যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া এমন একটি প্রস্তাবের বিষয়ে ওয়াশিংটন তেহরানের জবাবের অপেক্ষায় থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ভঙ্গুর এক যুদ্ধবিরতির মধ্যে পারস্য উপসাগরে গোলাগুলি বিনিময়ের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধ শেষ করার মতো কাছাকাছি অবস্থানে নেই বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। সূত্র : আল-আরাবিয়া, আলজাজিরা, দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।
প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার আগে যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করতে
পারে, যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া এমন একটি প্রস্তাবের বিষয়ে তেহরানের জবাবের অপেক্ষা করছে ওয়াশিংটন। কিন্তু ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, তেহরান এখনো প্রস্তাব বিবেচনা করে জবাব প্রস্তুত করার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে।
আরেক খবর অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত নিরসনে আগামী সপ্তাহে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে আবার আলোচনা শুরু হতে পারে। মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই পক্ষ বর্তমানে এক পৃষ্ঠার একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) নিয়ে কাজ করছে। ১৪ দফার এ খসড়া সমঝোতা স্মারকের মূল লক্ষ্য হলো, একটি আলোচনাপ্রক্রিয়ার কাঠামো তৈরি করা, যার চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হবে যুদ্ধের অবসান ঘটানো। সূত্র মতে প্রস্তাবিত এ খসড়ায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা হ্রাস ও ইরানের উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত অন্য কোনো দেশে স্থানান্তরের সম্ভাব্য বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে বেশ কিছু বড় বিষয়ে এখনো মতপার্থক্য রয়ে গেছে। এর মধ্যে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তেহরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এ বিষয়টি আলোচনার অগ্রগতিকে জটিল বা বিলম্বিত করতে পারে। অবশ্য আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোলে দুই পক্ষের সম্মতিতে প্রাথমিকভাবে প্রস্তাবিত এক মাসের একটি সংলাপের মেয়াদ বাড়ানো হতে পারে। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া যুদ্ধটি সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের পিছু হটার মধ্য দিয়ে শেষ হতে যাচ্ছে। ভয়াবহ হামলা বা ক্ষয়ক্ষতি ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে না। নতুন করে সংঘাত বাড়লে তা সম্ভবত এই অঞ্চলের তেল, গ্যাস এবং লবণাক্ত পানি পরিশোধন অবকাঠামো ধ্বংস করে দেবে, যা একটি দীর্ঘস্থায়ী বৈশ্বিক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। ইরান এমন মূল্য চাপিয়ে দিতে পারে, যা ওয়াশিংটন বহন করতে পারবে না। তা ছাড়া এ ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতেও চাইবে না বিশ্বের অন্য দেশগুলো।
সূত্র বলছে, ট্রাম্প সম্ভবত মনে করেছিলেন ভেনেজুয়েলায় যা ঘটেছিল, মার্কিন হামলার মুখে ইরানও সেই একই পথ অনুসরণ করবে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। যুক্তরাষ্ট্র ইরান অভিযান তেহরানে একটি নমনীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে। আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ যে ইরানি সরকার বিভক্ত হয়নি। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) নেতৃত্বচ্যুত হওয়া তো দূরের কথা, বরং একটি সুসংহত অভ্যন্তরীণ কমান্ড এবং জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোতে একটি বর্ধিত ভূমিকা নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে। সর্বোচ্চ নেতার পদও বহাল থেকেছে; ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এর পেছনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে এবং জনগণ বহিরাগত আক্রমণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধ শেষ করার জন্য এখন পর্যন্ত ইরানের কোনো আত্মসমর্পণ নেই। ফলে একমাত্র পথ যেটি যুক্তরাষ্ট্র অনুসরণ করছে বলে মনে হচ্ছে, তা হলো পশ্চাদপসরণ বা পেছনে সরে যাওয়া।
সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সবকিছু বিবেচনা করে প্রতীয়মান হচ্ছে যে তিনটি নতুন বাস্তব পরিস্থিতি ছাড়া, যুদ্ধটি সম্ভবত পূর্বাবস্থার কাছাকাছি কোনো অবস্থায় ফিরে আসার মাধ্যমেই শেষ হবে। প্রথমত হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ থাকবে। দ্বিতীয়ত ইরানের প্রতিরোধমূলক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। তৃতীয়ত উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। অন্যান্য যে বিষয়গুলো যুক্তরাষ্ট্রকে ইরান আক্রমণে প্ররোচিত করেছিল বলে মনে করা হয় তা হলো, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রক্সি, ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার সম্ভবত যুদ্ধের শুরুতে যেখানে ছিল সেখানেই থেকে যাবে। বাস্তবতা হলো, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি চতুর। তা ছাড়া যুদ্ধে যাওয়ার মার্কিনি সিদ্ধান্তটি ছিল অযৌক্তিক এবং যুদ্ধের অন্তর্নিহিত প্রযুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চলে গেছে। শেষ কথা হলো, আমেরিকান সাম্রাজ্য ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গ্রহণযোগ্য আর্থিক, সামরিক ও রাজনৈতিক মূল্য বিবেচনায় জয়লাভ করতে পারবে না। তবে যুক্তরাষ্ট্র যা ফিরে পেতে পারে, তা হলো কিছুটা যুক্তিবাদিতা। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এখন সময় এসেছে অভিযান বন্ধ করে আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনীতিতে ফিরে আসার।