আসছে বাজেটে সম্পদ কর বসছে। এতে করদাতাকে দ্বিগুণ হারে কর দিতে হতে পারে। আর এ নতুন খাতের মাধ্যমে কর বিভাগ অতিরিক্ত অন্তত ২৭ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের পরিকল্পনা করেছে। এমন প্রেক্ষাপটে নতুন বাজেটে চার কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিকরাই এর আওতায় বাড়তি কর দেবেন।
বিদ্যমান আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী, একজন করদাতার সম্পদের পরিমাণ চার কোটি টাকার বেশি অথচ ১০ কোটি টাকার নিচে হলে তাঁকে ১০ শতাংশ হারে সারচার্জ দিতে হয়। এই সম্পদের পরিমাণ ১০ কোটি টাকার বেশি অথচ ২০ কোটি টাকার চেয়ে কম হলে সারচার্জ দাঁড়ায় ২০ শতাংশ। করদাতার সম্পদ ২০ কোটি টাকার বেশি অথচ ৫০ কোটি টাকার কম হলে সারচার্জ দিতে হয় ৩০ শতাংশ।
তবে একই আইন অনুযায়ী, একজন করদাতার তিন ধরনের সম্পদের ওপর সারচার্জ নেওয়া হয়। প্রথমত, নিট পরিসম্পদ চার কোটি টাকার বেশি হলে। দ্বিতীয়ত, নিজ নামে একের অধিক মোটরগাড়ি থাকলে।
মোট সম্পদের পরিমাণ চার কোটি টাকার কম হলেও যদি কোনো করদাতার নামে একাধিক মোটরগাড়ি থাকে, তাঁকে ১০ শতাংশ হারে সারচার্জ দেওয়ার বিধান আছে। এ ছাড়া করদাতার নামে আট হাজার বর্গফুটের বেশি আয়তনের গৃহ-সম্পত্তি থাকলেও তাঁকে দিতে হয় ১০ শতাংশ হারে সারচার্জ।
প্রকৃতপক্ষে একজন করদাতার সম্পদের সঙ্গে আয়করের কোনো সম্পর্ক নেই। একজন করদাতার নিট পরিসম্পদ পাঁচ কোটি টাকা হলেও তিনি মূলত কর দিচ্ছেন তাঁর আয়ের ওপর।
অন্যদিকে এই সম্পদের বাজারমূল্য পাঁচ কোটি টাকার চেয়ে অনেক বেশি। এমন হতে পারে করদাতা সম্পদ অর্জন করেছেন ১৯৯৫ সালে। তখন এই পাঁচ কোটি টাকায় তিনি গুলশানে দুটি বাড়ি কিনেছিলেন। বর্তমানে এই সম্পদের দাম শতকোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। তবে এই সম্পদ বিক্রি না করায় তাঁর সম্পদ বিবরণীতে আগের ক্রয়মূল্য পাঁচ কোটি টাকাই দেখানো আছে। এ ক্ষেত্রে সম্পদের প্রকৃত মূল্য বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম হওয়ায় সরকার প্রচুর রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে। তাই রাজস্ব আদায় বাড়ানোর লক্ষ্যে সম্পদের দাম বাজারমূল্যে নির্ধারণের কথা ভাবছে সরকার। এ ছাড়া সারচার্জের বিকল্প হিসেবে সম্পদ কর আদায়ের চিন্তা করা হচ্ছে। এ জন্য আলাদাভাবে আইন ও বিধিমালা করা হতে পারে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
জানা গেছে, সম্পদের বাজারমূল্য বিশেষ করে জমির বাজারমূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকার মৌজামূল্য ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। এতে রাজধানীর গুলশান, বনানী, ধানমণ্ডি, বারিধারাসহ অভিজাত এলাকার বাসিন্দারা পড়তে পারেন সম্পদ করের আওতায়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্বের অনেক দেশই সম্পদ কর আদায় করে। দেশে কর-জিডিপি অনুপাত অনেক দুর্বল। সরকারের স্বাভাবিক ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। সরকারের রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি ও ধনী-গরিব বৈষম্য দূর করতে সম্পদ কর আদায়ের চিন্তা করছে সরকার।’
