দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গার সীমান্ত এলাকায় সোনা ও মাদকদ্রব্যের বিনিময় বাণিজ্য রমরমা হয়ে উঠেছে। একদিকে পাচার হচ্ছে সোনা, অন্যদিকে দেশে ঢুকছে সর্বনাশা মাদকদ্রব্য।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী বলছে, সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে এই বিনিময় বাণিজ্য চলছে। সীমান্ত রক্ষায় নিয়োজিত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) বলছে, তাদের জোরালো নজরদারি ও পদক্ষেপে কমে এসেছে পাচার।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের ভেতর থেকে সোনা পাচার হয়ে যাচ্ছে প্রতিবেশী দেশ ভারতে। বিনিময়ে সেখান থেকে আসছে ফেনসিডিল, উইনকোরেক্স, ইয়াবা, হেরোইন, কোকেন, আইসসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য। পাচারকারীরা নগদ লেনদেন এড়িয়ে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা লেনদেন করছে। ফলে অর্থ লেনদেনের প্রমাণ থাকলেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী এ নিয়ে কিছু করতে পারছে না।
বিজিবির তথ্য মতে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ১০ এপ্রিল পর্যন্ত ৯ কোটি ৭০ লাখ ৩৬ টাকার মাদক জব্দ করা হয়েছে। একই সময়ে ১৮ কোটি ৯১ লাখ ৬৮ হাজার ৫০৪ টাকার সোনা উদ্ধার করে বিজিবি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গার জীবননগর গ্রামের মইনুদ্দিন ময়েন, হরিয়ান নগরের টিটু মেম্বার, শাখারিয়া গ্রামের আউয়ুব উদ্দিন, যাদবপুর গ্রামের ছালাম মেম্বার ও গণি মেম্বার, সদরপাড়া গ্রামের রিপন হোসেন, বাদল মেম্বার, ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার বাঘাডাঙ্গা গ্রামের মতিউর রহমান, গুড়দহ গ্রামের রবিউল হোসেন, ভবনগর গ্রামের কামরুজ্জামান টিটু, খোসালপুর গ্রামের ফয়সাল হোসেন শিশির, কাঞ্চনপুর গ্রামের আলিমুল হক বর্তমানে মহেশপুর ও জীবননগর উপজেলার চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করছেন।
সূত্র মতে, আগে অন্যরা চোরাচালানে যুক্ত থাকলেও দুই বছর ধরে সীমান্তে তাঁরা কঠোর বলয় তৈরি করেছেন।
সূত্র জানায়, আগে যেখানে সীমান্তের নির্দিষ্ট পয়েন্ট ব্যবহার করে চোরাচালান হতো, এখন সেখানে কৌশলে এসেছে বেশ পরিবর্তন। গ্রামীণ মেঠাপথ, মাছ ধরার নৌকা ও কৃষিপণ্যের সঙ্গে সোনা পাচার চলছে অবাধে।
স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, রাত নামলেই অচেনা মানুষের আনাগোনা বাড়ে এলাকায়। সীমান্ত দিয়ে আগে শুধু গরু বা বিভিন্ন পণ্য পাচার করা হতো। এখন মাদকই সবচেয়ে বেশি আসছে। স্থানীয় যুবসমাজের মধ্যে এর প্রভাব ভয়ংকর হয়ে উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পাচারকারী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা বেশির ভাগ সময় রাতে এসব কাজ করে থাকি। ঢাকা থেকে সুনির্দিষ্ট জায়গায় স্বর্ণের বার পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আমরা সেখান থেকে সংগ্রহ করে ওপারে নির্বিঘ্নে পাঠিয়ে দিই।’
মানবাধিকারকর্মী চন্দন বসু বলেন, ‘সীমান্তের চোরাচালান এখন জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এর পরিণতি আরো ভয়াবহ হতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এদিকে নজরদারি প্রয়োজন।’
স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি মেহেদী হাসান বলেন, ‘আমাদের সীমান্তে প্রতিনিয়ত স্বর্ণ ও মাদক উদ্ধার করা হলেও এসব ঘটনায় কাউকে আটক করা হয় না। মূল পাচারকারীরা সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। এ বিষয় একাধিকবার মাসিক আইন-শৃঙ্খলা সভায় তুলেছিলাম। তবে কোনো ফল হয়নি। যথারীতি আগের মতো চোরাচালান অব্যাহত রয়েছে।’
জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শেখ মো. হাশেম আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সীমান্তে বিজিবির শুধু নজরদারি বাড়ালেই হবে না। চোরাচালান নিরসনে সব আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সচেতন করা জরুরি। একই সঙ্গে আন্তর্দেশীয় সহযোগিতা জোরদার না করলে এই সমস্যা দীর্ঘ মেয়াদে আরো জটিল আকার ধারণ করবে।’ তিনি বলেন, ‘স্বর্ণ ও মাদকের এই অদৃশ্য বাণিজ্য কেবল আমাদের আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি এখন জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে আমরা নিয়মিত অভিযান চালিয়ে সীমান্ত এলাকা থেকে মাদক কারবারিদের আটক করছি। আশা করছি, সবার প্রচেষ্টায় শিগগিরই এ সমস্যার সমাধান ঘটবে।’
এ ব্যাপারে মহেশপুর ৫৮ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল রফিকুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়েছি। সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করে স্বর্ণ জব্দ করা হচ্ছে। ফলে স্বর্ণ চোরাচালান আগের চেয়ে কিছুটা কমেছে। এ ছাড়া মাদকের বিরুদ্ধে বিজিবি নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। প্রতিনিয়ত মাদক উদ্ধার করা হচ্ছে। আশা করছি, শিগগিরই স্বর্ণ ও মাদক চোরাচালান আরো কমে আসবে।’