হাজারো চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে আবেদন নিল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। আবেদন ফি জমা দিলেন অনেকে, পাঠালেন প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও। এরপর অপেক্ষা—কবে হবে লিখিত পরীক্ষা। কিন্তু পরীক্ষার দিনক্ষণ জানানো হলো না কাউকে।
অগোচরেই আয়োজন করা হলো লিখিত পরীক্ষা। এরপর হঠাৎই প্রকাশ করা হলো ফলাফল এবং ডাকা হলো মৌখিক পরীক্ষার জন্য।
দেশের সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থার এই প্রতিষ্ঠানটির সাম্প্রতিক নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে এমনই বিস্ময়কর অভিযোগ উঠেছে। কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, নিয়ম মেনে আবেদন করা অসংখ্য প্রার্থীকে লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগই দেওয়া হয়নি। বরং নির্বাচিত কিছু প্রার্থীকে নিয়েই আয়োজন করা হয়েছে লিখিত পরীক্ষা।
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিসাববিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন ইসমাইল হোসেন। সম্প্রতি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখে তিনি সেকশন অফিসার ও সহকারী সিস্টেম অ্যানালিস্ট পদে আবেদন করেন। অনলাইনে আবেদন করার পর বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী সব ডকুমেন্টের সত্যায়িত কপি কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেন।
এরপর শুরু হয় অপেক্ষা। কিন্তু হঠাৎ একদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দেখতে পান, সেই পদের লিখিত পরীক্ষা এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেছে, এমনকি মৌখিক পরীক্ষার তারিখও ঘোষণা করা হয়েছে।
প্রথমে বিষয়টি বিশ্বাস করতে পারেননি তিনি। পরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে ঢুকে নিশ্চিত হন, ফেসবুকে ঘুরে বেড়ানো বিজ্ঞপ্তিটি সত্য।
খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য তাঁকে ডাকা হয়নি। অথচ স্নাতকে তাঁর সিজিপিএ ৩.৯৪ এবং স্নাতকোত্তরে ৩.৮৯।
ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘অনলাইনে আবেদন করেছি, কুরিয়ারে সব ডকুমেন্ট পাঠিয়েছি। কুরিয়ার থেকেও নিশ্চিত করা হয়েছে ডকুমেন্ট পৌঁছেছে। অন্য অনেক জায়গায় দেখেছি পরীক্ষার আগে অ্যাডমিট কার্ড পাঠানো হয়, না পেলে ফোন করে সংগ্রহ করতে বলা হয়। কিন্তু এখানে কোনো ফোন, এসএমএস বা চিঠি কিছুই দেওয়া হয়নি। অথচ পরীক্ষা হয়ে গেছে।’
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোলে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করা মোসাদ্দেক হোসেন মিশু। তিনি এবং তাঁর স্ত্রী দুজনই সেকশন অফিসার পদে আবেদন করেছিলেন।
অনলাইনে আবেদন করার পর একজন আত্মীয়ের মাধ্যমে তাঁদের আবেদনপত্রের হার্ডকপি বিশ্ববিদ্যালয়ে জমাও দেওয়া হয়। কিন্তু এর পরও তাঁদের কাউকেই লিখিত পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়নি। এমন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন আরো অনেক আবেদনকারী। তাঁদের অভিযোগ, সব নিয়ম মেনে আবেদন করলেও পরীক্ষার বিষয়ে কোনো ধরনের নোটিশ পাননি তাঁরা।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখা যায়, গত ৮ জানুয়ারি সহকারী সিস্টেম এনালিস্ট, সেকশন অফিসার, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, উচ্চমান সহকারীসহ মোট ৯টি পদের জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। রেজিস্ট্রার মোল্লা মাহফুজ আল হোসেন স্বাক্ষরিত সেই বিজ্ঞপ্তিতে চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারির মধ্যে অনলাইনে আবেদন করার আহবান জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আবেদনকারীদের অনলাইনে ফরম পূরণ করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টের সত্যায়িত কপি ৯ সেট করে ডাকযোগে, কুরিয়ার সার্ভিসে অথবা হাতে হাতে রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে জমা দিতে বলা হয়।
এ ছাড়া বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছিল, প্রার্থীদের নিয়োগসংক্রান্ত সব পরীক্ষা বা নির্বাচনী বোর্ডের তারিখ ডাকযোগে, কুরিয়ার সার্ভিস, এসএমএস অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে জানানো হবে।
