Image description

প্রায় চার দশক বাংলাদেশের সরকারপ্রধান ছিলেন নারী। প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্বেও ছিলেন তারা। এর মধ্যে আমৃত্যু বিএনপির নেতৃত্ব দেন বেগম খালেদা জিয়া। আর সাময়িক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে এখনও বহাল শেখ হাসিনা। যদিও তিনি ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।

ঘুরেফিরে এই দুই নেত্রীই দলীয় প্রধান, কখনও সরকার বা বিরোধী দলের আসনে ছিলেন। এই সময়ে এক সেশনে প্রধান বিরোধী দলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেন জাতীয় পার্টির (এরশাদ) সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান বেগম রওশন এরশাদ। তিনিও বার্ধক্যের কারণে নিস্ক্রিয়। টানা দুইবার স্পিকারের দায়িত্ব পালন করা শিরীন শারমিন চৌধুরীও পলাতক। আর সংসদ উপনেতার দায়িত্বে থাকা অবস্থায় মারা যান সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী ও মতিয়া চৌধুরী।

তাদের ছাড়াও জাতীয় সংসদের ভেতরে-বাইরে একাধিক নারী নেত্রীর অবস্থান ছিল উচ্চকিত। যারা সংসদে আইন প্রণয়ের পাশাপাশি সমসাময়িক নানা বিষয়ে যুক্তিগ্রাহ্য বক্তব্য রাখতেন। তাদের দরাজ কণ্ঠে কখনও কখনও কেঁপে উঠতো অধিবেশন কক্ষ। আবার রাজপথের উত্তাল সময়েও ছিলেন সামনের সারিতে। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে সরকার ও প্রধান বিরোধী দলে ফিরেছে পুরুষ নেতৃত্ব।

নির্বাচনে দুই-একজন বাদে তেমন আলোচিত নারী নেতৃত্ব নির্বাচিত হননি। আবার রাজপথেও গ্রহণযোগ্য নারী নেতৃত্ব নেই। বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনে প্রধান দলগুলো নারীদের আনুপাতিক হারে মনোনয়ন দেয়নি। আর যারা সংসদে গেছেন, সে সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য নয়। নেত্রীদের মধ্যে বেশিরভাগই আসেন বাবা বা স্বামীর পরিচয়ে। সংরক্ষিত আসনেও তাদের আধিক্য। এ কারণে রাজপথ থেকে শক্তিশালী নেতৃত্ব উঠে আসছে না। এক্ষেত্রে তৃণমূলে নজর দিতে হবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় নেত্রী ও বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি লাকি আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বর্তমানে বাংলাদেশে নারী নেতৃত্ব কমে যাওয়ার পেছনে নারী বিদ্বেষের বিস্তার, উগ্র দক্ষিণপন্থি শক্তির আস্ফালন, পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর প্রভাব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নারীর সীমিত উপস্থিতির পরিস্থিতি দায়ী। এছাড়া সামগ্রিক নিরাপত্তাহীনতা নারীদের জনপরিসরে অংশগ্রহণ নিরুৎসাহিত করছে। সংগঠনের অভ্যন্তরেও পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা বিদ্যমান, যা নারীদের নেতৃত্বে উঠে আসার পথ সংকুচিত করে।’’

 

তবুও প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে বাংলাদেশের লড়াকু নারীরা সব সময় অগ্রভাগে থেকেছে। তাই রাজনৈতিক দলগুলোতে নারীর এজেন্ডাকে গুরুত্বের সঙ্গে সামনে আনা, নেতৃত্বে এগিয়ে আনা এবং কাঠামোগত বৈষম্য দূর করা এখন সময়ের দাবি।’’

জাতীয় সংসদে নেই নারীর উচ্চকণ্ঠ

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান তিনটি দলের নেতৃত্বেই রয়েছেন পুরুষ। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির নেতৃত্বে তারেক রহমান, প্রধান বিরোধী দল জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান ও তরুণদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। এই তিন দল থেকেও সংসদে তেমন নারী নেতৃত্ব উঠে আসেনি।

নির্বাচনে বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছে ১০ নারীকে। তবে এর মধ্যে জয়ী হয়েছেন মাত্র ৬ জন। এরা হলেন— আফরোজা খান রিতা (মানিকগঞ্জ-৩), ইশরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো (ঝালকাঠি-২), তাহসিনা রুশদীর লুনা (সিলেট-২), শামা ওবায়েদ (ফরিদপুর-২), নায়ার ইউসুফ কামাল (ফরিদপুর-৩) এবং ফারজানা শারমিন পুতুল (নাটোর-১)। তবে দলের মনোনয়ন না পেলেও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হয়েছেন দলটির বহিষ্কৃত নেত্রী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। এর বাইরে আর কোনও নারী নেত্রী বিজয়ী হননি।

আর প্রধান বিরোধী দল জামায়াতসহ ধর্মভিত্তিক দলগুলো নারীদের মনোনয়ন দেয়নি। অপরদিকে ৩০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৩টি আসনে নারীদের মনোনয়ন দিলেও তাদের কেউ বিজয়ী হননি। এ কারণে সংসদের তাদেরও নারী প্রতিনিধিত্ব নেই।

আর বিএনপি থেকে বিজয়ী নারী নেত্রীদেরও বেশিরভাগই নেত্রীই হয় স্বামী না হয় বাবার পরিচয়ে রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান করে নিয়েছেন।

