Image description

বিপদের পূর্বাভাস দিচ্ছে ঘন ঘন ভূমিকম্প। গতকাল (২৭ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১টা ৫২ মিনিট ২৯ সেকেন্ডে সর্বশেষ কম্পনটি টের পায় মানুষ। উৎপত্তিস্থল ছিল সাতক্ষীরার আশাশুনি। এতে অনেক কাঁচা ঘরবাড়ি ভেঙে পড়ে। পশ্চিমের জেলা সাতক্ষীরায় সৃষ্ট কম্পন ছড়িয়ে পড়ে রাজধানী হয়ে পূর্ব দিকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত। এ নিয়ে ফেব্রুয়ারির ২৭ দিনে ১০টি মৃদু ও মাঝারি ভূমিকম্প অনুভব করেছে দেশবাসী।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতি ১০০ বছর পরপর বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়। সাতক্ষীরা, বরিশাল, খুলনা অঞ্চল ভূমিকম্পের তীব্র ঝুঁকিতে না থাকলেও দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চল রয়েছে উচ্চ ঝুঁকিতে। রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকা রয়েছে মধ্যম ঝুঁকিতে। এসব এলাকায় যেকোনো বড় ভূমিকম্প বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। জরিপের তথ্য বলছে, ৭ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হলে ঢাকায় ৭২ হাজার ভবন ভেঙে পড়বে এবং চট্টগ্রামের ৭০-৮০ ভাগ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ফারজানা সুলতানা জানিয়েছেন, গতকালের ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৪। এটি মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক হুমায়ূন আখতার জানান, পরপর দুই দফা এই ভূমিকম্প অনুভূত হয়।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) সাবেক প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, ৭-৮ মাত্রার ভূমিকম্পে চট্টগ্রাম মৃত্যুপুরীতে পরিণত হতে পারে। নকশা অনুমোদনের সময় আটটি স্তরের অনুমোদন নেওয়া হলেও নির্মাণের সময় ৭০-৮০ শতাংশ ভবন নির্মাণে এসব বিষয় মানা হয়নি। এ কারণে এসব ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। তবে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ১০০টি ভবনের তালিকা তৈরি করে সিটি করপোরেশনকে হস্তান্তর করা হয়েছিল। ভবনগুলোর বিষয়ে তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা।

কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হওয়া ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার আগারগাঁও আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে ১৮৮ কিলোমিটার দূরে। ইউরোপীয় ভূমধ্যসাগরীয় ভূমিকম্প কেন্দ্র ইএমএসসি জানিয়েছে, ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল খুলনা জেলা শহর থেকে ৪৭ কিলোমিটার দক্ষিণ পশ্চিমে এবং সাতক্ষীরা থেকে ১৮ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে। গভীরতা ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে ৩৫ কিলোমিটার। ঢাকা ছাড়াও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা এবং পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কিছু এলাকাতেও কম্পন অনুভূত হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে আমাদের সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, জুমার নামাজের পরপরই প্রচণ্ড ঝাঁকুনি শুরু হয়। মুসল্লিদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেকে মসজিদ ছেড়ে খোলা জায়গায় বেরিয়ে আসেন। শহরের বহুতল ভবনের বাসিন্দারা রাস্তায় নেমে আসেন। আশাশুনি, তালা ও কলারোয়া উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চলে মাটির ঘরবাড়ি ধসে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, এর আগে সাতক্ষীরায় এত শক্তিশালী ঝাঁকুনি তারা অনুভব করেননি।

এদিকে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে সাধারণত ভূমিকম্পে কম ঝুঁকিপূর্ণ বলে ধরা হয়। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হয় উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে। সম্প্রতি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেও ভূমিকম্প বাড়ছে। চলতি মাসের শুরুতে ১ ফেব্রুয়ারি সিলেটে ৩ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। ৩ ফেব্রুয়ারি একই দিনে একাধিকবার কেঁপে ওঠে দেশ। সেদিন সাতক্ষীরার কলারোয়ায় ৪ দশমিক ১ মাত্রার কম্পন রেকর্ড হয়। একই সময়ে মিয়ানমারে ৫ দশমিক ৯ ও ৫ দশমিক ২ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে, যার কম্পন অনুভূত হয় বাংলাদেশেও। ৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারি সিলেট অঞ্চলে আরও দুটি কম্পন টের পাওয়া যায়। ১৯ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের ছাতকে ৪ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে ৫ দশমিক ১ মাত্রার আরেকটি কম্পনের উৎপত্তিস্থল ছিল মিয়ানমারে। ২৬ ফেব্রুয়ারি ভারতের সিকিমে ৩ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের প্রভাব পড়ে বাংলাদেশে। আর ২৭ ফেব্রুয়ারির ৫ দশমিক ৪ মাত্রার কম্পন মিলিয়ে সংখ্যাটি দাঁড়াল ১০-এ। এদিন দুবার কম্পনকে গণনায় ধরলে সংখ্যা হয় ১১।

