গাজীপুরের কালীগঞ্জের আজমতপুর গ্রাম ঘেঁষে শুঁটকিমারার টেক। গাছপালায় ঘেরা স্থানটির এক কিলোমিটারের মধ্যে নেই জনবসতি। সন্ধ্যা নামলেই পাল্টে যায় এখানকার পরিবেশ। বসে ইয়াবার হাট।
এই শুঁটকিমারার টেকের এক-দেড় কিলোমিটারের মধ্যে আজমতপুর গ্রামে রয়েছে আরো ১১টি মাদক বিক্রির স্পট। অর্থাৎ একটি গ্রামের ১২টি স্পটেই প্রতিদিন চলছে জমজমাট মাদকের হাট।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্রামের নাজমুল সরকার (৩৫) আজমতপুরের সব মাদকস্পট ও পাশের কাপাসিয়া উপজেলার অধিকাংশ এলাকার মাদক কারবার পরিচালনা করেন।
কালীগঞ্জের আরেক আলোচিত মাদক কারবারি বাহাদুরসাদী ইউনিয়নের মারুফ (৩০)। এলাকায় ইয়াবা সম্রাট নামে পরিচিত এই ব্যক্তি এখন বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ির মালিক। স্বজনরা জানিয়েছেন, এই বাড়ি তৈরিতে খরচ হয়েছে তিন কোটি টাকা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মারুফের আলাদা কোনো ব্যবসা বা চাকরি ছিল না। বড় বোন মায়া আক্তারের হাত ধরে তিনি মাদক কারবারে ঢোকেন।
শুধু কালীগঞ্জ নয়, গাজীপুরের পাঁচ উপজেলার প্রায় প্রতিটি গ্রাম, পাড়া-মহল্লা এবং মহানগরীর অলিগলিতে গড়ে উঠেছে মাদকের স্পট। নেশার টাকা ও মাদক ব্যবসা নিয়ে দ্বন্দ্বে গত ১৩-১৪ মাসে কাপাসিয়ায় খুন হয়েছেন অন্তত পাঁচজন। কেউ বাবা-মা বা স্বজনকে খুন করছেন। আবার নির্যাতন সইতে না পেরে কেউ খুন করছেন মাদকাসক্ত সন্তানকেই। গত বছরের ৩০ এপ্রিল শ্রীপুরে বাবা মোহাম্মদ আলী (৭০) ঘুমন্ত ছেলে আনোয়ার হোসেনকে (২৫) কুপিয়ে হত্যা করেন। এর আগের বছরের ৩ এপ্রিল কালীগঞ্জে মাদকাসক্ত ছেলে কাউসারকে কুপিয়ে হত্যা করেন বাবা রশিদ বাগমার।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গাজীপুরের অসংখ্য স্পটে মাদক কারবার চালাচ্ছেন তিন সহস্রাধিক ব্যক্তি। গত ১০ বছরে জেলায় মাদককাণ্ডে ৪০ জনের বেশি মানুষ খুন হলেও টনক নড়েনি পুলিশ প্রশাসনের। বাসিন্দাদের অভিযোগ, নামমাত্র অভিযান হয়, তাতেও টানাহেঁচড়া হয় শুধু চুনোপুঁটিদের নিয়ে। অধরা থেকে যান রাঘব বোয়াল মাদক কারবারিরা। বড় চালান নিয়ে তাঁরা কেউ কখনো গ্রেপ্তার হলেও উচ্চ আদালত থেকে দ্রুত জামিন নিয়ে ফের লিপ্ত হচ্ছেন মাদক কারবারে।
শ্রীপুরের মাদকের হাট নিয়ন্ত্রণ করছেন কয়েক শ মাদক কারবারি। স্থানীয়দের মতে, এখানে শিক্ষার্থী থেকে শিক্ষক, আইনজীবী, রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক এমনকি পুলিশের সদস্যও রয়েছেন মাদকাসক্তের তালিকায়। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য মতে, মাদক আগেও ছিল। কিন্তু পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এর বিস্তার হয় ব্যাপক। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পরিস্থিতি বেসামাল হয়ে ওঠে। পুলিশ কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না, বরং মাদক কারবারিদের সঙ্গে তাদের রয়েছে গোপন সখ্য।
স্থানীয়রা জানান, গাজীপুর মহানগরীর মাদকের রাজধানী বলা যায় টঙ্গীকে। এখানে সড়ক, রেল ও নৌপথে মাদক আসে রাতদিন, পরে ছড়িয়ে যায় জেলার বিভিন্ন স্পটে। টঙ্গীর এরশাদনগর বস্তি, মাজার বস্তি, ব্যাংকের মাঠ বস্তি, কেরানীর টেক বস্তি মাদকের প্রধান পাইকারি হাট। সেনাবাহিনী ও মহানগর পুলিশ কয়েক দফা অভিযান চালিয়ে শতাধিক মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করলেও ব্যবসা বন্ধ হয়নি।
