টানা প্রায় দুই দশক রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে থাকার পর ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয় পেয়ে সরকার গঠন করে অনেকটাই ফুরফুরে মেজাজে বিএনপি। যদিও নানা কারণে দলটির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে দৃশ্যত ভাটা পড়েছে। মূল দল বিএনপির কাউন্সিল নেই ৯ বছরেরও বেশি সময় ধরে। প্রায় সব অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের কমিটির মেয়াদও শেষ। বিএনপি এবং এর কয়েকটি সংগঠনের শীর্ষ নেতারা সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী হয়েছেন। সংগঠনের পেছনে তাদের সময় দেওয়ার ফুরসত খুব একটা হচ্ছে না। ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন সরকার পরিচালনায়। এতে দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রমে তাদের সময় ও মনোযোগ কমে গেছে।
সব মিলিয়ে বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা দেখা দেওয়ার পাশাপাশি নতুন নেতৃত্ব তৈরির পথও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এতে পদপ্রত্যাশী এবং ‘পদবঞ্চিত’ নেতাকর্মীদের মাঝে হতাশা বিরাজ করছে। নেতাদের অনেকেই এবারের ঈদে গ্রামেও যাননি।
কেননা, বেশিরভাগ সংগঠনেরই কার্যকর কমিটি নেই বলে জানা গেছে। এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দ্রুত সংগঠন না গোছালে সাংগঠনিক সংকটে পড়বে বিএনপি।
বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা বলছেন, আন্দোলন-সংগ্রামের প্রাণকেন্দ্র নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয় সবসময় থাকত কোলাহলপূর্ণ। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নেতাকর্মীদের আনাগোনা, সংবাদ সম্মেলন, মিছিলের প্রস্তুতি ও দলীয় কৌশল নির্ধারণে সরগরম থাকত পুরো এলাকা; কিন্তু সেই চিত্র এখন আর সচরাচর দেখা যায় না। বিএনপি এককভাবে সরকার গঠনের পর সেই চিত্র বদলে গেছে। এখন অনেক সময়ই কেন্দ্রীয় কার্যালয় তুলনামূলক শান্ত ও ফাঁকা দেখা যায়। শুধু তাই নয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস জয় ও সরকার গঠনের পর বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চলছে ধীরগতিতে। এমনকি নির্বাচনের পর জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত সাংগঠনিক কর্মসূচিও আগের তুলনায় কমে গেছে।
জানা যায়, ৯ বছরেও হয়নি বিএনপির কেন্দ্রীয় সম্মেলন। সর্বশেষ ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল হয়েছিল ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। তা ছাড়া বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামের প্রধান রসদ জোগানদাতা ২টি সহযোগী ও ৯টি অঙ্গসংগঠনের সাংগঠনিক অবস্থা যেন বেহাল। ছাত্রদলের কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। ৬ সদস্যের আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি দিয়ে দুই বছর ধরে চলছে যুবদল। জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কমিটি নেই প্রায় ১৩ বছর ধরে। গ্রুপিং-কোন্দলে বিপর্যস্ত জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস)। দেড় বছরের বেশি সময় কেন্দ্রীয় কমিটি নেই জাতীয়তাবাদী মৎস্যজীবী দলের। মেয়াদহীন কমিটি দিয়ে চলছে জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল, মহিলা দল, তাঁতী দল এবং কৃষক দল। এসব গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনের কার্যকর কমিটি না থাকায় অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সাংগঠনিক স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। এসব সংগঠনের পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা বলছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী দুই বছরের বেশি সময়েও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলো গুছিয়ে আনতে না পারা বিএনপির জন্য খুবই নেতিবাচক দিক। এরই মধ্যে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে কোন্দল গ্রুপিং দৃশ্যমান হয়েছে। দ্রুত অঙ্গসংগঠনগুলোর কমিটি হালনাগাদ না করলে কোনো বিরূপ প্রভাব তৈরি হলে এর দায় কে নেবে? তবে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ নেতারা বলছেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সব খবর রাখছেন। তিনি যখন ভালো মনে করবেন তখন তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন। কমিটি পূর্ণাঙ্গ থাক না থাক, কর্মকাণ্ডে কোনো প্রভাব পড়বে না। এবার যেসব নেতা এমপি-মন্ত্রী হয়েছেন তাদের আগামীতে অঙ্গসংগঠনের পদে রাখা হবে না। বরং নতুন মুখ দিয়ে কমিটি গঠন করা হবে বলে জানা গেছে।
আরও জানা যায়, বিগত দিনে বারবার উদ্যোগ নিয়েও দলের কেন্দ্রীয় কাউন্সিল এবং অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলো পুনর্গঠন শেষ করতে পারেনি বিএনপি। ফলে জুলাই গণভ্যুত্থানের পর বেশিরভাগ সংগঠনের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। যদিও চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর জাতীয়তাবাদী যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের যৌথ উদ্যোগে দেশজুড়ে তারুণ্যের সমাবেশ হয়েছে। তৃণমূলে কর্মিসভা ও উঠান বৈঠকও করা হয়েছে। সর্বশেষ ডাকসু, জাকসু, চাকসু ও রাকসু নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে ছাত্রদল; কিন্তু ক্যাম্পাসভিত্তিক কোনো কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারছে না সংগঠনটি। এতে করে ছাত্রদলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। মূলত ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পুরোদমে দল পুনর্গঠন শুরু করে বিএনপি।
দলীয় কর্মকাণ্ড প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কালবেলাকে বলেন, বিএনপির কাউন্সিল এই বছরের মধ্যে শিগগির হবে। তবে এখনো আমরা সময় নির্ধারণ করিনি। বিএনপি ও সরকার এক হয়ে গেছে এবং দলের কার্যক্রম কবে নাগাদ শুরু হবে এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, দলের কার্যক্রম তো ছোটখাটোভাবে চলেছে। একমাসে সরকার গঠন করতে তো সময় লেগেছে। দলের লোক বেশিরভাগই সরকারে চলে গেছেন। সেই জায়গাগুলোতে সময় লাগবে। এটা বিচ্ছিন্ন ব্যাপার না। এটা আলাদা করে দেখা যাবে না। সরকার তার কাজ করবে, দল তার কাজ করবে। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী একেবারে নতুন; কিন্তু তার যে গতি দেখছি তাতে আমি অত্যন্ত আশাবাদী। তিনি ছুটছেন। তার মধ্যে প্রচণ্ড রকমের কর্মস্পৃহা কাজ করছে। তিনি আরও বলেন, কেউ দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি। সবাইকে হয় আপনার রাজনৈতিক দলের সঙ্গে, সরকারের সঙ্গে, জনগণের সঙ্গে আমরা সম্পৃক্ত করব—এ ব্যাপারে আপনারা নিশ্চিত থাকেন।
উল্লেখ্য যে, বিএনপির ৯টি অঙ্গসংগঠন হচ্ছে—জাতীয়তাবাদী যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মুক্তিযোদ্ধা দল, কৃষক দল, মৎস্যজীবী দল, তাঁতী দল, ওলামা দল, জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) ও মহিলা দল। সহযোগী সংগঠন দুটি হলো জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল। এসব সংগঠনের বেশিরভাগের কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ। তন্মধ্যে প্রায় দুই বছর ধরে ছয় সদস্যের আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি দিয়ে চলছে যুবদল। দীর্ঘ সময়েও জেলা শাখা কমিটি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কমিটি হালনাগাদ শেষ করতে না পারায় অনেক ত্যাগী ও যোগ্য নেতাকর্মী দলীয় কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছেন। কেউ কেউ দীর্ঘদিন পর অঙ্গসংগঠনে পদ পেয়ে নামকাওয়াস্তে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে দায় সারছেন। তবে ওলামা দল নতুন কমিটি দিয়ে চলছে।
এদিকে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেজগাঁও কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠকে দলের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি করতে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর পুনর্গঠন কার্যক্রম দ্রুত শুরু করার নির্দেশনা দেন। তবে নির্বাচনের পর অঙ্গ সংগঠনের শীর্ষ পদ পেতে আগ্রহীদের দৌড়ঝাঁপ বেড়েছে। পদপ্রত্যাশীরা এরই মধ্যে লবিং শুরু করেছেন এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। অনেকে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নিজেদের ত্যাগ-তিতিক্ষার কথাও তুলে ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রচার চালাচ্ছেন।
