সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন ঘিরে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা বেড়েছে। সরকার গঠনের পর এখন সবার নজর এই আসনগুলোর দিকে। মনোনয়ন পাওয়ার আশায় বিএনপির নেত্রীদের অধিকাংশই এখন ঢাকায়। লবিং-তদবিরে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন তারা। জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে তাদের কেউ যাচ্ছেন দলের গুলশান কার্যালয়ে, কেউবা শীর্ষ নেতাদের বাসায়। আবার অনেকে সচিবালয়ে গিয়ে মন্ত্রীদের সঙ্গেও যোগাযোগ করছেন। বিএনপি ছাড়াও দলটির শুভাকাঙ্ক্ষী বলে পরিচিত বিভিন্ন পেশাজীবী নারীরাও তাদের জীবনবৃত্তান্ত পাঠাচ্ছেন এবং বিভিন্ন জায়গায় তদবির করছেন। কবে কোথায় বিএনপির জন্য কাজ করেছেন-সেসব অবদানের কথা তুলে ধরছেন তারা।
জানা যায়, দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা-হামলা ও দমনপীড়নের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে দলের কাছে রাজনৈতিক স্বীকৃতি চাইছেন বিএনপির নেত্রীরা। ঈদের পরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনয়ন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে সময় যত গড়াচ্ছে, তীব্র হচ্ছে প্রতিযোগিতাও। অনেকেই বলছেন, শুধু পরিচয়ের রাজনীতি নয়, মাঠের অবদানও বিবেচনায় আসুক। পরিবারতন্ত্রের বাইরে থেকে উঠে আসা নেত্রীদের যোগ্যতা ও সংগ্রামের যথাযথ মূল্যায়ন হবে-এমনটাও প্রতাশা তাদের।
বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, দলের প্রতি আনুগত্য এবং রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা-এসবই হতে পারে মূল্যায়নের মানদণ্ড। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে দলের হাইকমান্ড থেকে।
সম্প্রতি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান যুগান্তরকে বলেন, সংরক্ষিত নারী আসন নিয়ে দলীয় পর্যায়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। যথাযথ নিয়ম মেনেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসবে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন।
স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য যুগান্তরকে জানান, সংসদের প্রাপ্ত আসনের বিপরীতে ৩৫টি সংরক্ষিত নারী আসন পাবে বিএনপি। নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী বিএনপির দলীয় মনোনয়নপত্র বিতরণ করা হবে। বিএনপিতে অসংখ্য যোগ্য নেত্রী রয়েছেন, তারা দৌড়ঝাঁপ চালিয়ে যাচ্ছেন। সবকিছু বিবেচনা করেই বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্ধারণ করবেন কারা সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ-সদস্য হবেন। তবে এবার তরুণ নেত্রীদের মূল্যায়নের সম্ভাবনা বেড়েছে বলে জানান তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রমজানের মধ্যেও গুলশানে বিএনপির চেয়ারমানের কার্যালয়ে জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে প্রতিদিনই ভিড় করছেন দল ও অঙ্গ সংগঠনের নেত্রীরা। এছাড়া বিএনপির স্থায়ী কমিটিসহ কেন্দ্রীয় নেতা ও সংসদ-সদস্যদের বাসায় ধরনা দিচ্ছেন তারা। মন্ত্রীদের সুপারিশের জন্য সচিবালয়েও গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার করছেন। কেউ আশস্ত হচ্ছেন, কেউবা নিরাশ হয়ে ছুটছেন এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে।
বিএনপি সূত্র জানায়, সরকার গঠনের পর ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দলটির নীতিনির্ধারকরাও সরকারের নানা কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন-পরবর্তী পার্লামেন্টারি বোর্ডের সদস্যরা সংরক্ষিত আসনের ব্যাপারে এখনো বৈঠকে বসতে পারেননি। ফলে সংরক্ষিত আসনে চূড়ান্ত মনোনয়ন কারা পাবেন, কিংবা কোন মানদণ্ডে মনোনয়ন দেওয়া হবে, তা চূড়ান্ত হয়নি। আবার যারা মন্ত্রী বা এমপি হয়েছেন, তাদের পরিবারের কাউকে সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন দেওয়া হবে কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়।
সংবিধান অনুযায়ী, জাতীয় সংসদে ৫০টি নারী আসন সংরক্ষিত রয়েছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, যে দল সাধারণ আসনে যতটি আসন পায়, সেই অনুপাতে সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টন করা হয়। নিয়মানুযায়ী প্রতি ৬টি আসনের বিপরীতে একটি সংরক্ষিত আসন পাওয়া যায়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসনে জয় পেয়েছে। সে হিসাবে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনের মধ্যে ৩৫টি পাবে দলটি। এছাড়া স্বতন্ত্র (বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত) প্রার্থীরা সাতটি আসন পেয়েছেন। ফলে স্বতন্ত্ররাও সংসদে একটি সংরক্ষিত নারী আসন পেতে পারেন। এদিকে সাধারণ নির্বাচনের ফলের গেজেট প্রকাশের ৯০ দিনের মধ্যে সংরক্ষিত আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
জানা যায়, সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের বেশির ভাগই এবার নতুন মুখ। তারা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের হয়ে বিগত ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে ছিলেন। অনেকেই মামলা, হামলা ও জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন। এছাড়া সাবেক সংসদ-সদস্য, ২০১৮ ও সর্বশেষ নির্বাচনে অংশ নেওয়া নারী প্রার্থীরাও আলোচনায় রয়েছেন। একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক অঙ্গন ও পেশাজীবী মহলে পরিচিত অনেকেই সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন পেতে দৌড়ঝাঁপ করছেন।
এবার সংরক্ষিত নারী আসনে আলোচনায় রয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেত্রী শিরিন সুলতানা, মহিলা দলের বর্তমান সভাপতি আফরোজা আব্বাস, সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ, মহিলা দলের সিনিয়র যুগ্মসম্পাদক হেলেন জেরিন খান, সহসভাপতি নাজমুন নাহার বেবী, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেত্রী শাম্মী আক্তার, সাবেক এমপি নিলোফার চৌধুরী মনি, সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া, রাশেদা বেগম হীরা, রেহেনা আক্তার রানু, ইয়াসমিন আরা হক, জাহান পান্না, বিলকিস ইসলাম ও ফরিদা ইয়াসমিন।
এছাড়া ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে পরাজিত ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াংকা, সাবিরা সুলতানা ও সানজিদা ইসলাম তুলিও আছেন আলোচনার তালিকায়। কণ্ঠশিল্পী বেবী নাজনীন, রিজিয়া পারভীন ও কনকচাঁপা এবং ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের স্ত্রী হাসনা জসিমউদ্দিন মওদুদ, প্রয়াত মহাসচিব আবদুস সালাম তালুকদারের মেয়ে ব্যারিস্টার সালিমা বেগম অরুনি, ড. আব্দুল মঈন খানের মেয়ে মাহরীন খান, বিএনপির সাবেক হুইপ সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীর মেয়ে সামিরা তানজিনা চৌধুরীর নামও আলোচনায় আছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের স্ত্রী হাসিনা আহমদ ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সহধর্মিণী রুমানা আহমেদ, ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নিপুণ রায় চৌধুরী, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম-আহ্বায়ক ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি, বিএনপি নেত্রী অপর্ণা রায়, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি মরহুম শফিউল বারী বাবুর স্ত্রী বীথিকা বিনতে হুসাইন সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে আছেন।
এছাড়া অ্যাডভোকেট আরিফা সুলতানা রুমা, মহিলা দলনেত্রী শাহানা আক্তার সানু, অ্যাডভোকেট শাহিনুর বেগম সাগর, মহিলা দলের সহ-স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আসমা আজিজ, নেওয়াজ হালিমা আরলী, রাবেয়া আলম, মহিলা দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক শাহিনুর নার্গিস, ময়মনসিংহ জেলা মহিলা দলের সভাপতি তানজিন চৌধুরী লিলি, ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী নাদিয়া পাঠান পাপন, শওকত আরা ঊর্মি, বিএনপির সহ-আন্তর্জাতিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফাহিমা নাসরিন মুন্নি, ময়মনসিংহ জেলা মহিলা দলের সহসভাপতি ফাহসিনা হক লিরা, সাবেক সহসভাপতি সুলতানা জেসমিন (জুঁই), মহিলা দলের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্য সচিব নাসিমা আক্তার (কেয়া), সাবেক সাধারণ সম্পাদিকা শামসুন্নাহার ভূঁইয়া, ইডেন কলেজ ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী সেলিনা সুলতানা নিশিতা, বর্তমান আহ্বায়ক রেহানা আক্তার শিরিন, খিলগাঁও মডেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক রোকেয়া চৌধুরী, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রোখসানা খানম, আয়েশা সিদ্দিকা, বিএনপির সংসদ-সদস্য রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর সহধর্মিণী সাবিনা ইয়াসমিন, লুৎফুজ্জামান বাবরের স্ত্রী তাহমিনা জামান শ্রাবণী, বিএনপির ক্ষুদ্র ঋণবিষয়ক সম্পাদক এমএ কাইয়ুমের সহধর্মিণী শামীম আরা বেগম, ঝিনাইদহের মাহবুবা রহমান শিখা এবং প্রয়াত নাসির উদ্দিন পিন্টুর স্ত্রী নাসিমা আক্তার কল্পনার নামও আছে আলোচনায়।
এছাড়া আলোচনায় আছেন সাবেক ভিপি অধ্যাপক নাজমা সুলতানা ঝংকার, মহিলা দলের কেন্দ্রীয় যুগ্মসম্পাদক ফাতেমা বাদশা, চট্টগ্রাম মহানগর মহিলা দলের সভাপতি মনোয়ারা বেগম মনি ও সাধারণ সম্পাদক জেলী চৌধুরী, উত্তর জেলা মহিলা দলের সভাপতি মেহেরুন নেছা নার্গিস, দক্ষিণ জেলা মহিলা দলের সভাপতি জান্নাতুল নাঈম রিকু, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) সাবেক কাউন্সিলর জেসমিনা খানম, জাসাসের কেন্দ্রীয় নেত্রী নাজমা সাঈদ এবং ফটিকছড়ির গুম হওয়া বিএনপি নেতা শহিদুল আলম সিরাজ চেয়ারম্যানের সহধর্মিণী সুলতানা পারভীন ও দেওয়ান মাহমুদা আক্তার (লিটা)।
সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া যুগান্তরকে বলেন, বিগত সময়ে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছি। অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছি। এখন দল বিবেচনা করবে, সংরক্ষিত আসনের মানদণ্ডে আমি আছি কি না? তবে যারা রাজপাথে ছিলেন, দলের জন্য ত্যাগ আছে; তাদের সংরক্ষিত আসনের জন্য মনোনীত করলে ভালো লাগবে।
অ্যাডভোকেট আরিফা সুলতানা রুমা বলেন, শেখ হাসিনার পুরো আমলে রাজপথে ছিলাম, জেল খেটেছি, এখনো মামলা আছে। কিন্তু দল ছেড়ে যাইনি। দুর্দিনের নেতাকর্মীদের দল যেন সঠিক মূল্যায়ন করে, সেটাই প্রত্যাশা করি।
মহিলা দলের সহ-স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আসমা আজিজ যুগান্তরকে বলেন, ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনে সম্মুখসারিতে ছিলাম। বিস্ফোরকসহ একাধিক মামলার আসামি হয়েছি। দুঃসময়ে যারা দলের জন্য রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামে ছিল, আমরা তাদেরই জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনে দেখতে চাই। তিনি বলেন, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের কারও সঙ্গে সংরক্ষিত আসনের ব্যাপারে আলোচনা হয়নি। তবে সাংগঠনিক, রাজনৈতিক ও মানবিক গুণসম্পন্ন উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিদের প্রাধান্য দেওয়া উচিত। বিশেষ করে যারা জনগণের কথা চিন্তা করে, সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারবে, জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে, তাদের মূল্যায়ন করলে ভালো হবে।
রেহানা আক্তার শিরিন যুগান্তরকে বলেন, স্কুলজীবন থেকেই রাজনীতি সঙ্গে সম্পৃক্ত। ২০০৭-০৮ সেশনে যখন ইডেন মহিলা কলেজে ভর্তি হই, তখন থেকেই রাজপথে প্রতিটি আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছি। দলের ক্রান্তিকালে রাজপথে সামনের সারিতে থেকে আন্দোলনে অংশ নিয়েছি। বহুবার হামলা-মামলা ও কারাবরণ করেছি। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে ভূমিকা রেখেছি। ২০২১ সালে ১ মার্চ ফ্যাসিস্টের পেটুয়া বাহিনী পুলিশ দ্বারা প্রেস ক্লাবে হামলার শিকার হয়েছি। দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলাম। ২৮ অক্টোবরের পর দীর্ঘদিন রাজপথে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ করেছিলাম। ২০২৪ রাজপথে আন্দোলন সামনের সারিতে থেকে ভূমিকা রেখেছি। এখনো দেশ ও মানুষের জন্য ন্যায়ের পক্ষে সক্রিয় আছি। এবার সংরক্ষিত আসনে আমিও মনোনয়নপ্রত্যাশী।