ক্ষমতাসীন বিএনপি সাংগঠনিক কার্যক্রম গতিশীল ও শক্তিশালী করতে দলীয় অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে দলটির ১১ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের ১০টিরই কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। দলীয় গঠনতন্ত্রে নির্ধারিত মেয়াদ শেষে নতুন কমিটি গঠনের বিধান থাকলেও দীর্ঘদিন তা বাস্তবায়িত হয়নি। এতে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নেতৃত্বের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা ব্যাহত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন। এ ছাড়া জাতীয়তাবাদী যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ নেতার অনেকেই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় তাঁদের কাজের চাপ বেড়েছে। ফলে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া তাঁদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। এ বাস্তবতায় সাংগঠনিক কার্যক্রম সচল রাখা এবং নতুন নেতৃত্ব তৈরি করার লক্ষ্যেই শিগগির যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠনের পরিকল্পনা করছে বিএনপি। জনতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘দলীয় অঙ্গসংগঠনের পুনর্গঠনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দায়িত্বশীল নেতাদের নিয়ে এজন্য কাজ করছেন। আশা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যেই অঙ্গসংগঠনগুলোর পুনর্গঠন সম্পন্ন হবে।’ সূত্র জানান, এপ্রিলের শুরুতেই অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো ঢেলে সাজানোর কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন সংগঠনের দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এসব বৈঠকে তিনি সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও কার্যকর ও জনমুখী করার দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। বৈঠক থেকে এমন আভাসও মিলেছে যে এবার নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে ত্যাগী, যোগ্য ও তরুণ নেতৃত্ব সামনে আনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে দলটি। অঙ্গসংগঠনগুলোর পুনর্গঠনের খবরে দলের নেতা-কর্মীর মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন পদ পেতে আগ্রহীদের তৎপরতাও বেড়েছে কয়েক গুণ। বিশেষ করে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের সম্ভাব্য পদপ্রত্যাশীরা নিজেদের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা এবং ত্যাগের ইতিহাস বিএনপির হাইকমান্ড ও নীতিনির্ধারকদের কাছে তুলে ধরছেন। অনেকের ধারণা, ঈদুল আজহার আগেই বা পরপরই নতুন কমিটি ঘোষণা হতে পারে। ফলে জীবনবৃত্তান্ত প্রস্তুত, যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং তদবির-লবিং এখন অঙ্গসংগঠনগুলোর রাজনীতিতে আলোচিত বাস্তবতা হয়ে উঠেছে।
যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী মহিলা দল, কৃষক দল, তাঁতী দল, মৎস্যজীবী দল, মুক্তিযোদ্ধা দল, জাসাস ও ওলামা দল নিয়েও কাজ করছেন দায়িত্বশীল নেতারা। বিএনপির অঙ্গসংগঠনগুলোর সাংগঠনিক অভিভাবক হিসেবে তারেক রহমান এবার বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। যোগ্য, ত্যাগী এবং তুলনামূলক তরুণ নেতৃত্বের হাতে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের দায়িত্ব তুলে দেওয়ার চিন্তা রয়েছে তাঁর। সে ধারাবাহিকতায় গতকাল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের বিভিন্ন সাংগঠনিক ইউনিটের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে ঢাকায় মতবিনিময় করেছেন।
২০২৪ সালে আবদুল মোনায়েম মুন্নাকে সভাপতি এবং নুরুল ইসলাম নয়নকে সাধারণ সম্পাদক করে জাতীয়তাবাদী যুবদলের আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। প্রায় ২২ মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা সম্ভব হয়নি। এরই মধ্যে সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। যুবদলের একাধিক নেতা মনে করছেন, অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময়েও পূর্ণাঙ্গ কমিটি না হওয়া বর্তমান নেতৃত্বের সাংগঠনিক দুর্বলতাই সামনে এনেছে। কয়েক মাস আগে ১৫১ সদস্যের একটি কমিটি অনুমোদনের জন্য বিএনপির হাইকমান্ডে জমা দেওয়া হলেও সেটিকে কেউ কেউ ‘মাইম্যান কমিটি’ হিসেবে সমালোচনা করেছেন। ফলে নতুন নেতৃত্বে যুবদলের পুনর্গঠনের দাবি এখন আরও জোরালো হয়েছে।
বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পাশাপাশি যুবদলের শীর্ষ দুই পদে সংগঠনটির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি মামুন হাসান, সাবেক প্রথম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা শাহীন ছাড়া আরও যাঁদের নাম আলোচনায় রয়েছে তাঁদের মধ্যে সংগঠনের সাবেক সহসভাপতি রুহুল আমিন আকিল, মাহবুবুল হাসান পিংকু, দীপু সরকার, কামরুজ্জামান দুলাল ছাড়াও বর্তমান কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি রেজাউল কবীর পল, ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান মিন্টু, সাইদ ইকবাল টিটু, ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন, সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল, সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ এবং সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল।
তৃণমূল নেতা-কর্মীর মধ্যে এমন গুঞ্জনও রয়েছে যে ছাত্রদলের শ্রাবণ-জুয়েল কমিটি বিলুপ্ত হওয়ার পর এখন পর্যন্ত সাইফ মাহমুদ জুয়েলকে বিএনপির নির্বাহী কমিটিসহ কোথাও পদায়ন করা হয়নি। ফলে তাঁকে যুবদল অথবা স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ দুই পদের একটিতে দেখা যেতে পারে বলে ধারণা করছেন অনেকে। একই সঙ্গে যুবদলের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি মামুন হাসানকে ঢাকা মহানগরী উত্তর বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ পদে এবং ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান মিন্টুকে বিএনপির পরবর্তী কাউন্সিলে বড় দায়িত্বে দেখা যেতে পারে বলেও আলোচনা রয়েছে।
জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ দুই পদে বর্তমান কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি ইয়াছিন আলী, সহসভাপতি ফখরুল ইসলাম রবীন, সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান, ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সভাপতি জহির উদ্দিন তুহিন ছাড়াও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আহ্বায়ক শেখ ফরিদ হোসেনসহ ঢাকা দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলামের নামও শোনা যাচ্ছে। অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের শীর্ষ দুই পদে সম্ভাব্য নেতৃত্ব হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন শ্যামল মালুম, আমান উল্লাহ আমান, মো. খোরশেদ আলম সোহেল, সালেহ মো. আদনান, এইচ এম আবু জাফর, শরীফ প্রধান শুভ, মনজুরুল আলম রিয়াদ, মো. ফারুক হোসেন, ইজাজুল কবির রুয়েল, মোস্তাফিজুর রহমান, মমিনুল ইসলাম জিসান, ফারুক হোসেন, কাজী জিয়া উদ্দিন বাসিত, আজিজুল হক জিয়ন, ডা. আউয়ালসহ কয়েকজন।