ছাত্রলের কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা
বিএনপির আন্দোলনের অন্যতম চালিকাশক্তি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। ২০২৪ সালের ১ মার্চ রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সভাপতি ও নাসির উদ্দীন নাসিরকে সাধারণ সম্পাদক করে ৭ সদস্যের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়। এর পর ১৫ জুন ২৬০ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির পূর্ণাঙ্গ (আংশিক) প্রকাশ করা হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী ছাত্র রাজনীতির প্রতি দেশবাসীর যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, সেটি পুরোপুরি অর্জন করতে পারেনি সংগঠনটি। কেননা, চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের মূল নেতৃত্ব দিয়েছিল বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীরা। তাদের নেতৃত্বেই দেশের আপামর জনসাধারণ আন্দোলনে অংশ নিয়ে শেখ হাসিনার পতন ঘটাতে পেরেছিল। কিন্তু অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ছাত্রদল বেশকিছু ইতিবাচক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করলেও অতিসম্প্রতি ছাত্রদলের কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের পর ছাত্রদলের কার্যক্রম আরও মন্থর হয়েছে বলে জানা যায়। এ অবস্থায় গত বছরের ১৯ অক্টোবর থেকে কমিটি আরও বর্ধিত করার দাবিতে কর্মসূচি পালন করেছেন পদবঞ্চিতরা। তারা জানান, প্রথমদিকে বলা হয়েছিল যে, ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি খুবই ছোট আকারের হবে। এখন দুই বছর তাদের অসংখ্যবার আশ্বস্ত করেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা হয়নি। পদ না পেয়ে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হয়েছেন তারা। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে জেল-জুলুম হামলা-মামলার শিকার হলেও এখন দলীয় পরিচয়হীনতায় ভুগছেন তারা।
জানতে চাইলে ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব কালবেলাকে বলেন, আমরা ছাত্রদল অতীতের মতোই বিএনপির ভ্যানগার্ড হিসেবে মাঠে রয়েছি। সংগঠনের প্রয়োজনে ছাত্রদলে নতুনভাবে পদ দেওয়ার বিষয়টি সাংগঠনিক অভিভাবক তারেক রহমান দেখবেন। প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ক্যাম্পাসভিত্তিক আমাদের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু আছে।
যুবদল চলছে আংশিক কমিটি দিয়ে
জানা গেছে, আংশিক কমিটি দিয়েই চলছে যুবদল। ২০২৪ সালের ৯ জুলাই যুবদলের ৬ সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় (আংশিক) কমিটির সভাপতি হন আব্দুল মোনায়েম মুন্না এবং সাধারণ সম্পাদক হন নুরুল ইসলাম নয়ন। আংশিক কমিটির অন্যরা হলেন—সিনিয়র সহসভাপতি রেজাউল করিম পল, ১ নং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বিল্লাল হোসেন তারেক, সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুজ্জামান জুয়েল ও দপ্তর সম্পাদক নুরুল ইসলাম সোহেল। পরবর্তী সময়ে যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণার কথা থাকলেও আজ অবধি তা হয়নি। ফলে পদবঞ্চিতের সংখ্যা দীর্ঘ হয়েছে। সেইসঙ্গে ৫ আগস্টের পর যুবদলের বেশকিছু নেতার বিরুদ্ধে প্রভাব বিস্তার ও দখল-চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে সাধারণ সম্পাদক ভোলা-৪ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
অবশ্য যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদপ্রত্যাশীরা বলছেন, পূর্ণাঙ্গ কমিটি না দেওয়াটা চরম লজ্জাজনক। দলের নীতিনির্ধারকদের এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। তা না হলে সাংগঠনিকভাবে যুবদল আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কেননা, প্রায় ২ বছর ধরে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অনেকের অবদান যেমন রয়েছে, তেমনি নানাভাবে অনেকেই ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ বিষয়ে যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বিল্লাল হোসেন তারেক বলেন, কমিটি পূর্ণাঙ্গ না হলেও যুবদলের সব কর্মকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে; কিন্তু কী কারণে কমিটি পূর্ণাঙ্গ হচ্ছে না তা জানা নেই।
