ঋণের শর্ত হিসাবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-বাংলাদেশকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ লাখ ৭০০ কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের টার্গেট দিয়েছে। সেই টার্গেট পূরণ করতে কর অব্যাহতির পরিমাণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনাসহ কর হার বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দল বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সারচার্জের পরিবর্তে ‘সম্পদ কর’ আরোপের চিন্তা করছে সংস্থাটি।
যদিও এই টার্গেটকে আকাশচুম্বী, অতি উচ্চাভিলাষী বলছে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা। তাদের মতে, এত বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর কোনোটিই নেই এনবিআরের। শুধু করহার বাড়িয়ে রাজস্ব আদায়ের চিন্তা করলে তা ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি ছাড়া সুফল আনবে না।
গত ৪ বছরে রাজস্ব আদায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এ সময় গড় প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ১২ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছিল প্রায় ৩ লাখ ৭১ হাজার কোটি টাকা। এর সঙ্গে গড় প্রবৃদ্ধি যোগ করলে চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হতে পারে ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। যদিও অর্থবছরের ৮ মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) ২ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা। আইএমএফের দেওয়া শর্ত অনুযায়ী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ৬ লাখ কোটি টাকা করা হলে, এনবিআরকে প্রায় ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এ লক্ষ্য আদৌ যৌক্তিক কিনা তা নিয়ে খোদ এনবিআরের কর্মকর্তাদের মাঝে সন্দেহ আছে।
বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনা সভায় এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান ৬ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার কথা জানান। এ সময় তিনি বলেন, সামনে রাজস্ব আদায়ের কঠিন চ্যালেঞ্জ, কারণ টার্গেট ৬ লাখ কোটি টাকা। এর আগেরবার টার্গেট ছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা।
বাজেট প্রণয়নে জড়িত এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, আইএমএফের দেওয়া রাজস্বের লক্ষ্যকে ভিত্তি ধরে বাজেটের রূপরেখা প্রস্তুত করা হয়েছে। এর সঙ্গে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারকেও প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এ দুয়ের ওপর ভিত্তি করে কর কাঠামোও সেভাবে পুনর্গঠন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অব্যাহতি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনাসহ আয়কর ও ভ্যাট খাতে বড় পরিবর্তন আনা হবে। তিনি বলেন, এবারের বাজেটে এনফোর্সমেন্টে জোর দেওয়া হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো সংস্কারের বিষয়ে ইতোমধ্যে সরকারর উচ্চপর্যায় থেকে গ্রিন সিগন্যাল পাওয়া গেছে। যেমন রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরের বাড়িওয়ালাদের রিটার্ন যাচাই, সারচার্জের পরিবর্তে সম্পদ কর বা ওয়েল ট্যাক্স আরোপ, কোম্পানির ন্যূনতম করহার বাড়ানো হতে পারে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাটের আওতায় আনার প্রয়াস থাকবে। ওয়াশিংটন থেকে ফেরার পর অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে কাঠামো নিয়ে আলোচনার পর এসব চূড়ান্ত করা হবে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, জানুয়ারি মাসে অন্তর্বর্তী সরকার এনবিআরকে আগামী ৩ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার নির্ধারণ করে দেয়। সে অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৫ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা, ২০২৭-২৮ অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ৬৬ হাজার কোটি টাকা এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৬৭ হাজার কোটি টাকা প্রাক্কলিত লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক অর্থনীতিকে কর কাঠামো সংস্কারের প্রধান