জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ ইস্যুতে উত্তপ্ত হতে পারে জাতীয় সংসদ ও রাজপথ। বিষয়টি নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দল এখন পরস্পরবিরোধী অবস্থানে। সরকারি দল বিএনপি বলছে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সংবিধান বলবৎ থাকাকালীন রাষ্ট্রপতি কোনো আদেশ জারি করতে পারেন না।
ফলে এই পরিষদের বৈধতা নেই। দলটির মতে, এ বিষয়ে সংসদে আলোচনা হতে পারে। অপরদিকে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট বলছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের জন্য গণভোটের মাধ্যমে জনগণ রায় দিয়েছে। আর গণভোট অস্বীকার করলে এবারের নির্বাচন, সরকার, সংসদ-সবই অবৈধ। তাই গণভোটের ফল অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারই বৈধতার একমাত্র পথ বলে তারা মনে করছে। এই জোট বলছে, আজ রোববারের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না করা হলে তারা রাজপথে আন্দোলনে নামবে।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে-আজকের মধ্যে সংস্কার পরিষদের অধিবেশন হচ্ছে না। ফলে অনিবার্যভাবেই রাজপথ উত্তপ্ত হচ্ছে, এটি নিশ্চিত করে বলা যায়। এদিকে সংবিধান সংস্কার পরিষদ কেন অবৈধ হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। বিশ্লেষকরা বলছেন, জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে পুরো বিষয়টি দুঃখজনক এবং এর পরিণতি অমঙ্গলজনক।
প্রসঙ্গত, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ১৩ নভেম্বর জারি করেন রাষ্ট্রপতি। ওই আদেশের ওপর ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। আদেশে বলা হয়, সংসদ অধিবেশন শুরুর ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। এক্ষেত্রে নির্বাচিত সংসদ-সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হবেন। সংসদ নির্বাচনের ফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করতে হবে। সে হিসাবে অধিবেশন ডাকার সময়সীমা আজ রোববার শেষ হচ্ছে। এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ১২ কোটি ৭৭ লাখ। এর মধ্যে গণভোট পড়েছে ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ। এক্ষেত্রে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ জন। ‘না’ ভোট দিয়েছেন ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ জন। অর্থাৎ ৬৮ শতাংশের বেশি ‘হ্যাঁ’ ভোটে আদেশটি অনুমোদিত হয়। তবে নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে অধিবেশন আহ্বান না করা হলে কী হবে, তা আদেশে বলা নেই।
জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ও সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে রাষ্ট্রপতি যে আদেশ দিয়েছেন, সেখানে ক্ষমতাসীন বিএনপির আপত্তি ছিল না। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ের ক্ষেত্রেও সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছিল। নির্বাচনে বিএনপিও ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ক্যাম্পেইন করেছে। এরপর জনগণের ভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়েছে। কিন্তু নির্বাচনের পর তারা মানছে না। এটি দুঃখজনক। গণভোটের রায় না মানার অর্থ হলো জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতাকে অবজ্ঞা করা। এর পরিণতিও অমঙ্গলজনক। তবে বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ এ প্রসঙ্গে শনিবার যুগান্তরকে বলেন, দেশের সংবিধান কীভাবে সংশোধন হবে, তা বিদ্যমান সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে বলা আছে। সেখানে সংবিধান সংস্কার পরিষদ নামে কিছু বলা নেই। তিনি বলেন, সংবিধান বলবৎ থাকাকালীন আরেকটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের কী আইনি ভিত্তি আছে, তা আমার বুঝে আসে না।
এদিকে শনিবার এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জাতীয় সংসদেই সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে আলোচনা এবং সিদ্ধান্ত হবে। এর আগে মঙ্গলবার তিনি বলেছেন, জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে আরোপিত আদেশ একদিনে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এ সময়ে তিনি ১৩ নভেম্বর জারি করা জুলাই সনদের বাস্তবায়ন আদেশের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আদেশটি (জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ) স্ত্রীলিঙ্গ বা পুংলিঙ্গ, তাই তো বুঝি না। সংবিধান কার্যকরের পর আদেশ জারির আর সুযোগ নেই।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ শনিবার যুগান্তরকে বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে বলা আছে, সংসদ নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করতে হবে। সে হিসাবে রোববার (আজ) এই অধিবেশন ডাকার শেষদিন। এ সময়ের মধ্যে পরিষদের অধিবেশন না ডাকলে আন্দোলনে যাবে ১১ দলীয় ঐক্য। এক্ষেত্রে আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি করে ২৮ মার্চ ঐক্যবদ্ধভাবেই রাজপথে নামব আমরা। তিনি বলেন, আমরা স্পষ্ট করে বলছি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকার ব্যবস্থা না নিলে জাতি তাদের ক্ষমা করবে না। বিশেষ করে সংসদনেতাকে (তারেক রহমান) এটির দায়িত্ব নিতে হবে। তার মতে, জুলাই সনদ ও আদেশের পক্ষে গণভোটে জনগণ রায় দিয়েছে। এই জনমত উপেক্ষা করার মানে হলো জনগণকে অবহেলা ও অবজ্ঞা করা। সরকারকে এর দায় নিতে হবে। দায়িত্বশীল বিরোধী দল হিসাবে আমরা জনরায়কে উপেক্ষার প্রতিবাদ করব।