এর আগে গত নভেম্বরে ঘন ঘন ভূমিকম্পে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে পুরো দেশ। ২১ নভেম্বর সকাল ১০টা ৩৮ মিনিট ২৬ সেকেন্ডে নরসিংদীর মাধবদীতে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে দেশের অধিকাংশ এলাকা। এতে নিহত হয় ১০ জন, আহত হয় ছয় শতাধিক। পরদিন তিনটি ভূমিকম্প হয়। ২৩ নভেম্বর সকাল ১০টা ৩৯ মিনিটে ফের ভূমিকম্প হয় মিয়ানমার উপকূলে। দুই দিন পর ফের তিন দফা ভূমিকম্প হয়। তখন অচিরেই এই অঞ্চলে বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা প্রকাশ করে প্রস্তুতির পরামর্শ দিয়েছিলেন বিশেষজ্ঞরা।

ভূতত্ত্ববিদদের মতে, বাংলাদেশ ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। ফলে এখানে ভূমিকম্পের ঝুঁকি ঐতিহাসিকভাবেই বেশি। দীর্ঘ সময় বড় মাত্রার শক্তি মুক্ত না হলে বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগবিজ্ঞান ও জলবায়ু সহনশীলতা বিভাগের অধ্যাপক ড. জিল্লুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সাতক্ষীরা অঞ্চলে গত কয়েক শ বছরে বড় ধরনের (সাড়ে ৬ মাত্রার বেশি) ভূমিকম্পের রেকর্ড নেই। ঝুঁকিও কম। তবে বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে আছে উত্তরাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চল। এখন ঘন ঘন যে ভূকম্পন হচ্ছে, এগুলো প্লেট বাউন্ডারির সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। এগুলো বড় হওয়ার আশঙ্কা তেমন নেই। যেখানে ঐতিহাসিকভাবে বড় ভূকম্পন হয়, সেখানেই বড় ভূমিকম্প হয়। আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে উত্তরাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলে ৭ বা ৮ মাত্রার বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে আছে। সেই হিসাবে ঢাকা মাঝারি ঝুঁকিতে আছে। তবে মাঝারি ভূমিকম্পই ঢাকাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে পারে। এজন্য নির্দিষ্ট এলাকার বিল্ডিং কোড অনুযায়ী ভবন নির্মাণ নিশ্চিত করা জরুরি। এ ছাড়া বাংলাদেশের ভিতরে ছোট ছোট ফল্ট আছে, যা আমরা বের করতে পারিনি। এগুলো বের করা দরকার।

বড় ঝুঁকিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম : রাজধানীজুড়ে প্রায় ২১ লাখ ৪৬ হাজার ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। এসব ভবনের বেশির ভাগই নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে তৈরি হয়েছে। বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে রাজধানীতে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারে বলে সতর্ক করছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। ?দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি (সিডিএমপি) ও জাইকার যৌথ জরিপে জানা গেছে, ঢাকায় ৭ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হলে শহরের অন্তত ৭২ হাজার ভবন ভেঙে পড়বে। এ ছাড়া ১ লাখ ৩৫ হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তৈরি হবে ৭ কোটি টন কনক্রিটের স্তূপ। এ ছাড়া চট্টগ্রামের ৮০ ভাগ ভবন ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) তথ্য অনুযায়ী, নগরীতে ৩ লাখ ৮২ হাজার ১১১টি ভবন আছে। এর মধ্যে একতলা ভবন ২ লাখ ৭৮ হাজার ৫টি, ২-৫ তলা ভবন ৯০ হাজার ৪৪৪টি। ৬-১০ তলা ভবন ১৩ হাজার ১৩৫, ১০ তলার ওপরে ভবন ৫২৭টি, ২০ তলার বেশি ভবন আছে ১০টি। বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে এসব ভবনের মধ্যে ৭০-৮০ শতাংশ বিভিন্ন মাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ।