ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আওয়ামী লীগ বলতে কোনো শব্দ নেই। অন্যান্য জায়গার মতো ঝটিকা মিছিল বা কোনো কর্মসূিচতে গত প্রায় ১৮-২০ মাসে এখানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সক্রিয় হতে দেখা যায়নি। সংসদ নির্বাচনের পর যখন অনেক জায়গায় দলের অফিস খোলার পাঁয়তারা চলে সেখানে এ জায়গায় পাওয়া যায় অন্য খবর। গোপনে দলের অফিসই বিক্রি করে দেয়া হয়েছে।
চাঞ্চল্যকর এ ঘটনা বেশ কয়েক মাস আগে ঘটে। মামলা-মোকদ্দমার খরচ মেটাতে, অসহায় এবং জেলে থাকা নেতাকর্মীদের সহায়তা দিতে জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ কয়েকজন নেতা অফিস বিক্রি করার উদ্যোগ নেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। যদিও জেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল ওই নেতারা অফিস বিক্রি করার কথা অস্বীকার করছেন। সরকারের পতনের পরপরই আত্মগোপনে চলে যান জেলায় দলটির সব পর্যায়ের পদধারী নেতারা।
দলের সংসদ সদস্য, জেলা, উপজেলা, পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের আসামি করে একের পর এক মামলা দেয়া হয়। এরপর ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হলে একেবারে নিঃশব্দ হয়ে পড়ে দলের নামধাম। ৫ই আগস্টের পর জেলা আওয়ামী লীগের নেতারা একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। কেউ কারও খোঁজখবরও করেননি। এরমধ্যে জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতিসহ দলের কয়েকজন সংসদ সদস্য এবং নেতা আটক হয়ে কারান্তরীন হন।
এমন অবস্থায় গত ৮/১০ মাস আগে শহরের মৌলভীপাড়ায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংক লিমিটেডের নতুন ভবন ও কমার্শিয়াল কাম শপিং কমপ্লেক্স মার্কেট যা সমবায় মার্কেট হিসেবে পরিচিত সেখানে আওয়ামী লীগের অফিস করার জন্য ক্রয় করা ৩টি দোকানঘর বিক্রি করে দেয়া হয়। ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের ২৪শে মে জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকারের সঙ্গে মার্কেটের প্রথম তলার ২২৪, ২২৫ ও ২২৬নং দোকান বরাদ্দের চুক্তি স্বাক্ষর হয়।
একেকটি দোকানের জন্য ১১ লাখ ৮৩ হাজার ৩৫০ টাকা করে প্রদান করা হয়। ওই চুক্তিপত্রে ব্যাংকের পক্ষে স্বাক্ষর করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংক লিমিটেডের সভাপতি শেফালী বেগম এবং প্রিন্সিপাল অফিসার মো. সোহরাব উদ্দিন। দলীয় সূত্র জানায়, দলের নিজস্ব কোনো অফিস না থাকায় শহরের প্রাণকেন্দ্রে ওই মার্কেটে দলীয় অফিস করার জন্য ওই ৩টি দোকানঘর দলীয় সিদ্ধান্তে ক্রয় করা হয়। সরজমিন দেখা গেছে, প্রথম তলার পশ্চিম দিকের সারিতে দোকানঘরের একটিতে স্টুডেন্ট গার্মেন্টস, বিশাল শুটিং সেন্টার ও স্টার টেইলার্স প্রাইভেট লিমিটেড নামে কাপড় সেলাইয়ের ৩টি দোকান রয়েছে।
স্টার টেইলার্সের স্বত্বাধিকারী সালাম চৌধুরী জানান, দোকান ৩টির মালিক এখন তিনি। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত আল মামুন সরকারের কাছ থেকে ৫ বছর আগে এগুলো ক্রয় করেছেন বলে তার দাবি। তার কাছে দোকান ক্রয়ের কাগজপত্র রয়েছে বলেও জানান। সালাম চৌধুরী এই দাবি করলেও অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কয়েক মাস আগে শহরের খৈয়াসারের এক বিশিষ্ট ব্যবসায়ীর মধ্যস্থতায় দোকান ৩টি ৬৫ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়। ওই ব্যবসায়ী জানান, সদর উপজেলার সুলতানপুর গ্রামের তার এক