আর ২০১৮ সালের নির্বাচনে আনুপাতিক হারে পাওয়া একমাত্র সংরক্ষিত এমপি ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা তখন সংসদ কাঁপালেও এবার তিনি দলে নেই। স্বতন্ত্র এমপি হিসেবে এখনও নিজের শ্রেষ্ঠত্ব দেখাতে পারেননি।

রাজপথেও পূরণ হয়নি শূন্যতা

অতীতে রাজনৈতিক দলের নারী নেত্রীদের বেশিরভাগই উঠে এসেছেন রাজপথ থেকে। নানা চরাই-উতরাই ও পুলিশের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তারা। মুখোমুখি হয়েছেন শারীরিক নির্যাতন ও জেল-জুলুমের। কিন্তু তারপরও রাজপথই ছিলে তাদের আসল ঠিকানা। বিশেষ করে ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমেই জাতীয় পর্যায়ে উত্থান হয় তাদের। অনেকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেও রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরি করেন।

এর মধ্যে আওয়ামী লীগের অন্যতম পরিচিত মুখ সাজেদা চৌধুরী, মতিয়া চৌধুরী, সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন ও অ্যাডভোকেট তারানা হালিম। আর বিএনপির মধ্যে রাবেয়া চৌধুরী, সেলিমা রহমান, অ্যাডভোকেট সৈয়দা আসিফা আশরাফি পাপিয়া, নিলুফার চৌধুরী মনি ও জাতীয় পার্টির  রাজিয়া ফয়েজ।

জামায়াতের নারী নেত্রীরা অতীতে তেমন দৃশ্যমান না থাকলেও ৫ আগস্টের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তারাও রাজপথে কিছুটা সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন। আর নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি থেকেও কয়েকজন নারী নেত্রী রাজপথ থেকে উঠে এসেছেন। তবে ক্যারিয়ার সম্পন্ন নেত্রী হিসেবে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব এখনও তেমন প্রমাণ করতে পারেননি।

কীভাবে সমাধান দেখছেন নারী নেত্রীরা?

গত কয়েক দশকে সংসদের ভেতরে ও বাইরে নারীদের মধ্য থেকে নতুন করে জাতীয় নেতৃত্ব তেমন তৈরি হয়নি। এর জন্য খোদ নারী নেত্রীরাই জানিয়েছেন নানা প্রতিবন্ধকতার কথা। দলগুলোর উদ্যোগের অভাব, পরিবারতন্ত্র ও সাইবার বুলিংকে দায়ী করেছেন তারা। আবার তৃণমূলে পরিকল্পিত কাজ করলে যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে উঠতে পারে বলে তারা মনে করেন।

এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘ক্যারিয়ারসম্পন্ন নারী নেতৃত্বের অভাব দীর্ঘদিনের। এবারও যারা সংসদে গেছেন, তাদের মধ্যে সত্যিকার অর্থে কতজন আইন প্রণয়নে ভূমিকা রাখতে সক্ষম? কারণ এসব নেত্রীদের বেশিরভাগই এসেছেন পারিবারিক বৃত্ত থেকে। তাই তারা সেভাবে ভূমিকা পালন করতে পারছেন না। অনেক উদীয়মান নেত্রী হারিয়ে গেছেন সাইবার বুলিংয়ের কারণে।’’ তিনি বলেন, ‘‘আমি মনে করি এক্ষেত্রে প্রতিটি রাজনৈতিক দলকেই পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া উচিত। ইতোমধ্যে ‘জনতার স্কুল’ নামে আমরা পাইলটিং প্রকল্প গ্রহণ করেছি। আমরা মনে করি, সংরক্ষিত আসন ও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমেও কিছু নেতৃত্ব তৈরি হতে পারে।’’

জানতে চাইলে মহিলা জামায়াতের নেত্রী প্রকৌশলী মারদিয়া মমতাজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘প্রতিটি রাজনৈতিক দলকেই নারীবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গি লালন করতে হবে। এক্ষেত্রে বাবা-স্বামীর পরিচয়ে নয়— নিজেদের পরিচয়েই অবস্থান তৈরির মানসিকতা লালন করতে হবে নারীদের। জোর দিতে হবে তৃণমূলে।’’ তিনি বলেন, ‘‘জামায়াতের অনেক নারী নেতৃত্ব ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে। নানা সীমাবদ্ধতার কারণে গত নির্বাচনে আমাদের দল সরাসরি নারীদের মনোনয়ন দিতে পারেনি। আশা করি ধীরে ধীরে আমাদের সক্ষমতা তৈরি হবে।’’

জামায়াতের এই নেত্রী বলেন, ‘‘অতীতে সংরক্ষিত আসন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আমাদের নারী প্রতিনিধিত্ব ছিল। এবারও আনুপাতিক হারে আমাদের কিছু এমপি সংসদে যাচ্ছেন। আমরাও তৃণমূলে জোর দিচ্ছি।’’

জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহম্মেদ বলেন, ‘‘আমাদের দল সব সময়ই নারীবান্ধব। আমাদের দলে দীর্ঘ প্রায় চার দশক নেতৃত্ব দিয়েছেন খালেদা জিয়ার মতো মহীয়সী নারী। এবারও একমাত্র আমাদের দল থেকেই কিছু নারী সরাসরি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হয়ে আসছেন। তবে আমরা মনে করি নারীদের আরও সুযোগ দেওয়া উচিত।’’