Image description

সীমান্তে বিএসএফের গুলি চালানো নিয়ে বহু বছর সমালোচনা হয়ে আসছে, এমন পরিস্থিতিতে যেসব সীমান্ত এলাকায় নদী, চর বা জলাভূমির কারণে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা কঠিন, সেসব জায়গায় দিয়ে অনুপ্রবেশ ও বেআইনি কার্যকলাপ ঠেকাতে নদীপথ সীমান্তে বিষাক্ত সাপ ও কুমিরের মতো সরীসৃপ ছাড়ার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কথা ভাবছে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। এমন খবর দিয়েছে দেশটির গণমাধ্যম ‘দ্য ফেডারেল’।

গণমাধ্যমটি জানায়, গত ৯ ফেব্রুয়ারি বিএসএফের উচ্চ পর্যায়ের এক বৈঠকে এ বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২০ মার্চ বিএসএফের নয়াদিল্লি সদর দপ্তরে শীর্ষ কর্মকর্তাদের আরেকটি বৈঠকে বিষয়টি ওঠে।

এরপর মাঠ পর্যায়ের সিনিয়র কর্মকর্তাদের কাছে বার্তা পাঠানো হয়। গণমাধ্যমটির দেওয়া তথ্য মতে, সীমান্ত রাজ্যগুলোর কোন নদীপথগুলোতে সাপ ও কুমির ছাড়া হবে তা জানা যায়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে ভারত সরকারের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য গণমাধ্যমে না এলেও বাংলাদেশ অংশের সীমান্তে বসবাসরতদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বাসিন্দারা বলছে, বিএসএফ তাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করলে দুই দেশের নাগরিকরাই পড়বে ঝুঁকিতে।
 
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন, এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে লঙ্ঘিত হবে আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন। একই সঙ্গে এটি অমানবিক, অপেশাদার চিন্তা এবং আধুনিক সভ্যতার পরিপন্থী, যা দুই দেশের সীমান্তবর্তী মানুষের জীবন-জীবিকা, পরিবেশ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলবে।

সূত্র জানিয়েছে, রংপুর-রাজশাহী বিভাগে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের জল ও স্থল মিলিয়ে সীমান্তপথ রয়েছে এক হাজার ৬৬৮ কিলোমিটার। এর মধ্যে স্থল সীমান্ত এক হাজার ৪০১ কিলোমিটার হলেও বাকি ২৬৭ কিলোমিটার উত্তরের ১৬ জেলার নদীপথ সীমান্ত।

একই সঙ্গে কুড়িগ্রামে ৪৪ কিলোমিটার, লালমনিরহাটে ১১৬, নীলফামারীতে ১০, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও মিলে ৫৫ কিলোমিটার নদীপথে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্তপথ রয়েছে। সীমান্তের বাসিন্দারা জানায়, সীমান্তবর্তী অনেক জমি নদ-নদীর ধারে অবস্থিত হওয়ায় কৃষকরা সেচ, চাষাবাদ ও পশুপালনের জন্য নদীর ওপর নির্ভরশীল। এ কারণে বাংলাদেশি ভূখণ্ডে নিয়মিত যাতায়াত বাংলাদেশি বাসিন্দাদের। বিএসএফ যদি তাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে তাহলে সীমান্ত এলাকার সাধারণ বাসিন্দাদের জীবনযাত্রায় তৈরি হতে পারে স্থায়ী আতঙ্ক। অনেক পরিবার নদীর পানি ব্যবহার করে, শিশুরা নদীর ধারে খেলাধুলা করে, নারীরা পানি সংগ্রহ করে—এসব দৈনন্দিন কাজই ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।

সরেজমিনে নদীপারের সীমান্তে গিয়ে বাসিন্দারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলার যেসব নদ-নদীতে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত রয়েছে, সেসব নদ-নদীর বেশির ভাগে এপার-ওপারে রয়েছে বাংলাদেশি ভূখণ্ড। বর্ষা মৌসুমে নদ-নদীতে যখন পানি উপচে পড়ে তখন দুই দেশের সীমানা নির্ধারণ করাই কঠিন হয়ে পড়ে। এই সময়টাতেও কৃষিনির্ভর, মত্স্য সংগ্রহকারী মানুষজন, নদীপথে ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত দুই দেশের সীমান্তের মানুষ নিয়মিতই আসা যাওয়া করে। সে ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে দুই দেশের স্থানীয় অর্থনীতি।

