বছরের প্রথম দিন বাড়ির সবাই মিলে একটু ভালোমন্দ না খেলে কি বাঙালির চলে? আগামীকাল পহেলা বৈশাখে ঘরে কী রান্না হবে, তা নিয়ে নিশ্চয়ই ঘরে ঘরে চলছে ‘গবেষণা’। কিন্তু হিসাব-নিকাশটা এবার যে বড়ই কঠিন! কারণ এই দুর্মূল্যের বাজারে ‘শখের তোলা আশি টাকা’ এখন হাজার টাকায় ঠেকেছে। বছরের প্রথম সকালে শখ করে পান্তা-ইলিশের কথা আর ভুলেও মনে আসে না মধ্যবিত্তের। এত দিন তাই অনেকের ঘরেই চালু হয়েছে মুরগির ঝোল দিয়ে গরম ভাত।
‘অজানাকে জানা’র চ্যালেঞ্জ নিয়ে কালের কণ্ঠ নামে অনুসন্ধানে। উদঘাটন হয় অতি মুনাফালোভের এক কুটিল কারসাজি। এই কারসাজির একদম সম্মুখসারিতে আছে পোলট্রি খাতের করপোরেট কম্পানিগুলো। তাদের কীর্তির সূত্র ধরে পরের আরো চারটি ধাপের ব্যবসায়ীরাও অতি মুনাফার ফাঁদ পেতে বসেন।
কম্পানি হয়ে খামার থেকে ভোক্তার ঘর পর্যন্ত পৌঁছানোর আগে এই পাঁচটি ধাপ পার হতে হতে কিভাবে সোনালি মুরগি আগুনলাল হয়ে উঠল—জানার জন্য প্রিয় পাঠক, চলুন, কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানের সঙ্গে।
কম্পানির লোভ-লাভ
গত শনিবার সকালে রাজধানীর হাতিরপুল বাজারে সাপ্তাহিক বাজার করতে গিয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা হাফিজুল করিম।
হাফিজুল করিমের এই প্রশ্ন মাথায় নিয়ে শুরু হয় আমাদের অনুসন্ধান। দেশের বিভিন্ন জেলার খামারি, পাইকারি ব্যবসায়ী এবং খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, বর্তমানে বাজারে যেই সোনালি মুরগি পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলো দুই মাস আগে, ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে বাচ্চা কিনে লালনপালন শুরু করেন খামারিরা। অথচ আগের মাসেই সেই বাচ্চার দাম ছিল ৩০-৩৫ টাকার মধ্যে।
দেশে মুরগি, বাচ্চা, খাদ্য উৎপাদনসহ পোলট্রি প্যাকেজ শিল্পের বড় কম্পানি আছে ৮-১০টির মতো। বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিশেনের তথ্যমতে, দেশে মুরগি বা বাচ্চা বা খাদ্যশিল্পের বড়-ছোট-মাঝারি মিলিয়ে এ রকম কম্পানি আছে শ-তিনেক। তাদেরই একটি সততা ফার্ম ও হ্যাচারি। এই কম্পানির জেনারেল ম্যানেজার আব্দুস সালাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুই মাস আগে সোনালি মুরগির বাচ্চার দাম বৃদ্ধির কারণ ছিল—ফ্লুর কারণে খামারে খামারে মুরগি মারা যাচ্ছিল। তাই বাচ্চার চাহিদা বেড়ে গিয়েছিল। আর চাহিদা বাড়লে দাম তো বাড়বেই।
যাঁদের সঙ্গে সারা বছর ব্যবসা করেন, তাঁরা বিপদগ্রস্ত হলে সহযোগিতার হাত না বাড়িয়ে বাচ্চার দাম বাড়ালেন কেন—প্রশ্ন করলে আব্দুস সালাম কালের কণ্ঠকে বলেন, আমাদের হ্যাচারিগুলোতেও অনেক সময় ক্ষতিতে বাচ্চা বিক্রি করি। কারণ কাঁচামাল তো সংরক্ষণের উপায় নেই। গত বছর ১০-১৫ টাকাতেও সোনালি মুরগির বাচ্চা বিক্রি করতে হয়েছে। এক দিনের একটি সোনালি মুরগির বাচ্চা উৎপাদনে ২৫ টাকার মতো খরচ পড়ে। তাই যখন চাহিদা বেশি থাকে, তখন দাম একটু বেশি পাই। এখানে আমাদের একার কোনো হাত নেই, সব কম্পানি মিলেই এই দাম নির্ধারণ করে।’
খামারির ক্ষতি পূরণ
দেশে একসময় পোলট্রি খামার ছিল ছোট, বড়, মাঝারি মিলিয়ে এক লাখ ৬০ হাজারের মতো। নানা সংকটে পড়ে সেই সংখ্যা এখন ৬০ হাজার থেকে ৭০ হাজারের মতো হবে বলে পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা জানান।
মূলত পোলট্রি শিল্পের করপোরেট কম্পানিগুলোর কাছ থেকে এক দিনের বাচ্চা কিনে মাস দুয়েক পালন করতে হয় এই খামারিদের। ওই দুই মাসে একেকটি মুরগির খাবার লাগে আড়াই থেকে তিন কেজি, যার দাম কমবেশি ২০০ টাকা। গত ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে ফ্লু দেখা দেওয়ায় সারা দেশেই মুরগির খামারিরা বড় ক্ষতির মুখে পড়েন।
ফেব্রুয়ারি থেকে আবার শুরু হয় নতুন বাচ্চা কিনে লালন-পালন। কিন্তু সেই বাচ্চা কিনতে হয় আগের চেয়ে ১৫-২০ টাকা করে বেশি দামে। এর সঙ্গে খাবারের ২০০ এবং ওষুধ-পথ্যসহ অন্যান্য খরচ যোগ করে এক কেজি মুরগি উৎপাদনের মোট খরচ পড়ে ২২০-২৩০ টাকার মতো। এর সঙ্গে ১০-২০ টাকা লাভ ধরে গত মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহেও খামারিরা সোনালি মুরগি বিক্রি করেছেন ২৪০-২৫০ টাকা কেজি দরে।
কিন্তু ক্রমে বাড়তে বাড়তে চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহেই সেই মুরগির দাম উঠে যায় খামার পর্যায়েই ৩৩০-৩৪০ টাকা কেজি। কারণ হিসেবে খামারিরা বলেন, আগের লটে ফ্লুর কারণে তারা ব্যাপক লোকসানে পড়েছেন। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতেই তাঁরা এখন দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছেন।
ফেনীর খামারি জাফর আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, “এখন বাজারের চাহিদা অনুযায়ী সোনালি মুরগি নেই। তাই যাদের কাছে আছে তারা ভালো দাম পাচ্ছে। তাই আগের চেয়ে কিছুটা বেশি লাভে বিক্রি করতে পারছে। তবে অনেকেই ফ্লু-এর ভয়ে মুরগির সাইজ বড় হওয়ার আগেই বিক্রি করে দিয়েছিল, যার পরিপ্রেক্ষিতে এখন এই ইমপ্যাক্ট পড়েছে বাজারে।”
খামারিদের দাবি, বাজারে এখন যে দামে মুরগি বিক্রি হচ্ছে, তার বড় অংশই বাড়ছে খামারি ও খুচরা বিক্রেতার মাঝের স্তরে।
গাজীপুরের এক খামারি জহির চৌধুরী বলেন, “বর্তমানে আমরা খামার থেকে সোনালি মুরগি ৩২৫ থেকে ৩৪০ টাকায় বিক্রি করছি। কিন্তু বাজারে সেটা ৪০০ টাকার বেশি হয়ে যাচ্ছে। মাঝখানে যারা সংগ্রহ করে বাজারে দেয়, তারাই বেশি দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।”
ময়মনসিংহের এক খামারি বলেন, “রমজানের আগে আমরা ২৮০ টাকায় সোনালি মুরগি বিক্রি করেছি। এখন ৩২০ থেকে ৩৩০ টাকায় বিক্রি করছি। কিন্তু বাজারে সেটা ৩৭০ থেকে ৩৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।”
কিশোরগঞ্জের খামারিরা জানান, তাঁরা এখন প্রতি কেজি ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি করছেন। কিন্তু পাইকারি ব্যবসায়ীরা তা ৩০ থেকে ৩৫ টাকা লাভে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করছেন। এরপর খুচরা বিক্রেতারা আবার অন্তত ৪০ টাকা লাভ যোগ করে ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করছেন। ফলে খামার থেকে বাজারে পৌঁছতে পৌঁছতে প্রতি কেজিতে প্রায় ৮০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়ে যায়।
চট্টগ্রামের এক খামারি জানান, উৎপাদন খরচও অনেক বেড়েছে। আগে সয়াবিন ও ভুট্টা কেজিপ্রতি ৪০ থেকে ৪৫ টাকায় পাওয়া গেলেও এখন তা ৬৫ থেকে ৭০ টাকায় পৌঁছেছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও ওষুধের খরচও বেড়েছে।
মধ্যস্বত্বভোগীর অতি লোভ
খামার থেকে মুরগি সংগ্রহ করে কখনো পাইকার, কখনো বা খুচরা দোকানে যাঁরা সরবরাহ করেন, বাজার ব্যবস্থাপনায় তাদের বলা হয় মধ্যস্বত্বভোগী। এ রকম একজন চট্টগ্রামের এনাম আহমেদ। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, “হঠাৎ করে গত দুই সপ্তাহে মুরগি কমে যাওয়ায় অল্প মুরগি নিয়েই গাড়ি চলাচল করতে হচ্ছে, ফলে পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে। এ ছাড়া খামারিরা ফ্লু-এর কারণে ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ায় হঠাৎ করে মার্কেটে মুরগির সরবরাহ কম ও দাম বেড়ে গেছে। আগে যেখানে প্রতিটি মুরগিতে ৪০ টাকার মধ্যে খরচ সীমাবদ্ধ থাকত এখন সেটা ৬০ টাকা পর্যন্ত উঠে গেছে। তাই আমাদেরও বাজারে বেশি দামে দিতে হচ্ছে। খামারি থেকে সোনালি মুরগি ৩৫০-৩৫৫ টাকায় কিনে আমাদের ৪০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে।”
