Image description

নির্বাচন এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক অঙ্গনে বাড়ছে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। কথার ফুলঝুরি দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করছেন নির্বাচনি রেসে থাকা রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট নেতারা। তারা অভিযোগ তুলছেন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে। এতে আগামী জাতীয় নির্বাচন কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত উত্তাপ বাড়ছে।

এ পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক আদর্শ থেকে সরে এসে নির্বাচনে পেশিশক্তি ব্যবহার হলে সহিংস ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা। তবে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে দলগুলোর এ ধরনের অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করছে এবং সব দলের জন্য সমান সুযোগ রয়েছে। আইন অনুযায়ী প্রশাসন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করছে এবং কেউ নির্বাচনি বিধি লঙ্ঘন করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীর সমালোচনা করে বক্তব্য দিতে দেখা গেছে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের। অন্যদিকে বিএনপির সমালোচনায়ও ছাড় দিচ্ছেন না জামায়াত ও এনসিপির শীর্ষ নেতারা।

সিলেটে প্রথম নির্বাচনি জনসভায় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, ‘একটি দল নির্বাচনের আগে আপনাদের বেহেশত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। যা দেওয়ার মালিক আল্লাহ সেটা দেওয়ার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনের আগেই মানুষকে ঠকাচ্ছে। এই দল মুসলমানদের শিরক ও কুফরি শেখাচ্ছে। যারা বলে অমুককে দেখেছি, তমুককে দেখেছি তাদের ’৭১ সালের ইতিহাস জনগণ জানে। তারা এ দেশের স্বাধীনতা চায়নি।’ কিশোরগঞ্জের জনসভায় জামায়াতকে উদ্দেশ করে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘এবারও একটি দল ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। মা-বোনদের আইডি কার্ডের নম্বর ও বিকাশ নম্বর নিচ্ছে তারা। ’৭১ সালে যারা মা-বোনের সম্মানহানি করেছে, তারা এ কাজগুলি করছে। ষড়যন্ত্রকারীর বিরুদ্ধে আমাদের সজাগ থাকতে হবে।’

পঞ্চগড়ের জনসভায় জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের হাতে কোনো কার্ড নাই। আপনাদের বুকে ভালোবাসার কার্ড চাই। সমর্থন, দোয়া ও ভালোবাসা আমাদের কার্ড। একদল বেকার ভাতা দিতে চায়। আমরা বেকার ভাতা নয়, যুবকদের কাজ দিয়ে সম্মানিত করতে চাই।’ গাইবান্ধার জনসভায় তিনি বলেন, ‘জামায়াতের নেতা-কর্মীরা জুলুম-নির্যাতন সহ্য করেও দেশেই ছিলেন, দেশ থেকে কোথাও মুচলেকা দিয়ে পালিয়ে যাননি। যে দলের নেতারা দেশ ও দেশের মানুষকে ভালোবাসেন, তারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান না।’

বিএনপির সমালোচনা করে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘যারা ফ্ল্যাট দেওয়ার কথা বলে তাদের বস্তি উচ্ছেদের পরিকল্পনা আছে। এ ধরনের প্রতারণা জনগণ বুঝে গেছে। ফ্যামিলি কার্ড বা কৃষক কার্ড বিএনপির ধোঁকাবাজি, মাঠপর্যায়ে মানুষ এসব প্রতিশ্রুতিতে সাড়া দিচ্ছে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘একদিকে তারা কার্ড দেওয়ার কথা বলছেন, আরেক দিকে ঋণখেলাপিদের মনোনয়ন দিচ্ছেন। যাদের মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে তারা তো আবার ক্ষমতায় গিয়ে লুট করবে। জনগণের টাকা মেরে খাবে, এমন ব্যক্তিদেরই নমিনেশন দিয়েছে দলটি।’

অন্যদিকে নির্বাচনি মাঠে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নষ্ট করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। দলটির দাবি, একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল স্বার্থ হাসিলের জন্য ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যবহার করছে এবং পোস্টাল ব্যালট প্রক্রিয়ায় অনিয়ম চালাচ্ছে। দলটির কেন্দ্রীয় জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, ‘গণমাধ্যমে দেখা গেছে একটি বিশেষ দলের মার্কায় ভোট দিতে পবিত্র কোরআন ছুঁয়ে শপথ করানো হচ্ছে, যা আচরণবিধির সরাসরি লঙ্ঘন। এ ছাড়া ওই দলটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহ করছে’, যার পেছনে অসাধু উদ্দেশ্য রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

জামায়াতে ইসলামীর অভিযোগ, নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা মাঠ প্রশাসন একটি নির্দিষ্ট দলের পক্ষে কাজ করছে। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘প্রশাসনের নিরপেক্ষতা জরুরি। কিন্তু মাঠপর্যায়ের রিটার্নিং কর্মকর্তারা পক্ষপাতমূলক আচরণ করছেন।’ এনসিপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন সঠিকভাবে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে পারছে না। দলীয়করণ থেকে সরে এসে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানাই। প্রচারের প্রথম দিন থেকেই অন্যতম একটি রাজনৈতিক দল ও দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন।’

পোস্টার ও মাইক ব্যবহার করে নির্বাচনি বিধিনিষেধ লঙ্ঘন করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর এ ধরনের পাল্টাপাল্টি অবস্থানকে কীভাবে দেখছেন-জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘এর মাধ্যমে দলগুলো সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করছে। কিন্তু দিনশেষে মানুষ আদর্শিক রাজনীতি করে না, করে পেশিশক্তির রাজনীতি। এটা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।’ তিনি বলেন, ‘এখনই যেভাবে কাদা ছোড়াছুড়ি বা অভিযোগের রাজনীতি শুরু হয়েছে, তাতে ভবিষ্যতে সহিংস ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।’ বিশ্লেষকদের মতে সামনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হতে পারে। সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তাঁরা।