Image description

দেশের নগর পরিবহণ ব্যবস্থায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা গত এক দশকে দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। যার ভালো দিক হলো স্বল্প দূরত্বে যাতায়াত, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কম খরচে যাতায়াতের সুবিধা। এসব কারণে এটি সাধারণ মানুষের কাছে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যের। কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন সম্প্রসারণ এখন এক জটিল নগর সংকটে রূপ নিয়েছে। যানজট, সড়ক দুর্ঘটনা, বিদ্যুৎ গ্রিডে চাপ এবং সড়ক শৃঙ্খলার অবনতি-সব মিলিয়ে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। এছাড়া অটোরিকশা নিষিদ্ধ করলেই যে সমস্যার সমাধান হবে, এমন ধারণাও বাস্তবসম্মত নয়। কারণ এর সঙ্গে বহু মানুষের জীবন-জীবিকার প্রশ্ন জড়িত। ফলে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী বিকল্প নিশ্চিত করার মাধ্যমে এর টেকসই সমাধান খুঁজতে হবে।

সড়কের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে : জেলা শহর ও উপশহরে সংঘটিত সড়ক দুর্ঘটনার উল্লেখযোগ্য অংশ অটোরিকশা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। এর অন্যতম কারণ প্রযুক্তিগত অসামঞ্জস্য। অধিকাংশ অটোরিকশায় উচ্চ টর্কযুক্ত মোটর ব্যবহৃত হলেও ব্রেকিং সিস্টেম মানসম্মত নয়, কিংবা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। এছাড়া বর্তমানে অধিকাংশ অটোরিকশায় হাইড্রোলিক ব্রেক ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক হলেও বাস্তবে নিম্নমানের বা ম্যানুয়াল (যান্ত্রিক) ব্রেক ব্যবহার করা হচ্ছে। বিদ্যমান সমস্যাগুলো কর্তৃপক্ষের দেখার দায়িত্ব হলেও তারা নির্বিকার রয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্তরা টেকসই সমাধানের পথ না খুঁজে খামখেয়ালি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এতে করে অটোরিকশা নিয়ে সমস্যার সমাধান মিলছে না। এ অবস্থায় দেশের নগর ও মহানগরের সড়কগুলো আরও অনিরাপদ হয়ে উঠছে। কিন্তু ফলাফল হিসাবে যা ঘটছে, তা হলো-এক. হঠাৎ গতি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না, দুই. ঢালু সড়কে ব্রেক কার্যকর থাকছে না এবং তিন. জরুরি মুহূর্তে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে।

এদিকে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কাঠামোগত দুর্বলতা। ফলে সংঘর্ষে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। এই প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কমাতে হলে অটোরিকশায় মানসম্মত হাইড্রোলিক ব্রেকের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা জরুরি।

বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় অদৃশ্য চাপ তৈরি করছে : অননুমোদিত চার্জিং ও নিম্নমানের ব্যাটারি ব্যবহারের কারণে বিদ্যুৎ গ্রিডে অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি হচ্ছে। লোড ম্যানেজমেন্ট ছাড়া চার্জিং হওয়ায় বিদ্যুৎ অপচয়, ভোল্টেজ অস্থিরতা এবং অগ্নিকাণ্ড ঘটছে। হতাহত হচ্ছে মানুষ। সম্পদের অপচয়ও হচ্ছে। এ খাতসংশ্লিষ্ট অগ্নি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও দিনে দিনে বাড়ছে। তবে যদি একই বিদ্যুৎ পরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় ব্যবহার করা যায়, তাহলে গ্রিডের ওপর চাপ কমবে। বর্তমানে যে বিদ্যুৎ অনিয়ন্ত্রিতভাবে খরচ হচ্ছে তা শিল্পোৎপাদন ও জাতীয় অগ্রাধিকার খাতে ব্যবহার করা গেলে দেশের অর্থনীতির জন্য আরও বেশি ফলপ্রসূ হবে।

বাস্তবসম্মত বিকল্প ছোট সিসির গাড়ি : বর্তমানে বাংলাদেশে ০ থেকে ১ হাজার ৫০০ সিসি গাড়ির জন্য একীভূত কর কাঠামো বিদ্যমান। ফলে ০ থেকে ৮০০ সিসির ছোট গাড়ির জন্য আলাদা সুবিধা না থাকায় এটি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে। এজন্য নীতিগতভাবে এখন প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে-১. ০ থেকে ৮০০ সিসি গাড়ির জন্য পৃথক ও নিম্ন করহার নির্ধারণ করা। ২. ৮০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ সিসির জন্য ধাপভিত্তিক কর কাঠামো তৈরি করা। ৩. নিরাপদ ছোট গাড়ির বাজার সম্প্রসারণ ঘটানো।

এছাড়া ছোট গাড়িতে উন্নত ব্রেকিং সিস্টেম, শক্তিশালী চেসিস এবং মানসম্মত নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে-যা অটোরিকশার তুলনায় অনেক বেশি নিরাপদ।

এছাড়া লিথিয়াম ব্যাটারিতে কর প্রত্যাহার জরুরি। অটোরিকশা সংকটের কার্যকর সমাধান চাইলে এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

প্রথমত, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির ওপর আরোপিত কর প্রত্যাহার বা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে হবে। উচ্চ করের কারণে মানসম্মত ব্যাটারির দাম বেড়ে যায় এবং নিম্নমানের পণ্য বাজারে প্রবেশের সুযোগ পায়। দ্বিতীয়ত, ব্যাটারিচালিত গাড়ির ওপর কর কমাতে হবে। যদি ব্যাটারিচালিত ছোট গাড়ি সাশ্রয়ী হয়, তাহলে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ ধরনের যানবাহনের দিকে ঝুঁকবে। এতে যেসব সুফল মিলবে, তা হলো-১. অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশা কমবে। ২. বিদ্যুৎ ব্যবহারে শৃঙ্খলা আসবে। ৩. পরিকল্পিত চার্জিং ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রিডের ওপর চাপ কমবে।

আর বিদ্যুতের সঠিক খাতে ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে তা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। চার্জিং অবকাঠামো ছাড়া সমাধান সম্ভব নয়। শুধু কর হ্রাস নয়, পাশাপাশি কিছু প্রয়োজন রয়েছে। সেগুলো হলো-১. লাইসেন্সপ্রাপ্ত ও মানসম্মত চার্জিং স্টেশন। ২. নির্ধারিত চার্জিং জোন। ৩. স্মার্ট মিটারিং ও লোড ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা করা। ৪. পরিকল্পিত অবকাঠামোই পরিবহণ ব্যবস্থাকে টেকসই করবে।

এখনই লাগাম টানতে হবে : যদি আমরা এখনই এসব বিকল্প নিশ্চিত করতে না পারি, খুব শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সড়ক দুর্ঘটনা বাড়বে, বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর চাপ অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছাবে, নগরে যানজট তীব্র হবে এবং নিম্নমানের প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে দুর্বল করবে।

এটি শুধু পরিবহণ নীতির প্রশ্ন নয়; এটি জাতীয় স্বার্থ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। সঠিক সিদ্ধান্ত এখনই নিতে হবে। দূরদর্শী নীতির মাধ্যমে আমরা একটি নিরাপদ, আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব নগর পরিবহণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি। বিলম্ব করলে এর মূল্য পুরো জাতিকেই দিতে হবে। এজন্য নতুন সরকারের কাছে দাবি জানাব-সড়কে বিরাজমান অটোরিকশা সমস্যার সমাধানে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে। তাহলে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে। টেকসই পরিবহণ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।

লেখক : ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বাংলা কারস লিমিটেড