কিন্তু বাস্তবে এর কোনো প্রক্রিয়াই অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ আবেদনকারীদের।
নাজিফা তানজিম নামের এক চাকরিপ্রার্থী বলেন, ‘অনেক টাকা পয়সা খরচ করে আবেদন করেছি। আবেদনপত্র কুরিয়ারে পাঠিয়েছিলাম এবং সেটি গ্রহণও করা হয়েছিল। আমার সিজিপিএ ৩.৫০-এর ওপরে, আমার বান্ধবীর ৩.৮০-এর ওপরে। তার পরও আমাদের কাউকেই পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়নি। বিজ্ঞপ্তিতে তো কোথাও বলা হয়নি যে বাছাই করা হবে।’
আরেক আবেদনকারী মোহাম্মদ মইন উদ্দিন বলেন, ‘সব নিয়ম মেনে আবেদন করেছি এবং অনলাইনে ফিও জমা দিয়েছি। তার পরও আমাকে পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ফোন করলে তারা বলেছে নিয়ম মেনে যাঁরা আবেদন করেছেন তাঁদের ডাকা হয়েছে। কিন্তু আমি কোন নিয়ম মানিনি সেটা তারা বলতে পারেনি।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা টাকা দিয়ে আবেদন করেছি। টাকা নেওয়ার পর শর্টলিস্ট করার সুযোগ থাকার কথা নয়। শর্টলিস্ট সাধারণত তখন করা হয়, যখন আবেদনের সময় কোনো ফি নেওয়া হয় না।’
কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটেও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখা যায়, ৮ জানুয়ারি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর লিখিত পরীক্ষার তারিখসংক্রান্ত কোনো নোটিশ প্রকাশ করা হয়নি।
কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি বিভিন্ন পদের লিখিত পরীক্ষার ফলসংবলিত একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। সেই বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, ২৬ ফেব্রুয়ারি ড্রাইভার পদে এবং ২৭ ফেব্রুয়ারি সেকশন অফিসার, প্রশাসনিক কর্মকর্তাসহ অন্যান্য কয়েকটি পদের লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
অর্থাৎ পরীক্ষার আগে কোনো নোটিশ প্রকাশ না করেই পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে।
লিখিত পরীক্ষার ফলাফল নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। সেকশন অফিসার পদে সাতটি পদের বিপরীতে মৌখিক পরীক্ষার জন্য উত্তীর্ণ করা হয়েছে মাত্র ৯ জনকে। প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে তিনটি পদের বিপরীতে উত্তীর্ণ করা হয়েছে ছয়জনকে।
সাধারণত প্রতি পদের বিপরীতে অন্তত তিনজনকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকার প্রচলন থাকলেও এখানে সেই নিয়মও মানা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
আরেক আবেদনকারী নাহিদা ইসলাম জানান, ‘আমার বিএসসিতে সিজিপিএ ৩.৯৭ এবং এমএসসিতে ৩.৯১। অনলাইনে আবেদন করার পর আমার বাবা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে আবেদনপত্র জমা দিয়ে এসেছিলেন। তবু আমাকে পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়নি।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-উপাচার্য অধ্যাপক মো. লুত্ফর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি এই নিয়োগ বোর্ডের কোথাও ছিলাম না। তাই এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারব না। তবে যতদূর জানি, প্রাথমিক বাছাইয়ের মাধ্যমে নির্দিষ্টসংখ্যক প্রার্থীকে লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।’
যোগাযোগ করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ দাবি করেন, ‘এটি মূলত অভ্যন্তরীণ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছিল। দীর্ঘদিন ধরে মাস্টাররোলে কাজ করা কিছু অভ্যন্তরীণ প্রার্থীর জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হওয়ায় আপাতত নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছে।’ উল্লেখ্য, সহকারী সিস্টেম এনালিস্ট, সেকশন অফিসার ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদের জন্য আবেদন ফি নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০০ টাকা।
এদিকে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে কয়েকজন আবেদনকারী এরই মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ার পুরো বিষয়টি তদন্ত করে স্বচ্ছভাবে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া হোক।