Image description

কীভাবে খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল তা সবার জানা। তবে কোথায় পরিকল্পনা হয়েছিল, কারা এর পেছনে জড়িত ছিলেন- নতুন অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে। শুধু তাই নয়, উচ্ছেদ অভিযানের দিন সেনাপ্রধান ও কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল সেদিন কোথায় ছিলেন তা নিয়েও অপার রহস্য।

অনুসন্ধানে জানা যায়, পরিকল্পিতভাবে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে আপিলের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত করা হয়। সে জন্য ছুটির দিনটিই বেছে নেয়া হয়। শেখ হাসিনা কীভাবে এবং কোথা থেকে সরাসরি উচ্ছেদ কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করেছিলেন তাও অনুসন্ধানে খোলাসা হয়েছে। শেখ হাসিনা ও বেগম জিয়ার মধ্যে শুরু থেকেই তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। একপর্যায়ে তা ব্যক্তিগত আক্রোশে রূপ নেয়। যা হাসিনার কথাতেই স্পষ্ট হয়েছে বহুবার। কিন্তু বেগম জিয়াকে কখনো কোনো বিষয়েই বিরূপ মন্তব্য করতে দেখা যায়নি। হাসিনার আক্রোশের মাত্রা বেড়ে যায় বিশেষ করে ২০০৮ সনের নির্বাচনের পর। যে বাড়িতে বেগম জিয়া তিন দশকেরও বেশি সময় ছিলেন, সে বাড়ি থেকে তাকে উচ্ছেদ করতে হাসিনা একবারও দ্বিধা করেননি। এই বাড়িতেই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান থেকেছেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বেড়ে উঠেছেন।

তবে হাসিনা ভাবেননি উচ্ছেদের ফল কী হতে পারে। এখন হাসিনা বিদেশে নির্বাসিত, দিল্লির মেহমান। আর বেগম জিয়ার ছেলে তারেক রহমান রাষ্ট্র ক্ষমতায়। এটাই কি নিয়তি! ২০০৯ সনের ৮ই এপ্রিল মন্ত্রিসভার বৈঠকে মইনুল রোডের বাড়ির বরাদ্দ বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়। বলা হয়, কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিকে সেনানিবাস এলাকায় ইজারা দেয়া যায় না। এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে উচ্ছেদ সংক্রান্ত নোটিশ জারি করা হয়। এ নিয়ে তখন শুরু হয় আইনি লড়াই। উচ্ছেদের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ করায় কয়েক দফা স্থগিতাদেশও দেন আদালত। একপর্যায়ের ২০১০ সনের ১৩ই অক্টোবর উচ্ছেদের সিদ্ধান্তই বহাল রাখেন আদালত। বিচারপতি ছিলেন নাজমুন আরা সুলতানা এবং শেখ হাসান আরিফ। চিফ প্রসিকিউটর ছিলেন মাহবুবে আলম। ২০১০-এর ১৩ই নভেম্বর হাইকোর্টের দেয়া ৩০ দিনের সময়সীমা শেষ হয়। পরের দিন কোর্ট বসার কথা ছিল। কিন্তু খালেদা জিয়াকে আপিলের কোনো সুযোগই দেয়া হয়নি। দিনটি ছিল শনিবার। আর এই ছুটির দিনকেই উচ্ছেদের জন্য বেছে নেয়া হয় খুব কৌশলে। যেন আদালতেও আপিল করতে যেতে না পারেন বেগম জিয়া।

উৎখাত কার্যক্রমের পরিকল্পনা করেন শেখ হাসিনা ও মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিক। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের নির্দেশও দেন তারা।

তদন্তে দেখা যায়- ২০১০ এর ১২ই নভেম্বর সিজিএস লেফটেন্যান্ট জেনারেল মইনুলের নেতৃত্বে এক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় কীভাবে উচ্ছেদ করা হবে, খালেদা জিয়াকে কীভাবে বাড়ি থেকে বের করা হবে তা নিয়ে সবিস্তারে আলোচনা হয়। তদন্তে দেখা যায়, তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মোহাম্মদ আব্দুল মুবীন ও কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া হঠাৎ করেই দৃশ্যপটে নেই। অনেক তথ্য তালাশের পর জানা গেলো তারা বিদেশে। কিন্তু কেন? তারাতো সবকিছুর মধ্যেই ছিলেন।

সমন্বয় সভায় এএসইউ কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মুস্তাফিজ (অব.), তৎকালীন ডিজিএফআই’র শীর্ষ কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আকবর, তৎকালীন ডিএমও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মাহফুজুর রহমান, ডিএমআই ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) রেজওয়ান ও কমান্ডিং অফিসার সাদাত সেলিম উপস্থিত ছিলেন।