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার কালজানিতে গিয়ে দেখা গেছে, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের নদীপথ সীমান্ত যোগ হয়েছে দুধকুমার নদে। নদের দুই পারেই বাংলাদেশি ভূখণ্ড রয়েছে। একই সঙ্গে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার মহানন্দা নদীতে রয়েছে দুই দেশের নো-ম্যানস ল্যান্ড। এ ছাড়া লালমনিরহাটের মোগলহাট ও দুর্গাপুরের ধরলা নদীর কিছু অংশে মিলে গেছে দুই দেশের সীমান্ত। কালজানি সীমান্তের বাসিন্দা ফারুক হোসেন বলেন, ‘নদীর পাশেই জনবসতি এলাকা আমাদের। যখন নদীতে পানি হয়, বর্ষা মৌসুমে সীমানা কোথায় তা বোঝা যায় না। ধারণার ওপর আমরাও যাই, ওদের লোকজনও আসে। আমরা দুই দেশের নাগরিকই নদীর পারে থাকি।’ তিনি বলেন, ‘আমরা খবরে দেখছি তারা নদীতে বিষধর সাপ ছেড়ে দেবে। এই খবর আমাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করছে।’ কালজানি ঘাটের ইজারাদার সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘নদীর ওপারে আমাদের বাংলাদেশ। আমার মাঝিরা নৌকা চালায়। প্রতিদিন শত শত লোক নৌকা দিয়ে পারাপার হয়। এটা বিপজ্জনক খবর। আমরা বিপদে পড়ে যাব।’ কৃষক মজিবুর রহমান বলেন, ‘আমার জায়গা-জমি সব নদীর ওই পারে। গরুবাছুর নিয়ে ওই পারে যেতে হয়। ওই খবর সত্য হলে আমাদের খুবই অসুবিধা হবে।’

ভূরুঙ্গামারী উপজেলার ২ নম্বর শিলখুঁড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. আসাদুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের নাগরিকরা নদ-নদীর এপারে-ওপারে কৃষিজমিতে পানি ব্যবহার করে। জেলেরা মাছ ধরে। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া আমাদের এই সীমান্তে অনেকটা শান্তিপূর্ণ অবস্থানে আছে। আমরা শুধু সীমান্তে আছি এমনটা নয়, তাদের দেশের নাগরিকরাও সীমান্তে আছে। আমার মনে হয় না ভারত এমন ভুল সিদ্ধান্ত নেবে। আমরা উভয়েই প্রতিবেশী দেশ।’

নদী ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করেন বেরোবির শিক্ষক ড. তুহিন ওয়াদুদ। তিনি বলেন, প্রাকৃতিক পরিবেশে বাইরের প্রজাতি হস্তক্ষেপ করলে তার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হয় এবং তা নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব। তিনি মনে করেন, একটি নির্দিষ্ট এলাকায় কৃত্রিমভাবে সাপ বা কুমির ছেড়ে দিলে তা স্থানীয় ইকোসিস্টেমে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করবে। খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়তে পারে, বিলুপ্তির মুখে পড়তে পারে স্থানীয় কিছু প্রজাতি।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ডেল এইচ খান জানান, সীমান্তে নিরাপত্তা নিশ্চিতের নামে সাপ বা কুমির ছাড়া আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কুমির বা সাপ আন্তর্জাতিকভাবে সংরক্ষিত প্রাণী, তাদের জৈবিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা রামসার কনভেনশন এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষার চুক্তির সরাসরি লঙ্ঘন। তিনি বলেন, ‘ভয় দেখিয়ে নয়, সীমান্তে নিরাপত্তার সমাধান হওয়া উচিত প্রযুক্তি আর কার্যকর কূটনীতি দিয়ে। আমরা চাই, বন্ধুত্বের সীমান্তে বিশ্বাসের বেড়া থাকুক।’