Image description
দীর্ঘদিন পড়ে আছে নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালের দ্বিতীয় ইউনিট

লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার মোর্শেদ আলী (৫৮) পাশের গ্রামে বোনের বাড়িতে এক অনুষ্ঠানে গিয়ে স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। তার ছেলে বলেন, সময় নষ্ট না করে রাতেই অ্যাম্বুলেন্সে রওনা হয়ে সকালে ঢাকার জাতীয় নিউরোসায়েন্সেস ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে বাবাকে নিয়ে আসি। সকাল থেকে শুরু হয় সিটিস্ক্যানসহ বিভিন্ন পরীক্ষা। সব সম্পন্ন হওয়ার পর জানানো হয় হাসপাতালে কোনো শয্যা খালি নেই। অন্য হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলা হয়। এখন এই মুমূর্ষু রোগীকে নিয়ে কোথায় যাব?

মোর্শেদ আলীর স্বজনদের মতো এমন অভিযোগ অনেকের। বহু দূর থেকে এ হাসপাতালে এসে শয্যা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছে রোগীরা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন স্ট্রোক, নিউরো-ট্রমা ও দুর্ঘটনায় মস্তিষ্কে আঘাত পেয়ে যারা হাসপাতালে আসছেন, শয্যার অভাবে তাদের বেশির ভাগকেই ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অথচ পাশেই ১৫ তলার নবনির্মিত ভবন জনবলের অভাবে গত পাঁচ মাস ধরে পড়ে আছে। তালাবদ্ধ হয়ে আছে জাতীয় নিউরো সায়েন্স হাসপাতালের ৫০০ বেডের দ্বিতীয় ইউনিট। এই বর্ধিত অংশে সেবা চালু করতে প্রয়োজন প্রায় ১৪ শ জনবল। জনবল নিয়োগ না হওয়ায় চালু হচ্ছে না এই দ্বিতীয় ইউনিট। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মাসের মধ্যেই নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করতে চায় স্বাস্থ্য বিভাগ। নতুন ভবন চালু হলে নিউরো রোগীর চিকিৎসায় প্রতিষ্ঠিত এই হাসপাতালটি ১ হাজার শয্যায় উন্নীত হবে। হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলেন, এ হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন ৪-৫ হাজার রোগী সেবা নেয়। এর মধ্যে প্রায় ১২৫-১৫০ জন রোগীকে ভর্তি করার প্রয়োজন হয়। কিন্তু শয্যা না থাকায় মাত্র ২০-২৫ জন রোগীকে ভর্তি করা যায়। তাই হাসপাতালে আরও ৫০০ শয্যা যোগ হলে আরও বেশি রোগীদের সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। ১ হাজার শয্যায় উন্নীত হলে এটা হবে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় নিউরো হাসপাতাল। পরিসর বাড়ায় দুর্ঘটনায় মাথায় কিংবা শরীরে আঘাত পাওয়া রোগীদের সেবায় ১০০ শয্যার ট্রমা ডেডিকেটেড রাখা হচ্ছে। শয্যা না থাকায় স্ট্রোকের রোগীদের আধুনিক চিকিৎসা মেকালিক্যাল থ্রোম্বেক্টমি করা যাচ্ছে না, অন্য হাসপাতালে রেফার্ড করতে হচ্ছে।

সড়ক দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাত পেয়েছেন উত্তরার বাসিন্দা আফরোজা বেগম। চিকিৎসার জন্য তাকে নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলেন স্বজনরা। কিন্তু শয্যা ফাঁকা না থাকায় ভর্তির জন্য তাকে স্ট্রেচারে রেখে অপেক্ষা করছিলেন স্বজনরা। তার পাশেই আরও অনেক রোগী স্ট্রেচারে। ভর্তির অপেক্ষায় তারাও। প্রতিদিন প্রায় ২৫-৩০টি শয্যা খালি হলেও চাহিদা দ্বিগুণের বেশি। সার্জারির জন্যও লম্বা অপেক্ষা। এমআরআইয়ের সিরিয়াল পেতেও লাগে দুই মাস। মানসম্মত সেবার কারণেই এ হাসপাতালে ভিড় অনেক বেশি।

ভোগান্তি কমাতে পাশেই নির্মাণ করা হয়েছে আরও ৫০০ শয্যার একটি ভবন। এখানে আছে দুটি অত্যাধুনিক মডিউলার অপারেশন থিয়েটার, ৪০ বেডের আইসিইউ ইউনিট, দুটি ক্যাথল্যাব, দুটি করে এমআরআই ও সিটি স্ক্যান মেশিন। সব মিলিয়ে অত্যাধুনিক নানা সুবিধা নিয়ে সেবার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত আরেকটি ইউনিট। এ ব্যাপারে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক কাজী গিয়াস উদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এ ধরনের অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি, অবকাঠামো ও লজিস্টিক সাপোর্ট-সমৃদ্ধ হাসপাতাল দেশের সরকারি সেক্টরে আর নেই। জনবল নিয়োগ হলে সেবার পরিধি বিস্তৃত হবে।’ 

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সস হাসপাতালের ৫০০ শয্যার দ্বিতীয় ইউনিট চালু করতে উদ্যোগ গ্রহণ করছি। প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দিয়ে আগামী ১০-১২ দিনের মধ্যে এর কার্যক্রম শুরু করা হবে।’ গত বছরের ৮ ডিসেম্বর নিউরোসায়েন্সস হাসপাতালের দ্বিতীয় ভবনে সেবা চালুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু সেবা দেওয়ার জন্য জনবল নিয়োগ নিয়ে দেখা দিয়েছে ধীরগতি। এই হাসপাতালে চিকিৎসক পদ রাখা হয়েছে ৪৪৬ জনের, নার্স ২৪৭। এর বাইরে আউটসোর্সিং জনবল ৫৫৯। ৫০৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সস হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের বর্ধিত অংশের নির্মাণ শুরু হয়েছিল ২০২০ সালে। 

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি আসে স্ট্রোকের রোগী। তার পর বেশি দুর্ঘটনার রোগী (মস্তিষ্কে আঘাত ও মেরুদণ্ডে আঘাত)। এ ছাড়া পার্কিনসন্স ডিমেনশিয়া, জিবিএস, মৃগী, হাইড্রোকেফালাসসহ নিউরোলজিক্যাল বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীরা এ হাসপাতালে সেবা নেয়। শিশু থেকে বৃদ্ধ সবার নিউরোলজিক্যাল যে কোনো রোগের চিকিৎসা মেলে এ হাসপাতালে।