বর্তমানে সেলিম পলাতক রয়েছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, উচ্ছেদ অভিযানে সেনানিবাসের চারটি গেটে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়। বাড়ানো হয় গোয়েন্দা তৎপরতা। জেরায় লেফটেন্যান্ট জেনারেল মামুন খালেদ এটা নিশ্চিত করেছেন। উচ্ছেদ অভিযানে মূল ভূমিকা পালন করেছে পুলিশ, র‌্যাব সিও এবং এএসইউ। তখন র‌্যাবের মহাপরিচালক ছিলেন ডিআইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার। পরিচালক ইন্টেলিজেন্স মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান ও এডিজি কর্নেল (অব.) শামস এবং মহিলা পুলিশ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। ভিডিও ধারণ করেন এএসইউ ঢাকা শাখার কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মুস্তাফিজ।
আর এই উচ্ছেদ কার্যক্রম সরাসরি গণভবনে বসে প্রত্যক্ষ করেন শেখ হাসিনা।

যা জানালেন বারী:
গত ৭ই মে মানবজমিন-এ প্রকাশিত ‘অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর তথ্য, তারেক রহমানকে যেভাবে গ্রেপ্তার এবং অমানুষিক নির্যাতন করা হয়’ শীর্ষক সংবাদে নিজের বিষয়ে আসা তথ্যের বিষয়ে ব্যাখ্যা পাঠিয়েছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) চৌধুরী ফজলুল বারী। এক প্রতিবাদপত্রে সংবাদের একটি অংশের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, আমি এবং কর্নেল ফরিদ কখনোই এই ঘটনায় উপস্থিত ছিলাম না। উপরন্তু যখন পুলিশ বা টাস্কফোর্সের দ্বারা গ্রেপ্তারকৃতদের ডিজিএফআই’র জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে নিয়ে আসার তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি তাৎক্ষণিকভাবে ডিজির অফিসে যাই এবং তাকে অবহিত করি। বললেন তিনি নিজেও তা জানেন না, তিনি এও বলেন যে, যার নির্দেশে এসব হচ্ছে সে একটা ফ্রাংকেনস্টাইন হয়েছে। সে নিজেকেও খাবে আমাদেরকেও খাবে।

তিনি বলেন, এ ছাড়া আমার নিয়োগ ছিল ডাইরেক্টর এফসিআইবি, আমি কোনোভাবেই সিটিআইবি’র কর্মকাণ্ডে হস্তক্ষেপ করতে পারি না। ডিজিএফআইতে নিজ কর্মকাণ্ড কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে পালন করা হয়। একমাত্র ডিজি, ডিজিএফআই সব ব্যুরোর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জ্ঞাত থাকেন এবং প্রয়োজনে তিনিই এক ব্যুরোর সঙ্গে অন্য ব্যুরোর সংযোগ করে দেন।

তিনি বলেন, জরুরি অবস্থা চলাকালীন দায়িত্ব বহির্ভূত কাজে ডিজিএফআই’র অংশগ্রহণের প্রতিবাদ করায় ২০০৮-এর মার্চ মাসে আমাকে সেনাসদরে বদলি করা হয় এবং পরবর্তীতে সেপ্টেম্বর মাসে আমাকে যুক্তরাষ্ট্রে বদলি করা হয়। দায়িত্ব গ্রহণের চার মাসের মাথায় আমাকে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার দেশে প্রত্যাবর্তন আদেশ জারি করে।

ঘটনার সময় দেশে ছিলাম না- মেজর (অব.) মনিরুল ইসলাম: ওদিকে অন্য এক প্রতিবাদপত্রে মেজর (অব.) সৈয়দ মনিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ২০০৭ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ই মার্চ পর্যন্ত তিনি দেশের বাইরে ছিলেন। ২০০৭ সালের ৭ই মার্চ বাংলাদেশে কোনো কার্যক্রমে অংশ নেয়া তার পক্ষে অসম্ভব ছিল উল্লেখ করে প্রতিবাদপত্রে তিনি বলেন, সিটিআইবিতে আমার নির্ধারিত পদ ছিল জিএসও-২ (অপারেশন)। এই পদের একমাত্র ও সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ছিল বাংলাদেশে তৎপর বিদেশি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো মোকাবিলা করা। দেশীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের গ্রেপ্তার, আটক বা জেআইসিতে জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে জিএসও-২ (অপস) পদের কোনো সম্পর্ক, এখতিয়ার বা ম্যান্ডেট ছিল না। ২০০৭ সালের ২৩শে নভেম্বর থেকে ২৫শে ডিসেম্বর পর্যন্ত পবিত্র হজ পালনে সৌদি আরবে অবস্থান করেন বলেও প্রতিবাদপত্রে উল্লেখ করেন মনিরুল ইসলাম।