Image description

সংরক্ষিত নারী আসনের ভোট আগামী ১২ মে। শেষ সময়ে দলীয় মনোনয়ন পেতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন সরকারি ও বিরোধী দলের নেত্রীরা। এরই মধ্যে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন অনেকে। এ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন বিএনপির নারীনেত্রীদের তৎপরতা বেশি দেখা গেছে।

গত ১০ এপ্রিল মনোনয়নপত্র বিক্রির প্রথম দিন থেকেই নয়াপল্টনে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের উপচে পড়া ভিড়। স্লোগানমুখর কার্যালয় প্রাঙ্গণ। এখন পর্যন্ত এক হাজারের বেশি ফরম বিক্রি হয়েছে। অপরদিকে প্রধান বিরোধী দল জামায়াত ও এনসিপির নারী নেত্রীরাও বসে নেই। আনুপাতিক হারে প্রাপ্ত দলীয় আসনে মনোনয়ন পেতে তারাও নিজেদের অবস্থান থেকে তৎপর।

দলীয় পদবিধারীদের পাশাপাশি বিভিন্ন পেশাজীবী ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নেত্রীরাও পিছিয়ে নেই। আরও আছেন মন্ত্রী-এমপি ও শীর্ষ নেতাদের স্ত্রী-সন্তানরা।

আর জামায়াতের নারীনেত্রীরা প্রকাশ্যে তৎপরতা না দেখালেও ভেতরে ভেতরে দলীয় হাইকমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন বলে জানা গেছে।

তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আনুপাতিক হারে একটি আসন পাওয়ার কথা। এরই মধ্যে দলটির দুই শীর্ষ নেত্রী আলোচনায় রয়েছেন। এনসিপি সূত্র জানিয়েছে, জোটের প্রধান দল জামায়াতের কাছ থেকে আরও একটি আসন পেতে দেনদরবার করছেন নেতারা।

তবে সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা হচ্ছে। প্রার্থী মনোনয়নে অতীতের মতো কি পারিবারিক বৃত্তকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে—নাকি পোড় খাওয়া ত্যাগী নেত্রীদের মূল্যায়ন করা হবে? এ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। আবার অনেকে বলেন, নেতাদের পরিবারের সদস্য হলেও যোগ্যতা থাকলে যে কেউ প্রার্থী হতে পারেন।

এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘সংরক্ষিত আসনে নারী নেত্রীদের আগ্রহ ইতিবাচক হিসেবেই দেখছি। কারণ এতে বুঝা যায় তাদের মধ্যে বড় দায়িত্ব নেওয়ার আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আর শীর্ষ নেতাদের আত্মীয় হলেই যে এমপি হতে পারবেন না, সেটা ঠিক নয়। যোগ্যতা থাকলে তারাও মনোনয়ন পেতে পারেন। তবে আমি মনে করি, দলগুলোর উচিত যোগ্যদের মূল্যায়ন করা। সংসদে গেলে যেন কেউ তাদের অলংকার মনে না করতে পারে, সেদিকেও লক্ষ রাখতে হবে।’’

কোন দল পাচ্ছে কয়টি আসন?

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে সাধারণ আসনে বিএনপি ২১৩টি, জামায়াত ৬৮টি ও এনসিপি পেয়েছে ৬টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২টি, খেলাফত মজলিস ১টি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ পেয়েছে ১টি, গণঅধিকার পরিষদ ১টি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) ১টি ও গণসংহতি আন্দোলন পেয়েছে ১টি আসন।

এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পেয়েছেন ৭টি আসন। নির্বাচন কমিশনের আইন অনুযায়ী সংসদে কোনও দলকে একটি সংরক্ষিত নারী আসন পেতে ৬ জন নির্বাচিত সংসদ সদস্য থাকতে হবে।

সেই হিসাবে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনের মধ্যে বিএনপি জোট ৩৬টি এবং জামায়াত জোট পাচ্ছে ১৩টি আসন। এ ক্ষেত্রে জামায়াত দলগতভাবে ১২টি, এনসিপি ১টি ও স্বতন্ত্র ৭ এমপি পাচ্ছেন একটি আসন।

বিএনপিতে রেকর্ড ফরম বিক্রি, উল্লেখযোগ্য কারা নিলেন?