মেয়াদোত্তীর্ণ স্বেচ্ছাসেবক দল
জানা যায়, ২০২২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর এসএম জিলানীকে সভাপতি ও রাজিব আহসানকে সাধারণ সম্পাদক করে স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় (আংশিক) কমিটি হয়। পরে ২৫১ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি হলেও এখনও ৩৭টি পদ শূন্য। এর মধ্যেই মেয়াদ শেষ হয়েছে স্বেচ্ছাসেবক দলের। তবে স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এসএম জিলানী গোপালগঞ্জ-৩ এবং সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান বরিশাল-৪ আসনে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। সাধারণ সম্পাদক এখন সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রী। সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ ঝিনাইদহ-৪ আসনে স্বতন্ত্র সংসদ নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছেন। স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এসএম জিলানী বলেন, আমরা আমাদের কাজ করছি। নতুন কমিটি করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
মেয়াদহীন কমিটি দিয়ে চলছে মহিলা দল
বিএনপির অঙ্গসংগঠনগুলোর অন্যতম হচ্ছে জাতীয়তাবাদী মহিলা দল। ‘চেতনায় নারী, বিপ্লবে নারী, গণতন্ত্র ফেরাতে আমরাই পারি’ এ স্লোগান ধারণ করে ১৯৭৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় সংগঠনটি। দেশের নারীদের অধিকার আদায় ও বিভিন্ন দু:সময়ে এ সংগঠনের ভূমিকাও ছিল প্রশংসনীয়। ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের সহধর্মিণী আফরোজা আব্বাসকে সভাপতি ও সুলতানা আহমেদকে সাধারণ সম্পাদক করে পাঁচ সদস্যের মহিলা দলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর আর কাউন্সিল করতে পারেনি। ২০১৯ সালের ৪ এপ্রিল সংগঠনটির ২৬৫ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়, যা বর্তমানে মেয়াদোত্তীর্ণ। এরপরও বিভিন্ন জেলা শাখা কমিটি গঠন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে ৭৭টি সাংগঠনিক জেলা শাখার মধ্যে প্রায় সবকটিই নতুনভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ না থাকায় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছে।
মহিলা দলের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেত্রী আলাপকালে জানান, সাত বছর আগে মহিলা দলের কেন্দ্রীয় কমিটি হয়েছে। সবাই এখন নতুন কমিটি চায়। দীর্ঘদিন ধরে যারা কষ্ট করে করে দলীয় কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছে তারাও চাচ্ছে একটা পদ ও পরিবর্তন। কিন্তু শীর্ষ নেত্রীদের রূঢ় আচরণে নতুনরা ক্ষুব্ধ। তারা ছাত্রদল করা মেয়েদের ভালোভাবে নিতে পারেন না। নন পলিটিক্যাল ব্যক্তির মতো আচরণ করেন। যে কারণে কেন্দ্রীয় মহিলা দল এখন ঘরে বসে গেছে। অবশ্য মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ কালবেলাকে বলেন, বিএনপির সঙ্গে মহিলা দলও মাঠে আছে। অনেকের মনে পদ নিয়ে সামান্য মান-অভিমান থাকায় কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে। এর মানে আমরা ঘরে ঢুকে যাইনি। সবার সঙ্গেই ভালোভাবে যোগাযোগ হয়। কেন্দ্রীয় কমিটি মেয়াদহীন হলেও এটি বিএনপির হাইকমান্ড দেখবেন বলে তিনি জানান।
জাসাসে হযবরল
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) তাদের ঐতিহ্য হারাচ্ছে। গত ১৬ বছরে জাসাসের কর্মকাণ্ড নেই বললেই চলে। ২০২১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ড. মামুন আহমেদ ও হেলাল খান নেতৃত্বাধীন কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়। এরপর যেই হেলাল খানকে নিয়ে বেশি অভিযোগ তাকে আহ্বায়ক ও জাকির হোসেন রোকনকে সদস্য সচিব করে ২০২১ সালের ৬ নভেম্বর ৭১ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা হয়। তবে জাসাসের নতুন কমিটি গঠনের পর ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। নেতাদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। অযোগ্য ও নিষ্ক্রিয়দের দিয়ে কমিটি করা হয়েছে দাবি করে তা বিলুপ্ত চেয়ে বিএনপির তকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে চিঠি দেয় বিক্ষুব্ধ একটি গ্রুপ। জাসাস সূত্র জানায়, আগের কমিটির সাধারণ সম্পাদক হেলাল খানের নিষ্ক্রিয়তার কারণে ওই কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। বছরের ১১ মাসই তিনি আমেরিকায় অবস্থান করেন। আর সদস্য সচিবের সাংগঠনিক দক্ষতা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। জাসাসের কমিটিও মেয়াদহীন।