বাধা উল্লেখ করে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে বলা হয়েছে, আয়কর ব্যবস্থার আওতা সংকীর্ণ রেখে দীর্ঘদিন ধরে একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে কর সুবিধার বাইরে রাখা হয়েছে। বিএনপি এই বৈষম্যমূলক কাঠামোর অবসান ঘটাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। উচ্চ আয়ের ব্যক্তি, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী ও সম্পত্তির মালিকদের করজালের আওতায় আনা হবে এবং ডিজিটাল ব্যবস্থা, তথ্য বিনিময় ও ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষার মাধ্যমে কর ফাঁকি রোধ করা হবে। একই সঙ্গে কর ছাড় ও প্রণোদনা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করা হবে। ভ্যাট ব্যবস্থাকে সহজ, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করা হবে।
এতে আরও বলা হয়েছে, বিনিয়োগ বাড়ানোর নামে কর ছাড় দীর্ঘদিন ধরে রাজস্ব ক্ষয়ের প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিএনপি কর প্রণোদনাকে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তি উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করবে। যে প্রণোদনা বাস্তব বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, তা বজায় থাকবে; যা কেবল মুনাফা বাড়িয়ে রাজস্ব ক্ষয় ঘটাবে, তা বাতিল করা হবে। এছাড়া স্থাবর সম্পদকে করভিত্তিতে আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রির (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, ‘আগামী অর্থবছরের রাজস্বের লক্ষ্য অযৌক্তিক, বাস্তবসম্মত নয়। এ লক্ষ্য আদায়ও সম্ভব নয়।’ তিনি আরও বলেন, গত ২-৩ বছর কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান মুনাফা করতে পারেনি। সবাই ব্যবসা টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে ব্যস্ত ছিল। আশায় ছিল, রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় জ্বালানি সংকট, ব্যাংক ঋণের সুদে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে, ব্যবসার পরিবেশ উন্নত হবে। কিন্তু বাজেটে রাজস্ব আদায়ের এত বিশাল লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলে, তা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হয়রানির মাত্রা আরও বেড়ে যাবে।
আনোয়ার পারভেজ বলেন, রাজস্ব আদায় বাড়াতে করজাল না বাড়িয়ে এনবিআর, যারা ট্যাক্স দেন, তাদের ওপর আরও বোঝা চাপিয়ে দেয়। এ কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধও হয়ে গেছে। অথচ জরিপ বলছে সারা দেশে এক কোটির বেশি ব্যবসা ইউনিট আছে। এনবিআর কী তাদের কাছ থেকে ভ্যাট আদায় করতে পারছে। আবার ঢাকা শহরে যত চাকরিজীবী মানুষ আছেন, তাদের কাছ থেকে আয়কর আদায় করতে পারছে? প্রকৃতপক্ষে এনবিআর সহজে কর আদায় করতে চায়, বিধায় এ ধরনের পলিসি নেয়।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা র্যাপিডের (রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. এম আবু ইউসুফ বলেন, বিশাল এই রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবসম্মত নয়। কীভাবে তা নির্ধারণ করা হয় তাও বোধগম্য নয়। প্রতিবারই এনবিআর যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে, বছর শেষে সেটা আদায় করতে পারে না। চলতি অর্থবছরেও বড় ঘাটতি থাকতে পারে। এ কারণে আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা নষ্ট হয়। তিনি আরও বলেন, এনবিআরে অটোমেশন হচ্ছে। তবে তা অনেক ধীরগতির এবং বড় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সহায়ক নয়। অটোমেশনের পাশাপাশি করজাল বাড়ানোর ক্ষেত্রেও এনবিআরের মনোযোগ দেওয়া উচিত। এখন যারা কর দেন তাদের ওপরেই নতুন বোঝা চাপানো হয়। ভ্যাট চুরি বন্ধ করা গেলে আদায় তিনগুণ বাড়ানো সম্ভব।
হিসাববিদদের সংগঠন আইসিএবির সাবেক সহসভাপতি লুৎফুল হাদী বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ৬ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা, অতি উচ্চাভিলাষী। এটি কোনোভাবেই আদায়যোগ্য নয়। রাজস্ব আদায় বাড়াতে হলে বিনিয়োগকারীদের উপযুক্ত পরিবেশ দিয়ে আগে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফেরাতে হবে। তা না করে করের বোঝা চাপিয়ে দিলে হিতে বিপরীত হতে পারে।