গত ১০ এপ্রিল থেকে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু করে বিএনপি। প্রথম দিনেই মনোনয়ন প্রত্যাশীদের ঢল নামে। দলীয় বিভিন্ন পদবিধারীদের পাশাপাশি পেশাজীবী অনেক নারীও ফরম নিয়েছেন। বাদ যাননি শীর্ষ নেতাদের স্ত্রী-সন্তানরাও। দলীয় সূত্র জানিয়েছে—এবারের ফরম বিক্রি অতীতের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। এবারই প্রথমবারের মতো তা হাজার ছাড়িয়েছে। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানান, দুই দিনে ফরম বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ২৫টি।

দলীয় সূত্রমতে, ফরম বেশি নিয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটি, মহিলা দল ও সাবেক ছাত্রদলের নেত্রীরা। বাদ যাননি শোবিজ অঙ্গনের তারকারাও।

মনোনয়নপত্র সংগ্রহকারী নেত্রীদের মধ্যে রয়েছেন—সুলতানা আহমাদ, নিলোফার চৌধুরী মনি, মনিরা বানু, শাহেনেওয়াজ চৌধুরী, ফরিদা আক্তার, মমতাজ আক্তার, ফারজানা রশিদ লাবনী, নিলুফা ইয়াসমিন খান, সায়েমা খাতুন, তাহমিনা বেগম রিপা, নাঈমা খন্দকার, রোকেয়া চৌধুরী বেবী, সামিরা আজিম দোলা, কাজী নাজিয়া হক, শাকিলা ফরহাদ বানু, রেহানা আক্তার রানু, কাজী নাজিয়া হক, জিনাত আরা আফু, কাজী মরিয়ম বেগম, হাফেজা ফেরদৌস লিমন, মাজেদা আহসান মুন্সী, তাহমিনা খান, রুবিনা আক্তার রুবা, শামিমা রহিম, মুনমুন তালুকদার, তহমীনা আক্তার হাসেমী, তাহসিন শারমিন তামান্না, রেহেনা পারভীন, ফৌজিয়া সাফদার সোহেলী, খালেদা ইয়াসমিন, আফসানা মিমি, সানসিলা জেবরিন, আইরীন মাহবুব, সানজানা চৈতী পপি, শাহানা সুলতানা, সেলিনা আফরোজ, নাছিমা তালুকদার, নাসিমা আক্তার, কাওসার জাহান ফরিদা, রায়হান রহমান হেলেন, লাভলী, জেসমিনা খানম, ফরিদা ইয়াসমিন (ডোরা), মমতাজ বেগম (নয়ন), বেগম রাজিয়া আলম, সেলিনা পারভীন, হাবিবা আক্তার পাপিয়া, আয়েশা আক্তার সানজি, সায়মা আহমেদ, শাহীনূর বেগম (সাগর), মাহমুদা আক্তার, নাছিমা ইসলাম চৌধুরী দৃষ্টি, জিন্নাতুন নেছা জিনু, সুলতানা বেগম (আঁখি সুলতানা), খাদিজা বেগম, মাহমুদা সুলতানা, মাহমুদা সুলতানা চৌধুরী (ঝরনা)।

পিছিয়ে নেই তারাকারও

বিএনপির দলীয় নেত্রীদের পাশাপাশি সংগীতশিল্পী ও শোবিজ অঙ্গনের তারকারাও পিছিয়ে নেই। এর মধ্যে বেবী নাজনীন (নীলফামারী-৪), কনকচাঁপা (সিরাজগঞ্জ-১), দিলরুবা খান (জয়পুরহাট-২), রিজিয়া পারভীন (কিশোরগঞ্জ), দিঠি আনোয়ার (সিলেট ও কুমিল্লা) ও নৃত্যশিল্পী ফারহানা চৌধুরী (ময়মনসিংহ-১১) মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন।

মনোনয়ন বিক্রি নেই জামায়াতে, তবু আলোচনায় যারা?