এই মধ্যস্বত্বভোগীদের হিসাবে, গত দুই সপ্তাহে পরিবহন খরচ প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। জ্বালানি সরবরাহ কমে যাওয়ায় যানবাহনের সংখ্যা কমেছে। অন্যদিকে খামারে উৎপাদন কম থাকায় তাঁদের কম মুরগি সংগ্রহ করতে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হচ্ছে। ফলে প্রতি ইউনিটে খরচ আরো বেড়ে যাচ্ছে।
ছাড়ে না পাইকারও
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীরা খামারিদের কাছ থেকে মুরগি কিনে সরাসরি খুচরা দোকানিদের কাছে বিক্রি করে। আবার একটি অংশ পাইকারি মূল্যে আড়তদারদের কাছেও বিক্রি করে। সেখানে খুচরা দোকানিদের চেয়ে ২০ থেকে ২৫ টাকা কমে বেচাকেনা হয়। এই চতুর্থ ধাপে আড়ত থেকে যেসব খুচরা দোকানি মুরগি কিনে নেন, তাঁদের দাম কিছুটা বেশি পড়ে। গত রবিবার রাজধানীর কাপ্তানবাজারের আড়তে সোনালি মুরগির পাইকারি দর দেখা গেছে ৩৯০ থেকে ৪০০ টাকার মধ্যে। এখান থেকে কিনে নেওয়া বেশির ভাগ খুচরা দোকানি সেই মুরগি ৪৩০ থেকে ৪৫০ টাকায় বিক্রি করছেন।
খুচরায় বড় লাফ
বাজার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছরের একই সময়ে খামারি পর্যায়ে সোনালি মুরগির দাম ছিল প্রতি কেজি ২০০ থেকে ২২০ টাকা, যা ভোক্তা পর্যায়ে ছিল ২৫০ থেকে ২৭০ টাকা। কিন্তু চলতি বছরের মার্চের প্রথম সপ্তাহে খামারি পর্যায়ে দাম বেড়ে দাঁড়ায় ২৪০ থেকে ২৫০ টাকা, আর খুচরা বাজারে তা ২৮০ থেকে ৩১০ টাকায় বিক্রি হতে শুরু করে। এরপর মাত্র এক মাসের ব্যবধানে এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে খামার পর্যায়ের দাম লাফিয়ে ওঠে ৩৩০ থেকে ৩৬০ টাকায় এবং খুচরা বাজারে তা ৪১০ থেকে ৪৪০ টাকায় পৌঁছে যায়।
রাজধানীর ফার্মগেটের খুচরা বিক্রেতা মোজাম্মেল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঈদের আগ থেকেই বাজারে সোনালি মুরগির চাহিদা বেড়েছে, কিন্তু সরবরাহ কমে গেছে। আগের মতো মুরগি পাওয়া যাচ্ছে না।’
চট্টগ্রামের বাজারগুলোতেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। চকবাজার, রিয়াজুদ্দিন বাজার ও বহদ্দারহাট এলাকায় সোনালি মুরগির দাম কেজিপ্রতি ৩৮০ থেকে ৪২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ঈদের আগে এই মুরগি পাওয়া যেত ৩৫০ থেকে ৩৬০ টাকার মধ্যে।
ঢাকার মোহাম্মদপুরের খুচরা দোকানি ইকবাল মিয়া বলেন, ‘আমাদের এক কেজি সোনালি মুরগি ২৯০ টাকায় কেনা পড়ে, যা ৪২০ থেকে ৪৩০ টাকায় বিক্রি করি। আগে হয়তো দিনে ১০০টি সোনালি মুরগি বিক্রি করতাম, তাই ১০ থেকে ১৫ টাকা লাভে বিক্রি করলেই চলত। কিন্তু এখন সোনালি ৫০টির মতো বিক্রি করতে পারি। এ ছাড়া বাজারে সরবরাহও কম।’
প্রমাণ ব্রয়লারে
এই পাঁচ ধাপের ব্যবসায়ীরা আগামীকালের পহেলা বৈশাখকে টার্গটে করেই যে বহুল চাহিদার এই সোনালি মুরগির দাম প্রথম থেকেই বাড়িয়ে দিয়ে অতি মুনাফার ফাঁদ পেতেছেন, তার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ লুকিয়ে আছে ব্রয়লার মুরগির বাজারদরে।
