Image description

পাকিস্তান নিজেদের আঞ্চলিক নিরাপত্তা সরবরাহকারী দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। তবে দেশটিতে বিদ্যমান অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা ও জঙ্গিবাদের প্রসার সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

আলজাজিরায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ভূরাজনীতি বিশ্লেষক রিয়াজ খোখার জানিয়েছেন, সম্প্রতি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে আলোচনার জন্য রাওয়ালপিন্ডি সফর করেছেন লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় বিদ্রোহীদের সামরিক কমান্ডার খলিফা হাফতার। আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ সফর মনে হলেও মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা কূটনীতির প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে সফরটিকে।

 

হাফতারের স্বঘোষিত লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির (এলএনএ) সঙ্গে ৪ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে পাকিস্তান। যার মধ্যে রয়েছে ১৬টি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান ও ১২টি সুপার মুশাক প্রশিক্ষণ বিক্রির তথ্য। আধুনিক প্রজন্মের এসব প্রতিরক্ষা সামগ্রী হাতে পেলে লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির (এলএনএ) শক্তি কয়েক গুণ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

 

এছাড়া সুদানের সশস্ত্র বাহিনীর (এসএএফ) সঙ্গে ১০টি কারাকোরাম-৮ লাইট অ্যাটাক এয়ারক্রাফট, ২ শতাধিক ড্রোন হস্তান্তরের বিষয়েও চুক্তি করছে। এসব অস্ত্র পেলে দেশটি আধাসামরিক র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে কিছুটা হলেও এগিয়ে থাকবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

 

মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ দেশটির জাতীয় স্বার্থের জন্য কোনো সমস্যা সৃষ্টি করবে না। এর মাধ্যমে দেশটির সরকার বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা লাভ করবে এবং ওই অঞ্চলে দেশটির কূটনৈতিক প্রভাব বাড়বে। উপসাগরীয় অঞ্চল ও তার বাইরের দেশগুলোর সঙ্গেও পাকিস্তানের সামরিক সম্পর্ক উন্নত হবে।

 

তবে তাদের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বিক্রির বিষয়টি কয়েকটি প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তান কি শুধু মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় অস্ত্র রপ্তানি করবে নাকি দেশগুলোকে নিরাপত্তাও দেবে? নিজ দেশের মধ্যেই জঙ্গিবাদ ও সীমান্ত সংঘাতের মতো বিষয়গুলো কি তাদের নিরাপত্তা প্রদানকারীর ভূমিকা যথাযথভাবে পালন করতে দেবে?

 

তারা বলছেন, এ অঞ্চলে সামরিক সহযোগিতা ও অস্ত্র সরবরাহ করা বা কূটনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি স্বল্পমেয়াদি সাফল্য দিতে পারে। কিন্তু পাকিস্তানের টেকসই অর্থনৈতিক ভিত্তি ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার স্থিতিশীলতাই শুধু দেশটিকে নিরাপত্তা প্রদানকারীর ভূমিকায় নিয়ে আসতে পারে।

 

ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সফল বিমান হামলা এবং রাফায়েল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় দেশটির সামরিক অস্ত্রের কদর বেড়েছে। এর ফলে এ অঞ্চলের ধনী দেশগুলো তাদের প্রতিরক্ষা অংশীদার হচ্ছে। এতে করে সম্প্রতি পাকিস্তানি অস্ত্রের রপ্তানি বেড়েছে।

 

এর কিছু কারণও রয়েছে, পাকিস্তানের বিমানবাহিনী এখন বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী বাহিনী। তাদের পাইলটদের প্রশিক্ষণের মানও ভালো। এসব কারণে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের সাথে একটি কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে সৌদি আরব। চুক্তি অনুযায়ী, এর মধ্যে কোনো একটি দেশের ওপর হামলা হলে তা উভয়ের ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচেনা করা হবে এবং উভয়ের তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।

 

মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার এসব দেশের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কের ফলে দেশটির অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। তবে বড় হলেও এই অর্থনৈতিক প্রভাব ভারতের তুলনায় কম। পাকিস্তান যখনই অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে পড়ে, তখনই তারা উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে সহায়তা নেয়।

 

একই সময়ে বেলুচিস্তান ও ইসলামাবাদে হওয়া জঙ্গি হামলা পাকিস্তানের নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থার বেহাল দশার প্রতীক। আফগানিস্তানের সঙ্গেও তাদের সীমান্ত সমস্যা চলছে। আর ভারতের সঙ্গে দেশটির সংঘাত তো দীর্ঘদিন ধরেই চলছে।

 

দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ‘পাকিস্তানকে কট্টর শত্রুরা ঘিরে রেখেছে। এটা যে কোনো দেশের জন্য এক ধরনের দুঃস্বপ্ন।’

 

বিশ্লেষকদের মতে, কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি যখন স্থিতিশীল থাকে এবং অর্থনীতি দৃঢ় থাকে, তখনই তারা অন্য দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ভূমিকা রাখতে পারে। এর ব্যতিক্রম হলে তারা শুধু নিজ দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষার্থে তাদের ব্যস্ত থাকতে হয়, অন্য দেশের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করার সক্ষমতা থাকে না। এ ধরনের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকট পাকিস্তানকে শুধু সমরাস্ত্র বিক্রির পরিবেশ দেয়, তবে তাদের নিরাপত্তা প্রদানকারী দেশের ভূমিকায় আসতে দেবে না।