ভোটের বাকি মাত্র কয়েক ঘন্টা। ফাঁকা হয়ে গেছে ঢাকা। রাজধানীর চিরচেনা রূপ এখন নেই। অলিগলি থেকে শুরু করে রাজপথ সবখানে একটা খাঁ খাঁ অবস্থা। নগরবাসী কাঁধে ব্যাগ-হাতে ব্যাগ নিয়ে ঢাকা ছাড়ছেন। তাদের চোখে মুখে উচ্ছ্বাস। অপার আনন্দ নিয়ে তাদের এই ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য একটাই জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়া। যাত্রা পথের সীমাহীন দুর্ভোগ, স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি অর্থ খরচ আর শারীরিক ঝক্কি নিয়ে তাদের এই বাড়ি ফেরা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঈদের আনন্দের চেয়েও বেশি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে বুধবার ও বৃহস্পতিবার সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিসসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাধারণ ছুটি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে শুক্র ও শনিবার। একদিকে চারদিনের ছুটি অন্যদিকে দীর্ঘ বছর পর একটি জাতীয় নির্বাচন। এটাকে সুযোগ হিসেবে দেখছেন দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে বসবাস করা গ্রামের মানুষগুলো নির্বাচন নামের এই উৎসবকে কোনো ভাবেই মিস করতে চাইছেন না। রাজধানী হওয়ায় ঢাকায়ই এর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে।
ঢাকা ফাঁকা হওয়ার পেছনের প্রধান কারণ ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষ মনে করছেন, এই প্রথম তারা ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছেন এবং যার যার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারছেন। যার ফলে ভোটাররা ভোট দিতে ছুটে যাচ্ছেন। রাজধানীতে বসবাসকারী মানুষের বড় একটি অংশই নিজ জেলার ভোটার। চাকরি, ব্যবসা, শিক্ষা ও জীবিকার প্রয়োজনে তারা ঢাকায় থাকলেও ভোট দিতে যেতে হয় নিজ নির্বাচনী এলাকায়। নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে এই মানুষগুলোর বড় একটি অংশ রাজধানী ছাড়ছেন।
বিশেষ করে গার্মেন্টস শ্রমিক, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নিম্ন আয়ের মানুষ আগেভাগেই ঢাকা ছাড়ছেন যাতে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন। গত কয়েকদিনে দূরপাল্লার পরিবহনে নিজ নিজ এলাকায় যাওয়ার চাপ দেখা গেছে। টার্মিনালগুলোতে ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। সদরঘাট, কমলাপুর রেলস্টেশন, গাবতলী ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ঢাকা ছাড়ছেন।
ভোটারদের ঢাকা ছাড়ার সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়েছে রাজধানীর সড়কে। যেখানে প্রতিদিন যানজট ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী, সেখানে এখন যান চলাচল তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়গুলোতে গাড়ির চাপ কমে যাওয়ায় নগরবাসীরা কিছুটা স্বস্তিতে চলাচল করছেন। রাজধানীতে অবস্থানকারী অনেক নগরবাসী বলছেন, নির্বাচন এলেই ঢাকা যেন অন্য রূপ নেয়। যানজট কম, শব্দদূষণ কম, চলাচলে স্বস্তি-এই চিত্র সাময়িক হলেও অনেকের কাছে স্বস্তিদায়ক।
রাজধানীর বিজয় স্মরণী, ফার্মগেট, মহাখালী, ধানমন্ডি, গুলিস্তানসহ বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সড়কে তেমন যানজট নেই। দুই-একটি ট্রাফিক সিগনাল ছাড়া কোথাও তেমন গাড়ির চাপ দেখা যায় না। নগরবাসীর দাবি, ঈদ ছাড়া এমন যানজটমুক্ত নগরীর দেখা মেলে না।