ওই আলোচিত সময়ের মধ্যে ব্রয়লারের দাম সোনালি মুরগির মতো বাড়েনি। অথচ গত শীতের ফ্লুতে শুধু সোনালি নয়, ব্রয়লার মুরগিও আক্রান্ত হয়েছিল। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সোনালি মুরগি বিক্রির মতো আকারের হতে দুই মাসের মতো সময় লাগে; অন্যদিকে ব্রয়লার ১৫ থেকে ২০ দিনেই বিক্রির উপযোগী হয়ে যায়। বর্তমানে বাজারে গত মাসের চেয়ে মাত্র ১০ থেকে ১৫ টাকা বেশি দরে ব্রয়লার বিক্রি হতে দেখা গেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে সোনালি মুরগির চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়াতেই ব্যবসায়ীরা এটাকে টার্গেট করে দাম বাড়িয়েছেন। এ ছাড়া ব্রয়লারের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় মধ্যস্বত্বভোগীরা এটাকে টার্গেটে নিতে পারেনি।
দায় ছোড়াছুড়ি
পোলট্রি খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গত কয়েক বছরে পোলট্রি শিল্পে বড় বড় করপোরেট কম্পানির প্রভাব বেড়েছে। তারা বাচ্চা, ফিড ও ওষুধের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে ছোট খামারিদের অনেক সময় বাধ্য হয়ে তাদের নির্ধারিত দামে এসব কিনতে হয়। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. সুমন হাওলাদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশে সোনালি মুরগির সরবরাহ ৮০ শতাংশের ওপরে আমাদের মতো ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিরা করে থাকি। কিন্তু এই খামারিদের দোহাই দিয়ে করপোরেট গ্রুপগুলো সরকার থেকে সুবিধা নিয়ে খাবারের দাম ও বাচ্চার দাম বাড়িয়ে দিয়ে আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ফলে মুরগির দাম বেড়ে যায়। আর সরকারের এ ক্ষেত্রে কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকায় যখন চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত উৎপাদন হয়, তখন উৎপাদন খরচের কমে ক্ষতিতে মুরগি বিক্রি করতে হয়। অন্যদিকে যখন চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম থাকে তখন খামারিরা একটু বেশি দাম পেলেও মধ্যস্বত্বভোগীরা আরো বেশি মুনাফার আশায় বাজারে বেশি দামে বিক্রি করে।’
তিনি আরো বলেন, ‘মুরগি উৎপাদনের বড় অংশ খামারিদের হাতে থাকলেও দাম বাড়ার সব উপাদান করপোরেট গ্রুপগুলোর হাতে। যেমন : মুরগির খাবার, ওষুধ, বাচ্চা ইত্যাদি দেশের মাত্র ৮-১০টি করপোরেট গ্রুপের হাতে। তাই তারা সংকট বুঝে বাচ্চা, খাবারের দাম বাড়িয়ে দেয়। দুই মাস আগে ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে হুট করে মুরগির বাচ্চার দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়, যার টার্গেট ছিল এই পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে। কারণ দুই মাস আগে যে বাচ্চা তোলা হয়েছিল, সেগুলো এখন বাজারে আসছে। তাই তখন যারা বাড়তি দামে বাচ্চা কিনেছিল তাদের বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। অন্যদিকে গত এক সপ্তাহ আগে খাবারের দাম প্রতি কেজিতে তিন টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। যার ফলে বাজারে এর প্রভাব পড়েছে।’
অন্যদিকে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো এসব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে তাদের নানা সমস্যা নিয়ে বলছে।
ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (ঋওঅই) কার্যনির্বাহী সদস্য ইহতেশাম বি শাহজাহান কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশে ৩০০টির মতো ফিড মিল রয়েছে। তাই হুট করে কেউ চাইলেই দাম বাড়াতে পারে না। বৈশ্বিক বাজার বিবেচনায় প্রতিটি কাঁচামাল আমদানিতে খরচ বেড়েছে। ফলে এক সপ্তাহ আগে পশুখাদ্যের দাম ৩ শতাংশের মতো বাড়াতে হয়েছে।
ইহতেশাম বি শাহজাহান কোয়ালিটি ফিডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং সংগঠনটির সাবেক সভাপতি। তিনি আরো বলেন, ‘খাবারের কাঁচামাল আমদানিতে সরকার আমাদের থেকে অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স নিয়ে নেয় এলসি ওপেন করার আগে। কিন্তু এই কাঁচামাল পেতে যেখানে সর্বোচ্চ দুই-তিন সপ্তাহ লাগার কথা, সেখানে দুই মাস পর্যন্ত লেগে যায়। পোর্টেই এগুলো পড়ে থাকে দুই সপ্তাহের বেশি। যেগুলো নিয়ে সরকার কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।’
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোশাররফ হোসেন জানান, খামারিদের মুরগি উৎপাদন কমে গেছে এক মাস ধরে। আগে যেখানে ব্যবসায়ীরা খামার থেকে পাঁচ হাজার মুরগি সংগ্রহ করতেন, এখন সেখানে তিন হাজার বা তার কিছু বেশি পাচ্ছেন। ফলে মুরগি সংগ্রহের খরচ বেড়ে গেছে।
তিনি বলেন, ‘মুরগির খাবার দেশে উৎপাদন করা হলেও কাঁচামালের জন্য আমরা অনেকাংশে আমদানির ওপর নির্ভরশীল। এরই মধ্যে প্রতি কেজিতে প্রায় আড়াই টাকা দাম বেড়েছে। পরিস্থিতি আরো খারাপ হলে তা ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।’
সরকারি নিয়ন্ত্রণ দাবি
কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সোনালি মুরগির বিভিন্ন ধাপে যে দাম বৃদ্ধি, সেটা অস্বাভাবিক। একদিকে যুদ্ধের অজুহাতে বাচ্চা, খাবার ও ওষুধের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়, আবার মাঠ পর্যায়ে মধ্যস্বত্বভোগী ও ব্যবসায়ীরা সংকটের সুযোগ নিয়ে দাম বাড়ায়। আর ভোগান্তি পোহাতে হয় ক্রেতাদের। এ জন্য এই বাজারকে সরকারের মনিটরিং ও জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। আর এই ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট যখন যেই পণ্যের সংকট থাকে, সেটার দাম বাড়িয়ে দেয়। এর পেছনের অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে উৎপাদন পর্যায়ে খামারিদের ক্ষতি পুষিয়ে তুলতে সরকারের ব্যবস্থা নিতে হবে। যেন তাদের ক্ষতির ভার গ্রাহকদের ঘাড়ে এসে না চাপে।’
ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর মতে, বাজারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হলে সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে হবে এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। একই সঙ্গে খামারিদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, ভর্তুকি এবং রোগ প্রতিরোধে সরকারি সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন।
পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. সুমন হাওলাদার বলেন, ‘স্বাভাবিক সময়ে এক কেজি সোনালি মুরগির উৎপাদন খরচ ২০০ থেকে ২৩০ টাকা। সরকার যদি খামারিদের কাছে প্রতি কেজির দাম ২৬০ টাকা নির্ধারণ করে দেয় এবং বাজার তদারকি করে, তাহলে বাজারে দাম খুব বেশি হেরফের হওয়ার কথা না।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই যদি সরকার বাজার তদারকি জোরদার না করে এবং খামারিদের সহায়তা না দেয়, তাহলে পোলট্রি খাতে দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হতে পারে। আর সেই সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হবে দেশের সাধারণ ভোক্তারা, যাদের জন্য সোনালি মুরগি তুলনামূলক সাশ্রয়ী একটি প্রোটিনের উৎস।