Image description
 
 

বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে অংশগ্রহণ, বিশ্বাসযোগ্যতা ও অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে আলোচিত। বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ না থাকা একটি বড় গণতান্ত্রিক ঘাটতি হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে পোস্টাল ভোট ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী ও ইতিবাচক অগ্রগতি।

 

পোস্টাল ভোট এমন একটি পদ্ধতি, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট শ্রেণির ভোটার সরাসরি ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত না থেকেও আইনসম্মতভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এই ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর রয়েছে। বাংলাদেশে এর সূচনা নির্বাচন ব্যবস্থাকে আরও বাস্তবমুখী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রাথমিক পর্যায়ে কয়েকটি নির্দিষ্ট ক্যাটাগরির ভোটার পোস্টাল ভোটের আওতায় আসছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো প্রবাসী বাংলাদেশিরা। দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাইরে অবস্থানরত বিপুলসংখ্যক নাগরিক জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিলেন। অথচ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনসহ অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোতে তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। পোস্টাল ভোটের মাধ্যমে তাঁদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা গণতান্ত্রিক ন্যায্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।

 

প্রবাসী ভোটাররা ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন করে পোস্টাল ব্যালটে ভোট প্রদান করতে পারবেন। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এই প্রক্রিয়াকে সহজ ও নাগরিকবান্ধব করেছে। এটি নির্বাচন ব্যবস্থায় প্রযুক্তিনির্ভর সংস্কারের একটি ইতিবাচক সূচনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

 

পোস্টাল ভোট ব্যবস্থার আওতায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পোলিং অফিসারদের অন্তর্ভুক্ত করাও একটি বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত। নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের কারণে যাঁরা এতদিন ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি, তাঁদের এই সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতারই প্রতিফলন।

এছাড়া আইনি হেফাজতে থাকা কিন্তু ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত নন-এমন নাগরিকদের পোস্টাল ভোটের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত মানবিক ও সংবিধানসম্মত। এটি নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

পোস্টাল ভোট ব্যবস্থার সফল বাস্তবায়ন ভোটার অংশগ্রহণ বৃদ্ধি ও নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা জাতীয় ঐক্য ও প্রতিনিধিত্বকে আরও শক্তিশালী করবে।

তবে এই উদ্যোগের সাফল্য অনেকাংশেই নির্ভর করবে এর বাস্তবায়নের ওপর। স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা, নিরপেক্ষতা ও সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। ব্যালটের গোপনীয়তা রক্ষা এবং জালিয়াতি প্রতিরোধে নির্বাচন কমিশনকে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও পেশাদারিত্ব প্রদর্শন করতে হবে।

পোস্টাল ভোট ব্যবস্থা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় একটি আশাব্যঞ্জক সংযোজন। সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এটি নির্বাচন ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে এবং গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করতে সহায়ক হতে পারে।

 

ড. জাহিদ আহমেদ চৌধুরী

লেখকঃ কলামিস্ট ও মানবাধিকারকর্মী ড. জাহিদ আহমেদ চৌধুরী