Image description
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ

মন্ত্রণালয়গুলোর কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি, সংসদে উপস্থাপিত আইন পর্যালোচনাসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো। এরই মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটিসহ পাঁচটি সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। চলতি সংসদ অধিবেশনের শুরুর দিনই গত ১২ মার্চ কমিটিগুলো গঠন করা হয়।

বর্তমানে অন্যান্য সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। যে কোনো সময় বাকি কমিটিগুলোর ঘোষণা আসতে পারে। এসব কমিটির সভাপতি হওয়ার জন্য এরই মধ্যে আগ্রহীরা বিএনপির শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন মন্ত্রী এমনকি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ ও যোগাযোগ করছেন। অবশ্য চলতি অধিবেশনে অন্য কমিটিগুলো গঠনের সম্ভাবনা নেই বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। যেহেতু বেশিরভাগ সংসদ সদস্য নতুন, তাদের পারফরম্যান্স এখনো দৃশ্যমান হয়নি। সেজন্য তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে এখন পর্যন্ত ‘সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটি’, ‘সংসদ কমিটি’, ‘বিশেষ কমিটি’, ‘বিশেষ অধিকার সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি’ এবং ‘বেসরকারি সদস্যদের বিল ও বেসরকারি সদস্যদের সিদ্ধান্ত প্রস্তাব’ সম্পর্কিত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন আগেই স্থগিত করা হয়েছিল। সে কারণে সেদিন ২৯৯ আসনে ভোট হয়। আদালতের আদেশে দুটি আসনের (চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪) ফল স্থগিত রেখেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রার্থিতা নিয়ে মামলার নিষ্পত্তি শেষে সেই ফল ঘোষণা করা হবে। ফলে ১৩ ফেব্রুয়ারি ইসি ২৯৭টি সংসদীয় আসনের ফলের গেজেট প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে বিএনপি ২০৯, জামায়াত ৬৮, এনসিপি ছয়টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুই, ইসলামী আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন ও খেলাফত মজলিস একটি করে আসন পেয়েছে। এ ছাড়া সাতটি আসনে জয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। এবারের নির্বাচনে অংশ নেওয়া ৫০টি দলের মধ্যে বিগত সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টিসহ ৪১টি দল কোনো আসনে জয় পায়নি।

জানা গেছে, এখন সংসদীয় স্থায়ী কমিটি নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা রয়েছে—সংসদে কতগুলো কমিটি থাকে, এসব কমিটির সভাপতি কারা হচ্ছেন, কারা কমিটির সদস্য হতে পারেন, কমিটি কীভাবে গঠিত হয়, বিরোধী দল থেকে কীভাবে সদস্য নেওয়া হয় বা সদস্য কীভাবে বণ্টন করা হয়, কত দিনের মধ্যে কমিটি গঠন করতে হয়, কমিটির কাজ কী, কমিটির সভাপতিরা কী কী

সুযোগ-সুবিধা পান ইত্যাদি।

আরও জানা যায়, কত দিনের মধ্যে কমিটিগুলো গঠন করতে হবে তার জন্য কোনো সময় নির্ধারণ করা নেই। তবে বিভিন্ন কার্যক্রম থাকায় সাধারণত সংসদের প্রথম অধিবেশনের সময়কালে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কমিটিগুলো গঠন করা হয়। যেমন ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং সংসদের প্রথম অধিবেশন বসে ৩০ জানুয়ারি। এরপর ৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কয়েক ধাপে ৫০টি কমিটি গঠন করা হয়, যার মধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ভিত্তিক কমিটি এবং কার্য উপদেষ্টা কমিটিসহ অন্যান্য বিশেষ কমিটি অন্তর্ভুক্ত ছিল।

সংসদীয় বিভিন্ন কমিটির বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে একজনকে সভাপতি করে সংসদ নেতার অনুমতিতে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপের প্রস্তাবে কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী নির্বাচিত ও সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্যদের নিয়ে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠিত হয়। এ ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের কণ্ঠভোটের প্রয়োজন হয়। তবে কয়েকটি কমিটি স্পিকার নিজেই অনুমোদন দেন এবং তা সংসদে ঘোষণা করেন। বিরোধী দল থেকে কমিটিতে কতজন সদস্য রাখা হবে তা নির্ধারণ করা নেই। সাধারণত সংসদ নেতা বিরোধীদলীয় নেতার কাছে জানতে চান যে, তার দলের কোন সদস্যকে কোন কমিটিতে রাখতে চান। এরপর তাদের মতামতের ভিত্তিতে বিভিন্ন কমিটিতে সদস্য হিসেবে রাখা হয়। বিরোধী দল থেকে সাধারণত সদস্য রাখা হয়।

সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, কমিটিতে সভাপতিসহ মোট ১১ জন সদস্য থাকেন। সভাপতিসহ সব সদস্যকে অবশ্যই সংসদ সদস্য হতে হয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী পদাধিকারবলে কমিটির সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন। তবে মন্ত্রী সংসদ সদস্য না হয়ে টেকনোক্র্যাট কোটার হলে তিনি কমিটির সদস্য হতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে সভাপতির বিশেষ আমন্ত্রণে তিনি কমিটির বৈঠকগুলোতে অংশ নেন।

কমিটির সভাপতির মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে জানা যায়, কার্যত সংসদীয় কমিটির সভাপতিদের আলাদা কোনো পদমর্যাদা নেই। সভাপতি হলেও তারা সংসদ সদস্যদের পদমর্যাদা ভোগ করেন। এর বাইরে সংসদীয় কমিটির সভাপতি হিসেবে সংসদ সচিবালয় থেকে সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে সরকারিভাবে একটি অফিস, একজন ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) এবং একজন অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পেয়ে থাকেন। এ ছাড়া অফিসে আপ্যায়ন খরচ বাবদ মাসিক ভাতা হিসেবে ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ পান। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় কমিটির সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোনো সরকারি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হলে সংসদীয় কমিটির সভাপতিকে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সরকারি কর্মসূচিতে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে বিশেষ অতিথির আসনে বসার সুযোগ এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কোনো বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে সংসদীয় কমিটির সভাপতিসহ কমিটির সদস্যদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

কমিটির ক্ষমতার বিষয়ে জানা যায়, সংসদীয় কমিটির কোনো নির্বাহী ক্ষমতা নেই। কমিটি শুধু বিভিন্ন বিষয়ে সুপারিশ, মতামত ও পর্যবেক্ষণ দিতে পারে। তবে তাদের সুপারিশগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। বিশেষ করে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো ওয়াচডগ বডি হিসেবে কাজ করে। এসব কমিটি মন্ত্রণালয়ের কাজকর্মে অনিয়ম ও দুর্নীতি হলে তা তদন্ত করে প্রতিকারের জন্য সংশ্লিষ্টদের কাছে প্রয়োজনীয় সুপারিশ ও পরামর্শ দেয়। এতে নির্বাহী বিভাগ জাতীয় সংসদ বা জনপ্রতিনিধিদের কাছে কিছুটা হলেও জবাবদিহি করতে বাধ্য হয়।

সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদে জাতীয় সংসদের স্থায়ী কমিটি গঠনের বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। সংবিধানে সুনির্দিষ্টভাবে দুটি কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে, তা হলো সরকারি হিসাব কমিটি ও বিশেষ অধিকার কমিটি। এ ছাড়া সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে নির্দিষ্ট অন্যান্য স্থায়ী কমিটি গঠন করার কথাও উল্লেখ রয়েছে। সংবিধান ও কার্যপ্রণালি বিধির নির্দেশনা অনুযায়ী দ্বাদশ সংসদে ৫০টি সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়, যার মধ্যে ১১টি সংসদ সম্পর্কিত এবং ৩৯টি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি ছিল।

সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদের দফা (২)-এ সংসদীয় কমিটির ক্ষমতা ও কার্যাবলির বর্ণনা রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কমিটি সংবিধান ও অন্য কোনো আইন সাপেক্ষে খসড়া বিল ও অন্যান্য আইনগত প্রস্তাব পরীক্ষা করতে পারবে, আইনের বাস্তবায়ন পর্যালোচনা এবং অনুরূপ বাস্তবায়নের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তাব করতে পারবে। জনগুরুত্বসম্পন্ন বলে সংসদ কোনো বিষয় সম্পর্কে কমিটিকে অবহিত করলে সে বিষয়ে কোনো মন্ত্রণালয়ের কার্য বা প্রশাসন সম্পর্কে অনুসন্ধান বা তদন্ত করতে পারবে। কোনো মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধির মাধ্যমে প্রাসঙ্গিক তথ্য সংগ্রহ এবং প্রশ্নের মৌখিক বা লিখিত উত্তর লাভের ব্যবস্থা করতে পারবে। সংসদ কর্তৃক অর্পিত অন্য যে কোনো দায়িত্বও পালন করতে পারবে।

সংসদ সচিবালয় আরও জানায়, সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে প্রতিটি কমিটির কাজের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। বিধিতে বলা হয়েছে, স্থায়ী কমিটির কাজ হবে সংসদ কর্তৃক ওই কমিটিতে পাঠানো যে কোনো বিল বা বিষয় পরীক্ষা করা, কমিটির আওতাধীন মন্ত্রণালয়ের কার্যাবলি পর্যালোচনা করা, মন্ত্রণালয়ের কার্যকলাপ বা অনিয়ম ও গুরুতর অভিযোগ তদন্ত করা এবং কমিটি যথোপযুক্ত মনে করলে ওই কমিটির আওতাধীন যে কোনো বিষয় সম্পর্কে পরীক্ষা ও সুপারিশ করা। কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মাসে অন্তত একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে সংসদ সম্পর্কিত কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠানের ব্যাপারে এভাবে কিছু বলা নেই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ ও বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম মনি বলেন, সংসদ পরিচালনার জন্য যে কমিটিগুলো একেবারেই জরুরি, সেগুলো এরই মধ্যে গঠন করা হয়েছে। বিশেষ করে সংসদ কয়দিন চলবে এবং কীভাবে পরিচালনা হবে, এ সংক্রান্ত কমিটিসহ বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কেননা, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩টি অধ্যাদেশ পাস করা বা না করার বিষয় রয়েছে এবং সেগুলো বিশেষ কমিটিতে যাচাই হচ্ছে। তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ভিত্তিক অন্যান্য সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো সম্ভবত চলতি অধিবেশনে গঠন হওয়ার সম্ভাবনা নেই। পরবর্তী অধিবেশনে এ নিয়ে আলোচনা সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।