Image description
আমদানি করছে বাড়তি দামে

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দুশ্চিন্তায় পড়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। সরবরাহে ঘাটতি, মজুত কম এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার কারণে দিন দিন এই পরিস্থিতি আরও প্রকট আকার ধারণ করছে। বিশেষ করে ঈদের পর একযোগে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পারছে না সংস্থাটি। মজুত কমে আসায় সব পেট্রোল পাম্পে তেল দিতে পারছে না সংস্থাটি। এ কারণে অনেক পেট্রোল পাম্প বন্ধ থাকছে। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে যে কোনো সময় দেশের বেশির ভাগ পেট্রোল পাম্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। য

দিও বিপিসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে তারা। শুধু তাই নয়, সাপ্লাই চেইন ঠিক রাখতে বিভিন্ন উৎস থেকে তেল কেনার চেষ্টা করছে বিপিসি। আগামী ৬ দিনের মধ্যে তেলবাহী তিনটি জাহাজ আসার কথা রয়েছে। এগুলোতে ৬০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল ও ২২ হাজার মেট্রিক টন জেট ফুয়েল রয়েছে। এছাড়া মঙ্গলবার থেকে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান নুমলীগড় রিফাইনারি লিমিটেড (এনআরএল) থেকে ৫ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল আসা শুরু হয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিমান হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়। পালটাপালটি হামলার জেরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রধান পথ হরমুজ প্রণালি ইরান বন্ধ ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়তে শুরু করে। ফলে ২৭ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম ব্যারেলপ্রতি যেখানে ৮৮ দশমিক ৪৪ ডলার ছিল, তা এখন ২৩৬ দশমিক ৬০ ডলারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। যা প্রায় ১৬৭ শতাংশ বেশি। একই সময়ে অকটেনের দাম ৭৮ দশমিক ৩৯ ডলার থেকে বেড়ে ১৬৩ দশমিক ৭১ ডলারে ওঠে অর্থাৎ প্রায় ১০৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া জেট ফুয়েলের দাম ৮৯ দশমিক ৪০ ডলার থেকে বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ২২৮ দশমিক ৪০ ডলারে পৌঁছেছে, যা প্রায় ১৫৫ শতাংশ বেশি।

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, ২১ মার্চ পর্যন্ত ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল, ফার্নেস অয়েল ও জেট ফুয়েলসহ ৫ ক্যাটাগরির জ্বালানি মজুত ছিল ২ লাখ ৫৯ হাজার ৬৫৯ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের মজুত ১ লাখ ৭৮ হাজার ৫৮৪ মেট্রিক টন। ফার্নেস অয়েল ও জেট ফুয়েল রয়েছে ৮১ হাজার ৭৫ মেট্রিক টন। তবে বিপিসির ২৬টি ডিপোতে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল সংরক্ষণের সক্ষমতা রয়েছে ৮ লাখ ১২ হাজার ৫৬১ মেট্রিক টন। এই হিসাবে গত ২১ মার্চ পর্যন্ত মজুত ছিল সক্ষমতার ২০ শতাংশ। চাহিদা অনুযায়ী এই মজুত দিয়ে ৮ থেকে ১২ দিন চলা যাবে। এরই মধ্যে বুধবার পর্যন্ত চার দিন অতিবাহিত হয়ে গেছে।

এদিকে জ্বালানি ঘাটতি ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে যে কোনো সময় দেশের সব পেট্রোল পাম্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। গত রোববার রাতে সংগঠনটির ফেসবুক পেজ থেকে এ আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে। এরপর থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে তেল সংকট নিয়ে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। এ কারণে তেল সংগ্রহ করতে পেট্রোল পাম্পগুলোতে ভিড় করছেন যানবাহন মালিক ও চালকরা।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্ট, পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মঈন উদ্দিন জানান, চট্টগ্রাম বিভাগে তাদের সমিতির আওতাভুক্ত ১৯৩টি পাম্প রয়েছে। এর মধ্যে ৪৫টিই চট্টগ্রাম জেলায়। সবগুলো পাম্পই খোলা আছে। কোনো পাম্পে তেল বিক্রি বন্ধ নেই। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা, যমুনাসহ সরকারি ও বেসরকারি বিপণন কোম্পানিগুলো চাহিদামতো তেল দিতে পারছে না পাম্প মালিকদের। আগে সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত সব পাম্পে বেচাকেনা চললেও এখন দেখা যাচ্ছে সকালে খোলা থাকলে বিকালে বিক্রি বন্ধ। আবার বিকালে খোলা থাকলে রাতে বন্ধ। অর্থাৎ পর্যাপ্ত তেল না থাকায় যা আছে তা বিক্রি করেই পাম্প বন্ধ করে দিচ্ছেন মালিকরা। বন্দর এলাকায় ডিজেলও মিলছে না চাহিদামতো।

সরবরাহ ঠিক রাখতে বেশি দামে তেল কিনছে বিপিসি : যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্ধিত মূল্যেই তেল কিনছে বিপিসি। সংস্থাটি সিঙ্গাপুরভিত্তিক মূল্য নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠান প্ল্যাটসের সূচক অনুসরণ করে তেল কেনে। তেল জাহাজে তোলার দিনকে ঘিরে আগের দুই দিন, ওইদিন এবং পরের দুই দিনের গড় দাম ধরে প্রতি ব্যারেলের মূল্য নির্ধারণ করা হয়। ফলে স্বল্প সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বড় মূল্যবৃদ্ধি হলে আমদানি ব্যয়ে তার দ্রুত প্রতিফলন ঘটে। বিপিসির হিসাবে, গত ১৬ মার্চ ‘এমটি চাং হাং হং টু’ নামের একটি জাহাজে প্রায় ২ লাখ ৩ হাজার ১২৬ ব্যারেল ডিজেল আমদানি করা হয়। যুদ্ধের আগে এই চালানের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২৬৩ কোটি টাকা। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় একই পরিমাণ তেলের জন্য এখন ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪২৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ একটি জাহাজেই বাড়তি ব্যয় হয়েছে ১৬০ কোটি টাকা। একইরকম পরিস্থিতি হয়েছে ‘এমটি রাফালস সামুরাই’ নামের আরেকটি জাহাজের ক্ষেত্রেও। প্রায় ২ লাখ ব্যারেল ডিজেল নিয়ে ১৪ মার্চ দেশে আসে জাহাজটি। যুদ্ধের আগে এর সম্ভাব্য ব্যয় ছিল ২৬৩ কোটি টাকা। কিন্তু চূড়ান্ত হিসাবে তা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৩৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক জাহাজেই বাড়তি ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৭০ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুদ্ধ শুরুর পর ইতোমধ্যে ৭ জাহাজ ডিজেল ও এক জাহাজ ফার্নেস অয়েল দেশে এসেছে। এর মধ্যে অন্তত ৬টি জাহাজে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে। এই বাড়তি ব্যয়ের পরিমাণ ১ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে।

বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন্স) মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন আজাদ যুগান্তরকে বলেন, এ মাসের (২৬ থেকে ৩১ মার্চ) মধ্যে আরও তিনটি ভ্যাসেল আসার কথা রয়েছে। এর মধ্যে দুটি ডিজেলের এবং একটিতে জেট ফুয়েল ও ডিজেল থাকবে। একটি ভ্যাসেলে ২২ হাজার মেট্রিক টন জেট ফুয়েল ও ৬ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল থাকবে। বাকি দুটি ভ্যাসেলে ২৫-৩০ হাজার মেট্রিক টন করে ডিজেল থাকবে। যার মধ্যে ন্যূনতম ২৭ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল থাকার কথা রয়েছে। এছাড়া ভারতীয় প্রতিষ্ঠান নুমলীগড় রিফাইনারি লিমিটেড (এনআরএল) থেকে ৫ হাজার মেট্রিক টন তেল রিসিভ হচ্ছে। ইতোমধ্যে মঙ্গলবার থেকে পাম্পিং শুরু হয়েছে।