আত্মীয় দোকানগুলো নিয়েছেন। তার মাধ্যমেই লেনদেন হয়েছে। জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের হাতে টাকা দেয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, ৬৫ লাখ টাকায় দোকান ক্রয় করা হয়েছে। কমিটির একটি রেজুলেশন করে তাতে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক স্বাক্ষর করে দেন। তবে দোকানের দখল এখনো বুঝিয়ে দেয়া হয়নি। এর আগে দোকান বিক্রির বিষয়ে ঢাকার উত্তরায় ওই ব্যবসায়ীর ভাইয়ের বাসায় আওয়ীমী লীগ নেতাদের আলোচনা হয়।
তবে জেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতারা দোকান বিক্রির কথা সরাসরি স্বীকার করেননি। জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম খোকন বলেন, দোকানগুলো সেল করার ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত হয়নি। জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, ঢাকায় একটা মিটিং করে দোকানগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে রেজুলেশন করা হয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সমবায় ব্যাংক লিমিটেডের নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম বলেন, পার্টির নামেই দোকানগুলো বরাদ্দ নেয়া। মালিকানা পরিবর্তন হয়েছে বলে আমার জানা নেই। মালিকানা পরিবর্তন হতে হলে আমার স্বাক্ষর লাগবে। ম্যানেজিং কমিটির স্বাক্ষর লাগবে। ব্যাংকের উপদেষ্টা হিসেবে ইউএনও সাহেবের স্বাক্ষর লাগবে। সহকারী কমিশনার-ভূমি হচ্ছেন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কমিটির অন্তর্বর্তীকালীন সভাপতি। মালিকানা হস্তান্তর করতে হলে নির্ধারিত ফি আছে তা জমা দিয়ে আবেদন করে অনুমতি নিতে হয়। বর্তমানে ইউএনও স্যার এডহক কমিটির সভাপতি হওয়ার পর হস্তান্তর প্রক্রিয়া বন্ধ। আমি যেহেতু সিগন্যাচার করেনি এটা বৈধ কিছু নয়।
জেলা আওয়ামী লীগের নিজস্ব কোনো কার্যালয় নেই। সরকার পতনের আগ পর্যন্ত শহরের হলদারপাড়ায় সংসদ সদস্যের দলীয় কার্যালয় থেকেই দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে আসছিল। দলের স্থায়ী অফিস করার জন্য এই দোকানঘর ৩টি ক্রয় করা হয় বলে দলের নেতারা জানান। দলের অফিস বিক্রির খবর জানাজানি হলে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। জেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, সরকার পতনের এক বছর দলের নেতাদের কারও কোনো খোঁজখবর ছিল না। দলের এমপিরা জেলে আছেন, এতোগুলো নেতাকর্মী অ্যারেস্ট হয়েছেন তাদের জন্য জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক নিজেদের নামে একটি বিবৃতি দেয়ার সাহসও করেননি। একটা পোস্টার পর্যন্ত করা হয়নি। প্রকাশ্যে না হোক ভেতরে ভেতরে হলেও দলের নেতারা সক্রিয় নন। তারা একেকজন এ পর্যন্ত বারবার করে মোবাইল পরিবর্তন করেছেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশ সূত্র জানায়, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষিতে জেলায় মোট ১৯টি মামলা হয়। এসব মামলার এজাহারনামীয় আসামির সংখ্যা ১৩৬২ জন। অজ্ঞাত আসামি ২৩ হাজার ৬৪০ জন। তবে দলীয় নেতাদের দাবি মামলার সংখ্যা আরও অনেক বেশি। এরমধ্যে সদরে ১৭টি, বিজয়নগরে ৩টি, নাসিরনগরে ১টি, সরাইলে ৩টি, আশুগঞ্জে ৬টি, নবীনগরে ৩টি, কসবায় ৪টি, আখাউড়ায় ৬টি এবং বাঞ্ছারামপুর উপজেলায় ৩টিসহ মোট ৪৬টি মামলায় ৪৮৮০ জনকে এজাহারনামীয় আসামি করা হয়েছে। যাদের প্রায় সবাই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী।