Image description

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মতভেদ দিন দিন জোরালো হচ্ছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকার ইস্যুতে শপথ নেওয়ার দিন থেকে শুরু হওয়া সংকট সমাধানের তেমন কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিরোধী দলের দাবি সংবিধান সংস্কার। আর ক্ষমতাসীন দল চায়  সংশোধন। এই দুই প্রশ্নেই সংকট ঘনীভূত হচ্ছে।

এরই মধ্যে সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশকে ‘অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণার দলিল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ। সংসদ নেতার পক্ষ থেকে সংবিধান সংশোধনে সর্বদলীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি। তবে তা প্রত্যাখ্যান করে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট কঠোর আন্দোলনের ঘোষণা দেয়। সংসদের পাশাপাশি রাজপথেও সরকারকে চাপে রাখার কৌশল অবলম্বন করেছে তারা। ইতোমধ্যে রাজধানীসহ সারা দেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে। এছাড়া জুলাই সনদের পক্ষে সেমিনারও করেছে। এতে জোটের বেশিরভাগ নেতাই ঝাঁজালো বক্তব্য রেখেছেন। তারা রাজপথেই এর সমাধান করবেন বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

বিরোধী দলের এমন মনোভাবের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জুলাই সনদে বিএনপি সই করেছে এবং এর প্রতিটি অক্ষর, প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি লাইন বাস্তবায়ন করবে। মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) টাঙ্গাইলে দলীয় সমাবেশে তিনি এ ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ‘‘বিএনপি জুলাই সনদে সই করেছে সবার আগে। তাই আমরা তা কার্যকর করবো।’’

এর চার দিন আগে গত ১০ এপ্রিল সংসদের অধিবেশনেও তিনি একই কথা বলেন। সরকারের সুস্পষ্ট ঘোষণার পরও বিরোধী দল হার্ডলাইনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তাদের এমন কঠোর অবস্থানের কারণ কী? রাজনৈতিক মহলে এ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

সরকার ও বিরোধী দলের বাহাস

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করা হয়। এর পরপরই জনগণের সম্মতি যাচাইয়ে ২৫ নভেম্বর জারি হয় ‘গণভোট অধ্যাদেশ’। ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই একসঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে ৬৮ শতাংশের বেশি ভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়। তবে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্যদের শপথের দিন সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেওয়া না নেওয়া নিয়ে দুপক্ষই মুখোমুখি অবস্থান নেয়। এর মধ্যে জামায়াত ও এনসিপিসহ জোটভুক্ত বিরোধী দলীয় সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যের শপথও নেন। কিন্তু সরকারি দলের সদস্যরা তা নেননি। তাদের দাবি, ‘এটি সংবিধানবহির্ভূত’।

গত দুই মাস এ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দল পাল্টাপাল্টি যুক্তি প্রদর্শন করে। সর্বশেষ গত ২ এপ্রিল জাতীয় সংসদে এ আদেশকে অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণার দলিল হিসেবে আখ্যায়িত করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ। অপরদিকে বিরোধীদলীয় সংসদ-সদস্যরা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে ধারণ করে তা বাস্তবায়নের দাবি জানান। সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান নিয়ে সংসদীয় বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমাধান চান উল্লেখ করে স্পিকারকে তিনি বলেন,‘‘ সংসদে যে আলোচনা হয়েছে, আপনি উত্তম মনে করলে তার ওপর একটি কমিটি গঠন করতে পারেন। তবে সেখানে দুদিক থেকে সমানসংখ্যক সদস্য থাকতে হবে। না হলে এখানে যেমন বিতর্ক হচ্ছে, সেখানেও তাই হবে।’’

বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অন্তর্বর্তী সরকারের জারিকৃত ‘জুলাই আদেশ’-এর আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। একে ‘ভয়েড অ্যাব ইনিশিও’ (সূচনা থেকেই অবৈধ) হিসেবে অভিহিত করেন।

প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি

জুলাই সনদ নিয়ে বিরোধী দলের কঠোরতার পরিপ্রেক্ষিতে নতুন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সম্প্রতি সংসদের ভেতরে ও বাইরে দুই জায়গায় তিনি জুলাই সনদের প্রতিটি লাইন অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, ‘‘দেশের মানুষ বিএনপিকে দায়িত্ব দিয়েছে দেশ পরিচালনার জন্য। তাই আমরা আমাদের কথা রাখবো।’’ সে ক্ষেত্রে তিনি বিরোধী দলকে সংবিধানের কথাও স্মরণ করিয়ে দেন। এ সময় তিনি এনসিপিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘‘প্রধান বিরোধী দলের সঙ্গে থাকা আরেকটি দল জুলাই সনদ নিয়ে বড় বড় কথা বললেও তারা কিন্তু সনদে সই করেছে সবার পরে।’’

ছাড় না দেওয়ার ঘোষণা বিরোধী দলের

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ইস্যুতে শুরুতেই কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করে আসছে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ তাদের মিত্ররা। তারা মনে করে, সরকারপ্রধান মিষ্টি কথা বললেও তারা সংবিধানের দোহাই দিয়ে সনদের মৌলিক দিকগুলো পাশ কাটাতে চায়। এরই মধ্যে তারা জোটগতভাবে সেমিনার ও সমাবেশ করেছেন। লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে। দাবি না মানলে সরকার পতনেরও হুমকি দিয়েছেন। সর্বশেষ গত ১৩ এপ্রিল রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে ১১ দলীয় জোটের সেমিনারে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান ঘোষণা করেন—সরকার পতনের আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে। দাবি না মানলে তা ধীরে ধীরে বড় পরিসর ধারণ করবে।

এর আগে গত ১০ এপ্রিল সংসদ অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটি বিশেষ কমিটি গঠনের কথা বলেন। তখন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাবকে স্বাগত জানালেও একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত জুড়ে দেন। তিনি দাবি করেন, এই কমিটিতে সরকারি ও বিরোধী দল-উভয়পক্ষ থেকে সমান সংখ্যক (৫০-৫০) সদস্য থাকতে হবে।

তার মতে, শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে কমিটি গঠন করলে তা ‘যে লাউ সেই কদু’র মতো অর্থহীন হয়ে পড়বে। তিনি বলেন, ‘‘আমরা দলের নয়, জনগণের অভিপ্রায়কে সম্মান জানাতে এখানে এসেছি। তাই আমরা সংসদে সমাধান না পেলে রাজপথই আমাদের ভরসা।’’

একই ঘোষণা দেন তাদের অন্যতম শরীক জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার ক্ষমতায় গিয়ে জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। আমরা সুস্পষ্ট ঘোষণা করতে চাই—সরকার সনদ বাস্তবায়ন না করলে আমরা ছাড় দেবো না, জগণকে সঙ্গে নিয়ে দাবি আদায় করবো।

মূল সমস্যা কোথায়, কী বলছেন নেতারা?

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার বিভিন্ন খাতের সংস্কারে হাত দেয়। শেখ হাসিনা সরকারের আমলে হওয়া সংবিধানের বিতর্কিত সংশোধনীগুলো (যেমন ৭০ অনুচ্ছেদ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল) পুরোপুরি বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছিল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-সহ কয়েকটি দল।

বিএনপি জুলাই সনদের কিছু মৌলিক বিষয়েও দ্বিমত পোষণ করে। বিশেষ করে উচ্চকক্ষ গঠন ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানোর নির্দিষ্ট কিছু ফর্মুলা নিয়ে তাদের আপত্তি আছে। এছাড়া, বিএনপি তাদের দীর্ঘদিনের ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবনার ওপর ভিত্তি করে সংসদকে কার্যকর করার দাবি জানিয়ে আসছে।

অপরদিকে অবস্থান নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও ১১-দলীয় ঐক্য। বিরোধী দল হিসেবে জামায়াত জুলাই সনদের পূর্ণ ও দ্রুত বাস্তবায়ন চায়। তাদের দাবি, যেহেতু গণভোটে জনগণ এই সনদের পক্ষে রায় দিয়েছে, তাই এটি এখন জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন। তারা বলেছেন, ১৫ মার্চের মধ্যে অধিবেশন না ডাকা জনগণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল।

এ বিষয় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘সরকার মুখে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা বললেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে বাদ দিতে তৎপর।

বিশেষ করে উচ্চকক্ষ গঠন ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানোর নির্দিষ্ট কিছু ফর্মুলা নিয়ে তারা আপত্তি করছে। এছাড়া বিএনপি তাদের দীর্ঘদিনের ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবনার ওপর ভিত্তি করে সংসদকে কার্যকর করছে। যা জুলাই সনদের সঙ্গে অনেক গরমিল রয়েছে।’’

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সংসদীয় দলের হুইপ রফিকুল ইসলাম খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘সরকার মুখে জুলাইয়ের কথা বললেও তারা বাস্তবে ফ্যাসিবাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করছে। আমরা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করতে চাই জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমরা সনদ আদায় করবোই।’’

তবে বিরোধী দলের আন্দোলনের হুমকিকে দ্বিচারিতা বলছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান।

বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রী যেখানে সনদের পুরোপুরি ধারা বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছেন, সেখানে রাজপথে বিশৃঙ্খলা এক ধরনের দুরভিসন্ধিমূলক হতে পারে।’’