Image description

চট্টগ্রাম বন্দরকে বলা হয় দেশের অর্থনীতির লাইফ লাইন এবং হৃৎপি-। প্রধান এই সমুদ্র বন্দরের ‘হৃৎপি-’ নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)। এনসিটিকে দুবাইভিত্তিক বিদেশি ডিপি ওয়ার্ল্ড কোম্পানির হাতে ইজারায় ছেড়ে দিতে উঠেপড়ে লাগে তৎকালীন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তবর্তীকালীন সরকার। ঝটিকা বেগে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির জন্য মরিয়া হয়ে তৎপরতা চলে বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্ব পর্যন্ত। চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারী, সামাজিক, পেশাজীবী, ছাত্র ও রাজনৈতিক মহলের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন-অবরোধ বিক্ষোভ-ঘেরাও-প্রতিরোধের মুখে শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয় অন্তর্বর্তী ড. ইউনূস সরকার। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নিলেও তখন তড়িঘড়ি এবং যেনতেন প্রকারে চুক্তির লক্ষ্যে নেয়া সেই পদক্ষেপের ‘লেজ’ এখনও রয়ে গেছে। চট্টগ্রাম বন্দরের নিরবচ্ছিন্ন লাভজনক এবং দেশের ভূ-প্রাকৃতিক কৌশলগত নিরাপত্তার কারণে খুবই স্পর্শকাতর এনসিটি এবং আরো বিভিন্ন কয়েকটি বন্দরের স্থাপনা বিদেশি কোম্পানির কাছে ইজারায় তুলে দেয়ার দেয়ার লক্ষ্যে নানান কারসাজি থামেনি।

বহুল আলোচিত বিতর্কিত দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ড ছাড়াও সউদী আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালও (আরএসজিটি) এনসিটি এবং আরো দুই টার্মিনাল পরিচালনায় পেতে নানামুখী চেষ্টা চালাচ্ছে। এমনকি এর সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে এদেশীয় সিন্ডিকেটও। তারা বন্দরের টার্মিনালগুলো ইজারা অথবা ছকে বাঁধা তথাকথিত টেন্ডারের নামে নিয়ন্ত্রণ লাভে তোড়জোড় চালাচ্ছে। এ বিষয়ে সরকারের প্রস্তুতি-প্রক্রিয়া চলছে মর্মে একটা প্রচার বা আবহ তৈরি করছে। যাতে তাদের টার্গেট হাসিল করা যায়। যদিও সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দর সফরকালে নৌ পরিবহনমন্ত্রী বলেছেন, কোনো বিদেশি অপারেটরের কাছে চট্টগ্রাম বন্দর হস্তান্তরের পরিকল্পনা সরকারের নেই। ডিপি ওয়ার্ল্ডসহ বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানি কিছু প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানান তিনি।

এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রধান টার্মিনালগুলো ইজারা প্রদান নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ধুম্রজাল। দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালগুলোর নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত বিদেশি কোম্পানি এবং তাদের দেশীয় সিন্ডিকেট অথবা এজেন্টের হাতে তুলে দেয়ার আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেপথ্যে এগিয়ে নেয়া হচ্ছে কিনাÑ পোর্ট শিপিং সংশ্লিষ্ট মহলে এমন প্রশ্ন সন্দেহ ঘুরপাক খাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকেও বিষয়টি এখনো পরিষ্কার করা হয়নি। এ প্রসঙ্গে বিএনপির জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক চট্টগ্রাম বন্দর সিবিএ সেক্রেটারি শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) চট্টগ্রামের অন্যতম শীর্ষ নেতা কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার গতকাল মঙ্গলবার দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, আমরা জনগণকে নিয়ে রাজপথে দুর্বার আন্দোলনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি বিদেশি ডিপি ওয়ার্ল্ড কোম্পানির কাছে ইজারাদানে ফ্যাসিস্ট হাসিনার অপচেষ্টা ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দিয়েছি। এরপর ড. ইউনূস সরকালের আমলেও এনসিটি ইজারার চক্রান্ত তীব্র আন্দোলনের মাধ্যমে প্রতিরোধ করেছি।

