Image description
১৬ লাশ উদ্ধার, নিখোঁজ ৩১

গ্রামের বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে ঢাকায় ফিরছিল মানুষগুলো। তাদের জন্য পদ্মাপাড়ে হঠাৎ নেমে এলো বিভীষিকা। তাদের বহন করা যাত্রীবাহী বাসটি ফেরিতে উঠতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে নদীতে পড়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে এটি পদ্মার ৩০ ফুট গভীরে চলে যায়। গতকাল বুধবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ফেরিঘাট এলাকায় ঘটে এ দুর্ঘটনা।

সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটিতে অন্তত ৫০ জন যাত্রী ছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। তাদের কয়েকজন বের হয়ে সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হলেও বাকিরা নিখোঁজ ছিল।

পদ্মায় তলিয়ে যাওয়া বাসটি দীর্ঘ ৬ ঘণ্টা পর উদ্ধার হয়। রাত সোয়া ১১টার দিকে উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ বাসটি নদীর তলদেশ থেকে ওপরে তুলে আনে। পরে বাসটি থেকে একে একে বের করা হয় নিহত যাত্রীদের মরদেহ। রাত ১টায় এ প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত ১০ নারী, দুই শিশু ও চার পুরুষসহ নিহত মোট ১৬ যাত্রীর মরদেহ উদ্ধারের তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাদের মধ্যে বাসটি টেনে ওপরে তোলার পর ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় ১৪ জনের লাশ। এর আগে সন্ধ্যায় উদ্ধার হয় দুজনের লাশ। এ দুর্ঘটনায় নিখোঁজ থাকা ৩১ জনের মধ্যে আরও অনেকের মৃত্যুর আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন উদ্ধারকারীরা।

রাত সাড়ে ১১টার দিকে পানির নিচে থাকা বাসটির সামনের অংশ তোলার পর ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দলের সদস্যদের একের পর এক মরদেহ বের করতে দেখা গেছে। পানি নিচে থাকা অবস্থায় বাসটির জানালা ও দরজা বন্ধ থাকায় ডুবুরিরা ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি। তাই পুরো বাসটিই টেনে তোলা হয়।

রাজবাড়ী ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক দেওয়ান সোহেল রানা জানান, মরদেহগুলো উদ্ধারের পর পাশের গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালে রাখা হয়।

বাসটি টেনে তোলার সময় ভেতর থেকে স্কুল ব্যাগ, জুতা-স্যান্ডেল, ভ্যানিটি ব্যাগ ও অন্যান্য ব্যাগ ভেসে উঠতে দেখা গেছে।

স্থানীয় ও ঘাট সূত্রে জানা গেছে, কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী সৌহার্দ্য পরিবহনের যাত্রীবাহী বাসটি বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ঘাটের পন্টুনে ওঠার চেষ্টা করছিল। তখন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মায় পড়ে মুহূর্তের মধ্যে তলিয়ে যায়।

দুর্ঘটনার পর ১১ জনকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। যাত্রীদের বেশিরভাগই ঈদের ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরছিলেন বলে জানা গেছে।

সন্ধ্যায় দুজনের মরদেহ উদ্ধার হয়। তারা হলেন রেহেনা বেগম (৬০) ও মর্জিনা বেগম (৫৫)। রেহেনার বাড়ি রাজবাড়ীর ভবানীপুর এলাকায়। মর্জিনা বেগমের বিস্তারিত পরিচয় পাওয়া যায়নি।

গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. মারুফ হোসেন জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার পর তিনজনকে উদ্ধার করে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসা হয়। এর মধ্যে দুজনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। অন্যজনকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসাধীন নুসরাত (২৯) নামে এক নারী পেশায় চিকিৎসক বলে জানা গেছে।

দৌলতদিয়া ঘাট সূত্র জানায়, দুপুর ২টা ১০ মিনিটে কুমারখালী থেকে ছেড়ে আসা সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটিতে ৫৬ জন যাত্রী ছিল, যাদের বেশিরভাগই ঈদের ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরছিলেন। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে দৌলতদিয়া ৩ নং ফেরিঘাটের পন্টুনে ওঠার সময় সেটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। বাসটি যেখানে পড়ে, সেখানে অত্যন্ত গভীর। দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের কাছে থাকা উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার কাজ শুরু করে। পরে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা উদ্ধার কাজে অংশ নেন। বাসটি শনাক্ত করা গেলেও রাত ৮টার দিকে প্রবল বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার কারণে উদ্ধার কাজ কিছু সময়ের জন্য ব্যাহত হয়।

বাসটি নদীতে পড়ে যাওয়ার বেশ কিছু ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। একটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, বাসটি ফেরিতে ওঠার অপেক্ষায় পন্টুনে ছিল। ফেরিটি পন্টুনে যুক্ত ছিল। ফেরিতে যাত্রী ও যানবাহন ছিল। চলন্ত বাসটি মুহূর্তের মধ্যে পন্টুন থেকে নদীতে পড়ে যায়।

আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, বাসটি পড়ার মুহূর্তে পন্টুন ও ফেরিতে থাকা লোকজন সেদিকে দৌড়ে যান। বাসটি ডুবে যাওয়ার পর সেখান থেকে কয়েকজন ভেসে ওঠেন। তখন পন্টুন ও ফেরিতে থাকা লোকজন তাদের দিকে রশি ও লাইফবয়া ফেলেন। তারা সেটি ধরে উঠে আসেন।

সাঁতরে বেঁচে ফেরা এক যাত্রী বলেন, ‘তাকে (স্ত্রী) বলেছিলাম ২৯ মার্চ আমার ডিউটি আছে, তোমরা বাড়ি থাকো, বউ শুনল না। বলল, আব্দুল্লাহর বাপ, তোমারে না দেখলে আমার ভালো লাগে না। আমি বাড়ি থাকমু না। তোমারে না দেখলে আমার অস্থির লাগে। এখন আমার কী হবে, কেমনে বাঁচমু।’

কাঁদতে কাঁদতে তিনি আরও বলেন, ‘স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে কুষ্টিয়া থেকে বাসে করে ঢাকায় ফিরছিলাম। স্ত্রী ও ছেলে আব্দুল্লাহকে নিয়ে বাসে বসে ছিলাম। হঠাৎ বাসটি ফেরিতে ওঠার সময় উল্টে নদীতে পড়ে যায়। আমি সাঁতরে কোনো রকম তীরে উঠে আসি।’

সৌহার্দ্য বাসে থাকা আবদুল আজিজুল নামে এক যাত্রী জানান, তিনি রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার গান্ধীমারা এলাকা থেকে বাসটিতে উঠেছিলেন। নদীতে পড়ে যাওয়ার পর তিনি সাঁতরে উপরে উঠতে পারলেও তার স্ত্রী ও শিশুসন্তান নিখোঁজ রয়েছে।

দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিবহনের ঘাট তত্ত্বাবধায়ক মো. মনির হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, বিকেল ৫টার কিছু পর সৌহার্দ্য পরিবহনের যাত্রীবাহী বাসটি দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ঘাটে আসে। এ সময় ঘাটে থাকা একটি ফেরি যানবাহন নিয়ে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়ার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। অল্পের জন্য তাতে উঠতে না পারায় অন্য ফেরির জন্য বাসটি অপেক্ষা করছিল। সোয়া ৫টার দিকে ওই ঘাটে ‘হাসনা হেনা’ নামে একটি ইউটিলিটি (ছোট) ফেরি এসে সজোরে পন্টুনে আঘাত করে। ফেরির ধাক্কায় নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে বাসটি পদ্মা নদীতে পড়ে যায়।

মনির হোসেন আরও বলেন, ‘চোখের সামনে বাসটি পন্টুন থেকে পদ্মা নদীতে পড়ে গেল, অথচ আমরা কিছুই করতে পারছিলাম না। এ সময় বাসে নারী-শিশুসহ অন্তত ৪০ জন যাত্রী ছিল। এরই মধ্যে কয়েকজন যাত্রী ওপরে উঠতে পারলেও অধিকাংশ যাত্রী বাসের ভেতর আটকা পড়েছে।’

উদ্ধার কাজে অংশ নেওয়া ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা জানান, বাসটি পন্টুনের নিচে চলে যায়। যে কারণে বাসটির দরজা ও জানালা ভেঙে তারা ভেতরে ঢুকতে পারছিলেন না।

রাজবাড়ী ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক সোহেল রানা কালবেলাকে বলেন, দৌলতদিয়া, পাটুরিয়াসহ কয়েকটি টিম ডুবুরিসহ উদ্ধার কার্যক্রম চালায়। ঢাকা ও ফরিদপুর থেকে আরও দুটি ডুবুরি ইউনিট ঘটনাস্থলে আসে।