Image description

বাংলাদেশে পরিবেশ দূষণ এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বছরের অধিকাংশ সময় ঢাকা বিশ্বের বায়ুদূষণের শহরের তালিকায় শীর্ষে থাকছে। রাজধানী ঢাকার প্রাণখ্যাত বুড়িগঙ্গাসহ এর চারপাশের তুরাগ, বালু, এসব নদী বর্জ্য ও ক্যামিকেল দূষণে মৃত। নিষিদ্ধ পলিথিন ও প্লাস্টিক যা নদী, মাটি, বায়ু: সব কিছু ধ্বংস করছে তার উৎপাদন ও বিপণনও চলছে অবাধে।

পুরান ঢাকার অলি-গলিতে, বিশেষ করে চকবাজার, ইসলামবাগ, শহীদনগর, কামরাঙ্গীরচর এবং এর আশেপাশের এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে অসংখ্য প্লাস্টিক কারখানা ও গুদাম গড়ে ওঠেছে। ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকার এসব কারখানা পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই চলছে। এ ছাড়া কোনো ধরনের অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদন ও সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এসব অবৈধ করাখানার অপরিশোধিত বর্জ্য ও বিষাক্ত ধোঁয়া পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে। করাখানার অপরিশোধিত বর্জ্য নদীতে মিশে পানিকে বিষাক্ত করছে, নদীর মৃত্যু ডেকে আনছে। নিষিদ্ধ পলিথিন ও প্লাস্টিকের অবৈধ কারখানা বন্ধে যাদের দায়িত্ব পালনের কথা, সেই পরিবেশ অধিদপ্তর জেগে জেগে ঘুমাচ্ছে। বাস্তবে এ অধিদপ্তরের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার দুর্নীতির কারণে এসব অবৈধ কারখানা অবাধে চলছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবি তাদের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলেছে, ‘দেশে পরিবেশ দূষণের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে পরিবেশ অধিদপ্তর। দূষণ সৃষ্টিকারী শিল্পকারখানাকে ঘুষের বিনিময়ে পরিবেশগত ছাড়পত্র দিচ্ছে সরকারি প্রতিষ্ঠানটি। এর ফলে পরিবেশ দূষণ বেড়ে চলছে, পাশাপাশি বাড়ছে ক্ষতি ও মানুষের মৃত্যুঝুঁকি। তাদের এ প্রতিবেদন প্রকাশের পরও পরিবেশ অধিদপ্তরের ভূমিকার কোনো পরিবর্তন হয়নি। এখনো বিভিন্ন শিল্পকারখানার পরিবেশগত ছাড়পত্র পেতে নিয়মবহির্ভূত অবৈধ লেনদেন করতে হচ্ছে। টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, পরিবেশগত ছাড়পত্র পেতে ৬৬ শতাংশ শিল্পকারখানাকে নিয়মবহির্ভূতভাবে অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়। শ্রেণিভেদে এই অর্থের পরিমাণ ৩৬ হাজার থেকে এক লাখ ৯ হাজার টাকা পর্যন্ত। এ ছাড়া আবাসিক এলাকায় শিল্পকারখানা স্থাপনের আইনি বিধান না থাকলেও ৭২ শতাংশ কারখানার অবস্থান আবাসিক এলাকায়।

 অবৈধ অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে এটি করা হয়।’ টিঅইবির সেই প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরিবেশ উপদেষ্টা এসে পলিথিনের বিরুদ্ধে এক ধরনের যুদ্ধ ঘোষণা করে ছিলেন। তবে তার এই হাঁকডাকও ছিল কেবল ফাঁকা আওয়াজ। উল্টো সে সময় বিভিন্ন অভিযানের নামে অবৈধ লেনদেনের পরিমাণ আরো বেড়েছে। পুরান ঢাকার ইসলামপুরের এক পলিথিন কারখানার মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো ছাড়পত্র আমাদের দেয়া হয় না। তবে অধিদপ্তরের পরিদর্শক যারা আছেন তাদের সাথে আমাদের মাসোহারা চুক্তি আছে। এর পরিমাণ কারখানা ভেদে ৫০ হাজার টাকা থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত আছে। ঢাকার চকবাজার, ইসলামবাগ, শহীদনগর, কামরাঙ্গীরচর ও এর আশপাশের এলাকায় ছোট-বড় তিন থেকে সাড়ে ৩০০ কারখানা আছে। সে হিসাবে এ এলাকা থেকে প্রতি মাসে দুই থেকে আড়াই কোটি টাকা পরিবেশ অধিদপ্তরের লোকদের দেয়া হয়। ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে যে মৌলিক ভূমিকা তা পালনে পরিবেশ অধিদপ্তর ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। সর্ষের মধ্যে ভূত রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের কারণে উল্টো পরিবেশ দূষণ বাড়ছে।

