান, আধ্যাত্মিকতা ও তরীকতে বিশ্বাসী। আরব আজমের সর্বত্র গত ১৪০০ বছর ধরেই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ এ নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। বিচ্ছিন্ন কোনো গ্রুপ বা উপদল যদি নিজেদের নেতা ও চিন্তাবিদদের তৈরি নতুন দলীল প্রমাণ বা সংজ্ঞার আলোকে গোটা মুসলিম উম্মাহর শরীয়াহ ও সুন্নাহসম্মত আকিদা, বিশ্বাস, আমল ও ইবাদতকে নিজেদের মনের মতো করে ভুল সাব্যস্ত করে, সেটা তাদের বলয়েই সীমাবদ্ধ বিষয়। যেমনটি অতীত যুগেও ব্যক্তির একক ধারণা ও আকিদার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতো। বৃহত্তর আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ তাদেরকে এসব আকিদার ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন ও পরিত্যাজ্য বলে গণ্য করেছেন। কিন্তু এমন ব্যক্তি কোনো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ফোরাম বা কমিটির মধ্যে এসব বিচ্ছিন্ন চিন্তা বহন করলে এবং এদের মাধ্যমে পাঠ্য বই সংশোধন, পরিমার্জন করানো হলে দেশ জাতি ও নতুন প্রজন্মের জন্য বিশাল ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী ও দায়িত্বশীল উর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দের উচিত আলোচনায় চলে আসা বিতর্কিত এসব বিষয় পুনর্মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা।
এ পর্যায়ে বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আব্দুল মালেক, কওমী ও আলিয়া থেকে সর্বজনমান্য শিক্ষাবিদ, জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি ও দেশের প্রকৃত জ্ঞানী ওলামায়ে কেরামের মাধ্যমে বিতর্কিত ও আলোচিত বিষয়গুলো পর্যালোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত করা।
২০২৬ সালের আলিয়া মাদরাসার পাঠ্য বই বাংলাদেশের ৯০ ভাগ মুসলমানের অনুসৃত সুন্নাহ, সঠিক আকিদা, রীতি, ঐতিহ্য, আধ্যত্মিকতা ও এই সমাজের অনুসৃত ফিকাহর আলোকে তৈরি হতে হবে। পাঠ্য বইকে ধারণ করতে হবে ৯০ ভাগ মুসলমানের আধ্যাত্মিক চেতনা।