বিএনপির ৩৬ আসনের বিপরীতে এক হাজারের বেশি মনোনয়ন ফরম বিক্রি হলেও ভিন্ন চিত্র প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, তাদের মধ্যে ফরম বিক্রির পদ্ধতি নেই। তবে দলীয় হাইকমান্ড যাদের মনোনয়ন দেবেন, শুধু তারাই ফরম পূরণ করে জমা দেবেন। তবে এ প্রক্রিয়া এখনও শুরু হয়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলের একটি সূত্র জানিয়েছে, দলীয় পদবিধারী নেত্রীদের বাইরেও বিভিন্ন পেশাজীবী নারীদের বাছাই করবে দলটি। আর শীর্ষ নেতাদের স্ত্রী-সন্তানরা মনোনয়ন পেলেও অবশ্যই তাদের সাংগঠনিক কাজে অগ্রগামী হতে হবে।

এর মধ্যে আলোচনায় আছেন কেন্দ্রীয় মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি অধ্যাপিকা নুরুন্নিসা সিদ্দিকা, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক প্রকৌশলী মারদিয়া মমতাজ, সাবেক এমপি ডা. আমিনা বেগম রহমান, সাবেক এমপি ও কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য শাহান আরা বেগম, সাঈদা রুম্মান, মার্জিয়া বেগম, খন্দকার আয়েশা খাতুন, ডা. হাবিবা চৌধুরী সুইট, কাজী মারিয়া ইসলাম বেবি, রাবেয়া খানম, ডা. শিরিন আক্তার রুনা, তানহা আজমি, নার্গিস খান, কানিজ ফাতেমা, সেলিনা আক্তার ও আয়েশা সিদ্দিকা এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মহিলা বিভাগের সহকারী সেক্রেটারি ব্যারিস্টার সাবিকুন্নাহার মুন্নী।

এ বিষয়ে দলটির মহিলা বিভাগের নেত্রী প্রকৌশলী মারদিয়া মমতাজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘দলীয়ভাবে এখনও কাউকে মনোনয়ন দেওয়ার কথা বলা হয়নি। এ ক্ষেত্রে মনোনয়ন ফরমও বিক্রি হচ্ছে না। দল যাদের বলবে, শুধু তারাই আবেদন করবেন।’’ তিনি আরও জানান, নেতাদের পরিবারের কেউ মনোনয়ন পেলেও সাংগঠনিক পদ্ধতির মধ্যেই আসতে হবে।

একটি আসন বাড়াতে তৎপর এনসিপি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৬টি আসনে জয় পেয়েছে তরুণদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। সে হিসাবে সংরক্ষিত আসনে একটিতে মনোনয়ন পাবে দলটি। এ আসনের জন্য সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছেন দুই নেত্রী। এর মধ্যে একজন যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন ও আরেকজন ডা. মাহমুদা মিতু।

তবে দলের একটি সূত্রের দাবি,  তারা ১১ দলীয় জোটের প্রধান দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কাছ থেকে আরও একটি আসনের জন্য আলোচনা করছেন। বিষয়টি স্বীকার করেছেন দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন।

বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি জানান, জামায়াত চাইলে তাদের দুই-একটি আসনে ছাড় দিতে পারে। এ নিয়ে উভয় দলের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে। আশা করি বিষয়টি সমাধান হবে

তিনি আরও বলেন, ‘‘দলের রাজনৈতিক পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দুই-একদিনের মধ্যে ফরম বিক্রি শুরু হবে।’’

এবারও কি পারিবারিক বৃত্ত নাকি, যোগ্যদের মূল্যায়ন?

অতীতে সংরক্ষিত নারী আসনের বেশিরভাগ নেত্রীই মনোনয়ন পেয়েছেন পারিবারিক পরিচয়ে। কেউ বাবা আর কেউ স্বামীর পরিচয়ে মূল্যায়ন পেয়েছেন। এতে মাঠের অনেক ত্যাগী নেত্রী বঞ্চিত হন। এবার নারীনেত্রীদের দৌড়ঝাঁপ দেখে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, এবারও কী অতীতের ধারাবাহিকতা থাকবে? নাকি ত্যাগী নেত্রীরা মূল্যায়ন পাবেন?

এ বিষয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, তার দলের কোন নেত্রীরা মনোনয়ন পাবেন, তা এখনও নির্ধারিত হয়নি। তবে আমরা সঠিক প্রার্থীদেরই বাছাই করবো। পরিবারতন্ত্র নয়, সাংগঠনিক যোগ্যতাই হবে একমাত্র মাপকাঠি।

জানতে চাইলে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবার সব ক্ষেত্রেই যোগ্যদের মূল্যায়ন করছেন। আশা করি সংরক্ষিত নারী আসনে মাঠে ভূমিকা রাখা নেত্রীদের মনোনয়ন দেবেন। আর কোনও নেতার স্ত্রী-সন্তানরা মনোনয়ন পেলেও অবশ্যই তাদের সর্বোচ্চ কোয়ালিটির অধিকারী হতে হবে।’’