অন্যদিকে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক টিমের অনুসন্ধানেও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন: এমন তথ্য ওঠে এসেছে। উৎকোচ নিয়ে পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকা- জেনেও অধিপ্তরের অসাধু কর্মকর্তারা নিশ্চুপ থাকছেন। দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বেশির ভাগ শিল্প প্রতিষ্ঠানে তরল বর্জ্য পদার্থ পরিশোধনে এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট-ইটিপি না থাকলেও উৎকোচ নিয়ে ছাড়পত্র দিয়ে দেয় পরিবেশ অধিদপ্তর। ইটভাটা চালানোর জন্য লাইসেন্স দেয়ার ক্ষেত্রেও নিয়ম-নীতি মানেন না অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। এ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতির কারণে নদ-নদী, খাল আরো বেশি দূষিত হচ্ছে। ক্রমে পরিবেশ পরিস্থিতি আরো অবনতির দিকে যাচ্ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নেও দুর্নীতি ও গরমিল পেয়েছে দুদক। অনুসন্ধান প্রতিবেদনে দুর্নীতির উৎস প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে গিয়ে কয়েকটি প্রকল্পে অনিয়মের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। তার মধ্যে একটি ‘নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ’ শীর্ষক প্রকল্প। এ প্রকল্পের জন্য প্রায় ৪০০ কোটি টাকার প্রাক্কলন ব্যয় ধরা হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে নি¤œমানের কাজ করা হয়েছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাজ না করেই ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। ‘বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল ইনস্টিটিউশনাল স্ট্রেংদেনিং প্রজেক্ট’ নামের আরেকটি প্রকল্পেও অসামঞ্জস্যতার তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ইটভাটার লাইসেন্স ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত ছাড়পত্র দেয়ার ক্ষেত্রে দুর্নীতি হচ্ছে বলেও দুদকের অনুসন্ধানে ওঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বেশির ভাগ ইটভাটা আইনের বিধান লঙ্ঘন করছে। তারা জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার করছে। আইনের বিধানে নিষিদ্ধ: এমন এলাকায় ইটভাটা করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে যথাযথ কর্তৃপক্ষ লাইসেন্সও দিয়ে দিচ্ছে। লাইসেন্স গ্রহণের সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা নিষিদ্ধ এলাকায় ইটভাটা গড়ে তুলছে। এতে পরিবেশের বিপর্যয় ঘটছে। এক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিদর্শন কমিটির তৎপরতা আশানুরূপ নয়। পরিদর্শন কমিটির সদস্যরা ব্যক্তিগত লাভের আশায় এসব অনিয়ম দেখেও উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সুপারিশ করেন না। দুই বছর আগে দুদক এসব দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রতিবেদন দিলেও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে পরিবেশ মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বিভাগীয় কিংবা আইনগত কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। যার ফলে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এখনো তাদের অনৈতিক কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছে।

এখনো পরিবেশগত ছাড়পত্র দেয়া এবং তা নবায়নের ক্ষেত্রে অবৈধ সুবিধা নিচ্ছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। দেশের বেশির ভাগ বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানেই তরল বর্জ্য পদার্থ পরিশোধনে এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট-ইটিপি নেই। ফলে বর্জ্য পরিশোধনের অভাবে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। অথচ নিয়ম-নীতি ও শর্তভঙ্গ করা শিল্প-কারখানাকে পরিবেশগত ছাড়পত্র দিয়ে দিচ্ছেন কর্মকর্তারা। পরে তা নবায়নও করে দিচ্ছেন। ছাড়পত্রের শর্ত ভঙ্গ করা হয়েছে কি-না, তা যাচাই না করেই আর্থিক সুবিধা পেয়ে অফিসে বসে ছাড়পত্র প্রদান ও নবায়ন করা হয়। এসব ক্ষেত্রে কর্মকর্তারা লাখ লাখ টাকা ঘুষ নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে হিডেন ইকোনমির আওতায় প্রতিষ্ঠিত শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিবেশ দূষণ করছে। পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সরকারের অন্যান্য সম্পৃক্ত দাপ্তরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেই স্বার্থান্বেষী মহল বিধি-বহির্ভূতভাবে যত্রতত্র শিল্প-কারখানা, ইটভাটা গড়ে তুলছে। এসব শিল্প-কারখানা থেকে সৃষ্ট বর্জ্য ও নির্গত বিষাক্ত গ্যাস ও ধোঁয়া পরিবেশের বিপর্যয় ঘটাচ্ছে। বলা যায়, পরিবেশ অধিদপ্তর এখন দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। এ বিষয়ে বক্তব্য নেয়ার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমানের মুটোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করেও পাওয়া যায়নি।

পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনের অন্যতম নেতা পরিবেশ রক্ষায় আমরা-ধরা’র সদস্য সচিব শরিফ জামিল বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের অনিয়ম-দুর্নীতি এবং তাদের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকার বিষয়টি এখন অনেকটাই ওপেন সিক্রেট। আসলে দেশে সুশাসনের অভাবই এ জন্য দায়ী। পরিবেশ অধিদপ্তরে অনিয়ম-দুর্নীতি ও নীতিহীনতার অভাব যেমন রয়েছে, তেমনি তাদের সক্ষমতারও অভাব রয়েছে। সব মিলিয়ে বলতে হয়, পরিবেশ দূষণের বিষয়টি এবং এর রক্ষার যে গুরুত্ব তা কোনো সরকারই যথাযথভাবে মূল্যায়ন করেনি। সব সরকারই এ বিষয়টিকে অগ্রাধিকার না নিয়ে গতানুগতিক কাজের পর্যায়ে রেখেছে। এ জন্য এটি এখন মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে। আমরা আশা করব, বর্তমান সরকার পরিবেশ দূষণ রোধকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে এবং দেশকে নানান দুর্যোগের কবল থেকে রক্ষা করবে।