এদিকে জুলাই জাতীয় সনদ, গণভোটের অধ্যাদেশ এবং নবনির্বাচিত সংসদ-সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ নেওয়ার বৈধতা নিয়ে ৩ মার্চ রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। রুলে জানতে চাওয়া হয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংশোধন) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ এবং ১৬ ফেব্রুয়ারি সংসদ সচিবালয় থেকে নবনির্বাচিত সংসদ-সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ নিতে যে চিঠি দেওয়া হয়েছে, তা কেন অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না। একই সঙ্গে গণভোট অধ্যাদেশ কেন বেআইনি ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, সে বিষয়েও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। আইনসচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জাতীয় সংসদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব, নির্বাচন কমিশন এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী গাজী মো. মাহবুব আলম ও চৌধুরী মো. রেদওয়ান ই খোদা এই রিট দায়ের করেন।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ১৩ নভেম্বর আদেশ জারি করেন রাষ্ট্রপতি। এই আদেশের ভিত্তিতে ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটে প্রশ্ন ছিল চারটি। এতে বলা হয়, জুলাই সনদে বর্ণিত পদ্ধতির আলোকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, ন্যায়পাল এবং দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করতে হবে। সংসদ নির্বাচনের ভোটের অনুপাতে (পিআর) গঠন করা হবে সংসদের উচ্চকক্ষ। এছাড়াও ৩০টি সংস্কার প্রস্তাবে রাজনৈতিক দলগুলো একমত ছিল। এগুলো বাস্তবায়নে তারা বাধ্য থাকবে। এর বাইরে অন্যান্য সংস্কার প্রস্তাব দলগুলো তাদের প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করবে। গণ-অভ্যুত্থানের অভিপ্রায়ের ক্ষমতাবলে জারি করা আদেশে বলা হয়েছে, ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে নবনির্বাচিত এমপিদের নিয়ে ১৮০ কার্যদিবস মেয়াদি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে সংসদ অধিবেশন আহ্বানের অনুরূপ পদ্ধতিতে পরিষদের আহ্বান করতে হবে। অর্থাৎ, রাষ্ট্রপতি পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করবেন। নির্বাচিত এমপিদের তিনি যে পদ্ধতিতে শপথ পাঠ করিয়েছেন, একই পদ্ধতিতে তারা পরিষদ সদস্য হিসাবে শপথ নেবেন। বিএনপি বলছে, সংবিধানে পরিষদের বিধান অন্তর্ভুক্ত ছাড়া শপথ সম্ভব নয়। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে জামায়াতের সংসদ-সদস্যরা শপথ নিলেও বিএনপির সদস্যরা নেননি।
সংসদের কার্য-উপদেষ্টা কমিটির বৈঠক : সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে আলোচনা হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। শনিবার জাতীয় সংসদের কার্য-উপদেষ্টা কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন। সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আলোচনা ফ্লোরে (অধিবেশনে) হতে পারে। এখানে না (কার্য-উপদেষ্টা কমিটি)। শপথ না নিলে জামায়াতের রাজপথে নামার ঘোষণার বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, এটা তাদের জিজ্ঞেস করেন। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কার্য-উপদেষ্টা কমিটির প্রথম বৈঠক হয়েছে। সংসদের প্রথম অধিবেশন কতদিন চলবে, কী কী আলোচনা হবে, কী কী আইন উত্থাপন হবে, রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর কত ঘণ্টা আলোচনা হবে-তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে, সিদ্ধান্ত হয়েছে। ১৫ মার্চ (আজ) বেলা ১১টায় মুলতুবি অধিবেশন হবে। এরপর ১৬ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত মুলতুবি থাকবে এবং ২৯ মার্চ থেকে সংসদ আবারও বসবে। এপ্রিলজুড়েই সংসদ অধিবেশন চলবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনার জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছিল বৃহস্পতিবার। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিশেষ কমিটির উদ্দেশ্য হলো মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি গঠনের আগে ঐতিহ্য অনুযায়ী বিশেষ কমিটি গঠিত হয়। এটা কালই (আজ) আইনমন্ত্রী উত্থাপন করবেন। অধ্যাদেশগুলো বিশেষ কমিটিতে পাঠানো হবে। সেখানে যাচাই-বাছাই করে রিপোর্ট আকারে সংসদে উত্থাপিত হবে। এ অধিবশনে অবশ্যই সম্ভব। সংবিধান সংস্কার পরিষদের আলোচনা নিয়ে জামায়াতের আন্দোলনের ঘোষণার বিষয়ে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বিএনপি কী ভাবছে, সংসদে বলব। সংসদ সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আমরা আমাদের বক্তব্য অবশ্যই দেব। আমরা কোন কারণে ওয়াকআউট করেছিলাম, কোন কারণে মনে করেছিলাম রাষ্ট্রপতি বক্তব্য দেওয়া অনুচিত, আমরা ধন্যবাদ দেব না (রাষ্ট্রপতিকে), আমাদের বক্তব্যটা বলব। সংবিধান সংস্কার বিষয়ে তিনি বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিষয়ে আমাদের পক্ষ থেকে বিরোধীদলীয় নেতা সময়মতো এ আলোচনার প্রসঙ্গ তুলবেন।