সূত্র জানায়, সম্পদ কর আদায়ের চিন্তা করা হলেও তা কারো জন্য বোঝা তৈরি করবে না। এতে কর ন্যায্যতা তৈরি হবে। বাজারমূল্যের ওপর ভিত্তি করে চার কোটির বেশি তবে ১০ কোটির কম সম্পদ থাকলে তাঁকে সম্পদমূল্যের ০.৫০ শতাংশ ‘সম্পদ কর’ দিতে হবে। ১০ কোটির বেশি তবে ২০ কোটির কম হলে ১ শতাংশ, ২০ কোটির বেশি অথচ ৫০ কোটির কম হলে ১.৫০ শতাংশ এবং ৫০ কোটির বেশি হলে ২ শতাংশ ‘সম্পদ কর’ নির্ধারণের পরিকল্পনা আছে সরকারের। তবে এই সম্পদ কর কোনোভাবেই করদাতার প্রদেয় করের চেয়ে বেশি হবে না।
ধরা যাক, বাজারমূল্যে একজন করদাতার পাঁচ কোটি টাকার সম্পদ আছে। কিন্তু তাঁর বছরের আয় অনুযায়ী আয়কর বাবদ দিতে হচ্ছে ৫০ হাজার টাকা। আগের নিয়মে ১০ শতাংশ সারচার্জ বাবদ দিতে হতো পাঁচ হাজার টাকা। কিন্তু এখন তাঁর ‘সম্পদ কর’ আসবে দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা। তবে যেহেতু করদাতার আয়কর আসছে ৫০ হাজার টাকা। সেহেতু তাঁর ‘সম্পদ কর’ আসবে আরো ৫০ হাজার টাকা। সে হিসাবে তিনি সরকারি কোষাগারে জমা দেবেন এক লাখ টাকা। আগের নিয়মে তাঁকে দিতে হতো ৫৫ হাজার টাকা।
সম্পদ কর আরোপ করা হলে তা রাজস্ব আদায়ে কেমন প্রভাব পড়বে, এ বিষয়ে এনবিআরের কোনো গবেষণা নেই। তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেখানে সম্পদ কর জিডিপির ২ শতাংশের কাছাকাছি। অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র তার জিডিপির ৩ শতাংশ, যুক্তরাজ্য ৪.২০ শতাংশ, কানাডা ৩.১০ শতাংশ, ফ্রান্স ও দক্ষিণ কোরিয়া ৪ শতাংশ, জাপান ২.৮০ শতাংশ, স্পেন ২.৫০ শতাংশ এবং সুইজারল্যান্ড ২.১০ শতাংশ সম্পদ করের মাধ্যমে আদায় করে।
বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপি আনুমানিক ৪৭৫ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে জিডিপির ১ শতাংশ সম্পদ কর থেকে আদায় করতে পারলে সরকার পাবে অতিরিক্ত প্রায় ৫৪ হাজার কোটি টাকা। ২ শতাংশ আদায় করতে পারলে সরকার পাবে অতিরিক্ত প্রায় এক লাখ আট হাজার কোটি টাকা। ২ শতাংশ আদায় করতে পারলে সরকারের কোষাগারে যোগ হবে অতিরিক্ত প্রায় এক লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা। কমপক্ষে ০.৫০ শতাংশ আদায় করতে পারলেও সরকার পাবে অতিরিক্ত প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সম্পদ করের ক্ষেত্রে আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সম্পদের সঙ্গে আয়ের সামঞ্জস্যের কোনো ব্যবস্থা নেই। আমাদের তথ্য ব্যবস্থাপনাকে সমন্বিত করতে হবে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পদ যাতে লুকানো না যায়, সে ব্যবস্থা করতে হবে। সারচার্জ নির্ধারণ হয় সম্পদের ক্রয়মূল্যের ওপর ভিত্তি করে। তবে এটা চাইলে বাজারমূল্যেও করা যায়। এ ক্ষেত্রে মৌজামূল্য দিয়ে ভূমির বাজারমূল্য নির্ধারণ করা যায়। অনেক দেশ এটা করে।’
বর্তমানে সম্পদের সারচার্জ থেকে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা আদায় হয়। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত সরকার সারচার্জ বাবদ আদায় করেছে ২৯৬ কোটি টাকা। এরপরে আরো রিটার্ন জমা পড়লেও সেই হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায়নি। কর্মকর্তাদের দাবি, এই সারচার্জের পরিমাণ এক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।