তিনি বলেন, আমরা এখনো দেখছি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরের স্থাপনা ইজারাদানে তৎপর থাকা সেই আশিক চৌধুরীরা বর্তমান সরকারের সময়েও আবারো সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কুচক্রী সিন্ডিকেট। এবারো যদি বন্দরের প্রাণ এনসিটি, সিসিটি, জিসিবিসহ বন্দরের কোনো স্থাপনা বা টার্মিনাল বিদেশি কিংবা তাদের এদেশীয় সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দেয়ার পাঁয়তারা করা হয় তাহলে শ্রমিক-কর্মচারী-জনতা পুনরায় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। আমরা আশা করি, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমানে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হবে। আশা করি তারা আগের দুই সরকারের দেশবিরোধী সিদ্ধান্ত বাতিল করবেন। আগামীকাল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে স্কপ-এর সংবাদ সম্মেলন থেকে এর বিরুদ্ধে শ্রমিক-কর্মচারী সংগঠনসমূহের এ ব্যাপারে অবস্থান, আন্দোলনের কৌশল এবং ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ঘোষণা আসতে পারে বলে জানান তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের মূল কন্টেইনার স্থাপনা নিউমুরিংসহ প্রধান টার্মিনালগুলো কব্জা করে নিতে এখন পর্যন্ত পিছু ছাড়েনি বিদেশি ডিপি ওয়ার্ল্ডের ভূত! সর্ববৃহৎ ও লাভজনক প্রধান কন্টেইনার স্থাপনা নিউমুরিং শুধুই নয়; বন্দরের সঞ্চিত মুনাফা বাবদ নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত ও পরিচালিত চিটাগাং কন্টেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) জেনারেল কার্গো বার্থও (জিসিবি) হাতছাড়া করতে ব্যাপক তৎপর সুযোগসন্ধানী সিন্ডিকেট। অথচ যেই বন্দরের টার্মিনাল ইজারা কিংবা দরপত্রে ছেড়ে দেয়ার লক্ষ্যে ঢাকায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং পিপিপি (প্রাইভেট পাবলিক পার্টনারশিপ) কর্তৃপক্ষ কেন্দ্রিক এতই আয়োজন, তার নেপথ্যে কী ঘটছে অন্ধকারে রাখা হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে (চবক)
চট্টগ্রাম বন্দরের প্রাণ বা হৃৎপি- এনসিটির সঙ্গে যদি সিসিটি এবং জিসিবি অর্থাৎ সবক’টি টার্মিনালকে বিদেশি কোনো না কোনো কোম্পানি অথবা দেশীয় সিন্ডিকেটের কাছে ছেড়ে দিয়ে হাতছাড়া করা হয় তাহলে বন্দরের হাতে থাকছে না আর কোনোই কন্টেইনার টার্মিনাল। যার অর্থ দাঁড়াচ্ছে হাজার বছরের চট্টগ্রাম বন্দরের অস্তিত্ব বিপন্ন ও অবলুপ্তির দিকেই ঠেলে দেয়া। তাছাড়া বিগত ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে চুক্তির শর্তাবলি গোপন রেখে ঢাকায় তড়িঘড়ি ঝটিকা চুক্তির মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরের নিজস্ব অর্থায়নে পরিকল্পিত লালদিয়ার চর টার্মিনাল প্রকল্প এবং ঢাকার পানগাঁও চালু টার্মিনাল দু’টি বিদেশি কোম্পানির কাছে দীর্ঘমেয়াদি ইজারায় ছেড়ে দিয়েছে

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের প্রধান স্থাপনা এনসিটি ছাড়াও চিটাগং কন্টেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) এবং জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) পরিচালনা বা নিয়ন্ত্রণ লাভে সরাসরি প্রতিযোগিতায় নেমেছে দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ড এবং সউদী আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালস (আরএসজিটি) কোম্পানি। তারা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে টার্মিনালগুলো পেতে তৎপরতা চালাচ্ছে। এ ব্যাপারে গত ৮ এপ্রিল দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-দুবাই একটি প্ল্যাটফর্ম সভায় সিসিটি পরিচালনার প্রস্তাব দেয় দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ড। আবার এর দুই সপ্তাহ পর ২২ এপ্রিল সউদী আরবের সরকারি-বেসরকারি যৌথ মালিকানাধীন রেড সী গেটওয়ে টার্মিনাল (আরএসজিটি) সিসিটি টার্মিনাল পরিচালনার লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবপত্র জমা দেয়।

এর আগে ২০২৪ সালে সউদী আরবের আরএসজিটি পতেঙ্গা কনটেইনার (পিসিটি) টার্মিনাল ২২ বছরের জন্য ইজারায় পরিচালনার কাজটি পায়। নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারাদানের পুরনো প্রক্রিয়া এখনো অব্যাহত আছে। এনসিটি, সিসিটি এবং জিসিবি ইজারায় কিংবা ছকে বাঁধা ফরমায়েশি দরপত্রে পেতে দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ড এবং সউদী আরএসজিটি’র রশি টানাটানির মাঝখানে পড়ে অনর্থক বিতর্কে জড়িয়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থহানির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে এমনটি শঙ্কা বন্দর-সংশ্লিষ্টদের। বর্তমান নির্বাচিত বিএনপি সরকার সেই ধরনের অনাহুত বিতর্কে জড়াতে চাইবে কিনা সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

চট্টগ্রাম বন্দরের হিসাব মতে, গত বছর চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কন্টেইনারের ৪৪ শতাংশ এনসিটিতে, ৩৬ শতাংশ জিসিবিতে, ১৬ শতাংশ সিসিটিতে এবং প্রায় ৪ শতাংশ পতেঙ্গা টার্মিনালে হ্যান্ডলিং করা হয়েছে। বিদেশিদের কাছে ইজারার প্রস্তাব অনুযায়ী এনসিটি এবং সিসিটি একীভূত হয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে গেলে তাদেরই নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে ৬০ শতাংশ কন্টেইনার। সিসিটি এবং জিসিবি একীভূত হলে সউদী আরএসজিটির কাছে ইজারায় চলে গেলে তাদের নিয়ন্ত্রণে যাবে ৫৫ শতাংশ কন্টেইনার। উভয় ক্ষেত্রেই চট্টগ্রাম বন্দরের অস্তিত্ব নিয়ে টানাটানি হবে। উক্ত দুই বিদেশি কোম্পানি ছাড়াও দেশীয় বহুজাতিক এমজিএইচ গ্রুপও চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল পেতে তৎপরতা চালাচ্ছে। গত বছর মার্চে এমজিএইচ গ্রুপ সিসিটি পরিচালনার প্রস্তাব দেয়। এরপর গত ২৮ এপ্রিল নিউমুরিং টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার জন্য নতুন করে প্রস্তাব জমা দিয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের হিসাব অনুযায়ী গত ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে ৩৪ লাখ ৯ হাজার টিইইউএস কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়েছে। এর মধ্যে নিউ মুরিং (এনসিটি) হ্যান্ডলিং করেছে ১৩ লাখ ২১ হাজার টিইইউএস, জিসিবি ১০ লাখ ৮৩ হাজার, সিসিটি ৪ লাখ ৮৩ হাজার এবং পিসিটি ১ লাখ ৫৩ হাজার টিইইউএস কন্টেইনার। গত বছরের ১৭ জুলাই থেকে এনসিটি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর পরিচালিত প্রতিষ্ঠান চিটাগাং ড্রাইডকের মাধ্যমে লাভজনক, দক্ষ ও স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে। এতে বন্দর ব্যবহারকারীরা (স্টেক হোল্ডারগণ) এবং বন্দর কর্তৃপক্ষও সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। নিউমুরিং টার্মিনালের অবস্থান চট্টগ্রামে নৌবাহিনীর প্রধান ঘাঁটির সঙ্গে ঠিক লাগোয়া। এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশের নিরাপত্তা সম্পর্কিত স্পর্শকাতর দিক রয়েছে।

নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনালকে (এনসিটি) দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ড কোম্পানির কাছে ইজারায় ছেড়ে দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল গণঅভ্যুত্থানে উৎখাত পলাতক শেখ হাসিনার আমলে (২০২৩-২৪ সালে)। এর সঙ্গে স্বার্থের ভাগবাটোয়ারায় সম্পৃক্ত ছিল পুরো শেখ পরিবার। ফ্যাসিবাদী হাসিনা-অলিগার্কের সেই জাতীয় স্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত কেন ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার কী মোহে বাস্তবায়ন করতে উঠেপড়ে লেগেছিল তা নিয়ে জোরালো প্রশ্ন-বিতর্ক ও সন্দেহ ওঠে। এর বিরুদ্ধে ক্ষোভ-অসন্তোষ প্রতিবাদে রাজপথে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে শ্রমিক-কর্মচারী জোটসহ বিভিন্ন সংগঠন এবং ‘চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটি’। অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের পরও কেন কাদের স্বার্থে এবং কারসাজিতে আবারো নতুন করে বিদেশি কোম্পানি অথবা তাদের এদেশীয় সিন্ডিকেটের হাতে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রধান স্থাপনা ও সবচেয়ে লাভজনক এনসিটিসহ সিসিটি, জিসিবি ইজারায় তুলে দেয়ার পাঁয়তারা চলছে তা নিয়ে বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের মাঝে ক্ষোভ-অসন্তোষ-সন্দেহ ক্রমেই দানা বেঁধে উঠেছে। এর দ্রুত সুরাহা না হলে ফের আন্দোলন-বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠতে পারে চট্টগ্রাম বন্দর।