শ্রমিক দল চলছে খুঁড়িয়ে
১৯৭৯ সালের ৩ মে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল। দীর্ঘদিন ধরে কমিটি না হওয়ায় সংগঠনটি নাজুক হয়ে পড়েছে। সর্বশেষ ২০১৪ সালের ১৯ ও ২০ এপ্রিল জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের জাতীয় কাউন্সিল হয়। আনোয়ার হোসাইন ও নূরুল ইসলাম খান নাসিম নেতৃত্বাধীন শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটি বর্তমানে মেয়াদোত্তীর্ণ। তা ছাড়া সেক্রেটারি নাসিম বহুদিন নিষ্ক্রিয় ও অসুস্থ। দীর্ঘদিনেও নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি না হওয়ায় কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। শ্রমিক দলের কার্যক্রম সমন্বয় করছেন প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস।
মুক্তিযোদ্ধা দল
বিএনপির অন্যতম অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল। ১৯৯২ সালের ২৫ আগস্ট এ সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হয়। মুক্তিযোদ্ধা দলের সর্বশেষ কাউন্সিল হয় ২০১৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর। ১৯১ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন ইশতিয়াজ আজিজ উলফাৎ ও সাদেক খান। এ সংগঠনেরও মেয়াদোত্তীর্ণ। মুক্তিযোদ্ধা দলের সাধারণ সম্পাদক সাদেক আহমেদ খান কালবেলাকে বলেন, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী আমাদের মেয়াদ নেই। নানা কারণেই সম্মেলন হয়নি। তবে কাউন্সিলের চিন্তা আছে।
তাঁতী দলের কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ
২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল আবুল কালাম আজাদকে আহ্বায়ক ও মো. মজিবুর রহমানকে সদস্য সচিব ১২৮ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়, যা মেয়াদোত্তীর্ণ।
কমিটি নেই মৎস্যজীবী দলের
২০১৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম মাহতাবকে আহ্বায়ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক নেতা আব্দুর রহিমকে সদস্য সচিব করে ১৫৪ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট রাতে মৎস্যজীবী দলের আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম মারা যান। একপর্যায়ে ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর মৎস্যজীবী দলের কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়। সংগঠনটির সাবেক সদস্য সচিব আবদুর রহিম কালবেলাকে বলেন, বিগত ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনে সম্মুখসারির যোদ্ধা হিসেবে মৎস্যজীবী দল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবরের পর হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে অকুতোভয় ভূমিকা রেখেছে। দুজন নিহত হওয়া ছাড়াও এ সংগঠনের অসংখ্য নেতাকর্মী আহত এবং হামলা, মামলা ও জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন। স্বৈরাচার পতনের পর প্রায় দেড় বছর কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি না থাকা সত্ত্বেও মৎস্যজীবী দল অবিচ্ছিন্নভাবে বিএনপি ঘোষিত সব কর্মসূচিতে সফলভাবে অংশগ্রহণ করে আসছে। এ পর্যায়ে মৎস্যজীবী দলের সারা দেশের সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল ও বেগবান করতে এই সংগঠনের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি গঠন সময়ের দাবি।
কৃষক দল
২০২১ সালের ৭ ডিসেম্বর হাসান জাফির তুহিনকে সভাপতি ও ছাত্রদলের সাবেক নেতা শহীদুল ইসলাম বাবুলকে সাধারণ সম্পাদক করে বিএনপির অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী কৃষকদলের ২৩১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়। কৃষক দলের কমিটিও মেয়াদোত্তীর্ণ। তা ছাড়া দলটির সাধারণ সম্পাদক ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ফরিদপুর-৪ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।