টঙ্গীতে অধিকাংশ মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ কয়েকজন নারীর হাতে। আলোচিতদের মধ্যে ব্যাংক মাঠ বস্তির মোমেলা বেগম, ময়না বেগম ও আরফিনা বেগমের নাম শোনা যায়। তাঁদের পাশাপাশি মাদক কারবার করেন ময়না বেগমের ভাই শফিকুল ইসলাম, মেয়ে নার্গিস আক্তার ও ছেলে তাজুল ইসলাম তাজু। এই তিনজনই অনেক মাদক মামলার আসামি। এলাকাবাসী জানান, ময়না ও তাজুল মাদকের টাকায় আত্মীয়-স্বজন ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের নামে গাজীপুর ও মাদারীপুরে গড়ে তুলেছেন কয়েক কোটি টাকার সম্পদ।
এ ছাড়াও রানী ও তাঁর ছেলে রাব্বানি, রিপন মিয়া, টুক্কু, রত্না, আমির কানা, মৃদুলসহ শতাধিক শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী টঙ্গীর মাদকের হাট নিয়ন্ত্রণ করছেন।
গাজীপুর সদরে সবচেয়ে বড় মাদকের হাট ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের লক্ষ্মীপুরা এলাকায়। ১৫-১৬ বছর আগে শূন্য হাতে ঢাকার ডেমরার স্টাফ কোয়ার্টারসংলগ্ন চাঁনপাড়া বস্তি থেকে এসে লক্ষ্মীপুরায় ঘাঁটি গাড়েন তাহমিনা আক্তার। এলাকার জুলহাসের স্ত্রী এই তাহমিনা এখন শহরের সব থেকে বড় হেরোইন ও ইয়াবার ডিলার। তাঁর বিরুদ্ধে হেরোইন, ইয়াবা, ফেনসিডিল ও গাঁজা রাখার অভিযোগে সাতটি মামলা রয়েছে। তাঁর তিন মেয়ে, এক ছেলের সবাই মাদক কারবারি। মাদকের টাকায় গড়ে তুলেছেন চারতলা বাড়ি।
লক্ষ্মীপুরা এলাকার আরেক কোটিপতি মাদক কারবারি দম্পতি হারুন ও আশা। তাঁরাও গড়েছেন বহুতল বাড়ি। তাঁদের বিরুদ্ধেও রয়েছে এক ডজনের বেশি মাদক মামলা।
ছয়-সাত বছর আগেও অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করতেন মহানগরীর কাশিমপুর নয়াপাড়ার কাঁঠালতলা মহল্লার ডালিয়া (৩৮)। তাঁর স্বামী ওয়াসিম চালাতেন রিকশা। এখন তাঁদের পাঁচটি বাড়ির দুটিই ছয়তলা, বাকিগুলো টিনশেড বিল্ডিং। তাঁদের প্রতিবেশী আবুল কসাইয়ের মেয়ে লিপি বেগমও (৪০) ৮-৯ বছর আগে ঝিয়ের কাজ করতেন। তিনিও এখন একটি ছয়তলাসহ একাধিক বাড়ির মালিক।
ডালিয়া ছাড়াও তাঁর ভাই জাহাঙ্গীর হোসেন, হাছেন আলীর ছেলে আশু, মৃত মনির উদ্দিনের ছেলে জীবন ও তাঁর মা মরিয়ম বেগম মাদকের বড় কারবারি। লিপি বেগমেরও দুই ভাই রিপন, সবুজ এবং বোন শিল্পী এই ব্যবসায় পরিচিত মুখ। লিপির স্বামী ফরিদ পুলিশের সোর্স বলে পরিচয় দেন, দামি মোটরসাইকেল নিয়ে ঘোরেন। আগে এক শতাংশ জমিও ছিল না তাঁর।
একই মহল্লায় খোঁজ মেলে আরো ১৮ মাদক কারবারির। নেশায় জড়িয়ে গত ১২ বছরে মৃত্যু হয়েছে এই এলাকার কমপক্ষে ১২ জনের।
অন্য শীর্ষ মাদক ডিলারদের মধ্যে বাদশা তিনতলা বাড়ির মালিক। সমলা তিনতলা ও তাঁর ভাই বাতেন দোতলা বাড়ির মালিক। কারবারির মধ্যে আরো রয়েছেন—রহম আলীর ছেলে জাকির, জাকিরের স্ত্রী সমর্ত বানু, নুরুর ছেলে আলমগীর হোসেন, হোসেন আলীর ছেলে খোরশেদ প্রমুখ।
কাঁঠালতলা মহল্লায়ই রয়েছেন অন্তত ১৮ জন মাদক ডিলার। নেশায় জড়িয়ে এ এলাকায় গত ১২ বছরে মৃত্যু হয়েছে কমপক্ষে ১২ জনের।
জেলায় মাদকের বিস্তার বিষয়ে গাজীপুরের পুলিশ সুপার শরিফ উদ্দীন বলেন, সারা দেশের যে চিত্র, গাজীপুরেও মাদক বিষয়ে একই চিত্র। মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রত্যেক মা-বাবার উচিত সন্তানদের দিকে নজর রাখা। তবে জেলা পুলিশ বসে নেই। প্রতি মাসে মাদক মামলা, গ্রেপ্তার ও উদ্ধার বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি মাদক ব্যবসার সঙ্গে পুলিশের সম্পর্কের কথা অস্বীকার করে বলেন, সব পেশায়ই দু-একজন খারাপ লোক থাকে।
গাজীপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. ইসরাইল হাওলাদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মহানগর পুলিশের কোনো সম্পর্ক নেই। প্রতি রাতেই তালিকা ধরে যৌথ বাহিনীর অভিযান চলছে। উদ্ধার করা হচ্ছে বিপুল পরিমাণ মাদক। গ্রেপ্তার হচ্ছেন মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারী।’