উৎসব আর স্বস্তির খবরের পেছনে অস্বস্তির খবরও আছে। বিশেষ করে রাজধানীর উত্তরাঞ্চলসহ গাজীপুরের বিশাল শিল্প এলাকার শ্রমিকরা পড়েছেন প্রচন্ড দুর্ভোগের মধ্যে। অনেক কারখানায় ঠিকঠাক বেতন না হওয়া এবং পরিবহন সঙ্কটের কারনে অনেকের ইচ্ছে থাকার পরও বাড়িতে যেতে পারেননি। এতো বছর পর পছন্দের প্রার্থীদের ভোট দিবেন সেই সুযোগ না পেয়ে অনেকেই মনোকষ্টের মধ্যে রয়েছেন। তাদের এই কষ্ট লাঘবের কোনো সুযোগ নেই। অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে তারা এই কষ্ট না পেলেই ভালো হতো।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সারাদেশের ২৯৮টি সংসদীয় আসনে একযোগে ভোট অনুষ্ঠিত হবে। সেই সঙ্গে গণভোটও হচ্ছে। আওয়ামী ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে একটি নতুন সরকারের জন্য অপেক্ষা করছে বাংলাদেশ। একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে আসবে। রাজনীতি ফিরবে তার সাধারণ গতিপথে। ভোটাধিকার প্রয়োগের মধ্য দিয়ে মানুষ তার ভবিষ্যতের স্বপ্ন পূরণে প্রতীক্ষায় থাকবে। জনগণের ভোটে প্রতিষ্ঠিত সরকার জনগণের সেই স্বপ্ন পূরণে তাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে। এভাবেই এগোতে থাকবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র।
এভাবের নির্বাচনে প্রায় সাড়ে চার কোটি তরুণ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে। যার একটি বিশাল অংশই চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে সরাসরি অংশ নেওয়া। তাদের ভেতর পরিবর্তন ও সংস্কারের এক অপার নেশা বহমান। তাদের দু’চোখে অবারিত স্বপ্ন। হৃদয়ে অসীম সাহস। সেই সাহস চ্যালেঞ্জ গ্রহনের। তারা পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিলোপের স্বপ্ন দেখে। তারা মনে করে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত এদেশে চালু করা না গেলে বাংলাদেশ পরিবর্তন হবে না। আর পরিবর্তনের গণতান্ত্রিক পদ্ধতিই হলো নির্বাচন। যে কারনে তাদের কাছেও এই নির্বাচন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আমি বিশ্বাস করি, নির্বাচনকে সামনে রেখে যারা পথের সীমাহীন দুর্ভোগ আর নানা শঙ্কা নিয়েও গ্রামে ছুটছেন তারাই প্রকৃত নাগরিক। এইসব নাগরিকেরা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারলে দেশে পরিবর্তন আসবে। সুতরাং ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সকল ভয়ভীতি আর শঙ্কা মুক্ত রাখার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। নির্বাচন কমিশনের সদিচ্ছা আর আন্তরিকতাই শহর-নগর ছেড়ে গ্রামে ফেরা এসব ভোটারদের উচ্ছ্বাসকে জিইয়ে রাখতে পারে। নিজের কষ্টার্জিত উপার্জন খরচ করে ভোটাধিকার প্রয়োগের এই যাত্রাকে নির্বিঘ্ন করা যায়নি। রাস্তাঘাটে গণপরিবহন নেই। যেগুলো আছে তাতে ভাড়া কয়েকগুণ। অভ্যন্তরীণ রুটে বাংলাদেশ বিমানসহ বেসরকারি বিমানেও কয়েকগুণ বেড়েছে ভাড়া।
তারপরও উচ্ছ্বসিত জনগণ বসে নেই। যে যেভাবে পারছেন গন্তব্যে ছুটছেন। জনগণের এই উচ্ছ্বাসকে ধরে রাখতে হলে সর্বকালের একটি সেরা নির্বাচন উপহার দেওয়ার বিকল্প নেই। আশা করি নির্বাচন কমিশনসহ অন্তর্বর্তী সরকার তাদের চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখবে না। কেননা কথায় আছে সব ভালো তার শেষ ভালো যার। আশা করি সরকার তার শেষ সুযোগটি হাতছাড়া করবে না।
লেখকঃমেসবাহ শিমুল