
‘ক্ষমতার বদহজম’ শব্দযুগলটি প্রথম ব্যবহার করেছিলেন আওয়ামী লীগের প্রাক্তন সভাপতি, যিনি মওলানা ভাসানীর পরে এবং শেখ মুজিবের আগে ১৯৬৪-৬৬ সালে দলটির সভাপতি ছিলেন। দুঃখজনকভাবে তার নিজের দলটির বিরুদ্ধেই এই শব্দ দুটি প্রয়োগ করেছিলেন। প্রথম বাকশালের শাসনামল দেখে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, ক্ষমতা এদের জন্য বদহজমের কারণ হয়েছে। দ্বিতীয় বাকশালের সময় আওয়ামীপন্থি বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত বিচারপতি হাবিবুর রহমান বলে গেছেন, দেশটি বাজিকরদের হাতে পড়ে গেছে।
১৯৪৭ সালে আমাদের মানচিত্র এবং পতাকা পরিবর্তন হলেও সামাজিক গ্রন্থি, মূল্যবোধ ও চেতনা অনেকাংশে অক্ষুণ্ণ ছিল। ১৯৭১ সালে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা সামাজিক গ্রন্থিটি ছিঁড়ে যায় কিংবা আরো স্পষ্ট করে বলা যায় তা ছিঁড়ে ফেলা হয়। ফলে সমাজের নিজস্ব মেকানিজমে এবং প্রকৃতভাবে বেড়ে ওঠা নেতৃত্বের ধারাবাহিকতাটি ডিস্টার্ব হয়ে পড়ে। চোর ডাকাত এবং নিচু মনমানসিকতার অনেক লোক রাতারাতি নেতৃত্বের সারিতে চলে আসে এবং বেপরোয়া লুটপাট শুরু হয়।
১৯৭১ সালে প্রায় পুরো বছর যুদ্ধ চললেও ১৯৭২ সালে দুর্ভিক্ষ হয়নি। এই দুর্ভিক্ষটি হয়েছে কিন্তু ১৯৭৪ সালে, ১৯৭২ ও ১৯৭৩ সালে সর্বগ্রাসী আওয়ামী লুটপাটের কারণে । ১৯৭১ সালের যুদ্ধে যত লোক নিহত হয়েছেন, এর চেয়েও অনেক বেশি লোক মারা গেছে ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে।
শেখ কামালের নেতৃত্বে রাজধানী শহরে যেমন ক্ষমতার এই উৎকট প্রদর্শনী শুরু হয়েছিল, একইভাবে দেশের সব অঞ্চলে মুজিব বাহিনীর সেই তাণ্ডব জাতির কালেকটিভ মেমোরিতে এখনো ভয়াবহ স্মৃতি হিসেবে জমা রয়েছে। শেখ কামাল এবং তার দলবল কর্তৃক অ্যানালগ ব্যাংক ডাকাতির সেই কাহিনিও খুব অবিশ্বাস্য মনে হয় না। কারণ বোনের ডিজিটাল ডাকাতির নমুনা ভাইয়ের অ্যানালগ ডাকাতিকে আরো বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে।
আত্মপক্ষ সমর্থনে শেখ হাসিনা বলতেন যে একজন রাষ্ট্রপতির ছেলেকে ব্যাংক ডাকাতি করার প্রয়োজন হয় না। ব্যাংকিং চ্যানেলে তখনো কিছু অফিশিয়াল ফরমালিটিজ অবশিষ্ট ছিল। শেখ কামাল চাহিবা মাত্র ব্যাংকের সিন্দুক থেকে টাকা পাঠানোর কসরত তখনো ব্যাংকারদের কেউ রপ্ত করতে পারেননি। আর ক্ষমতার বদহজমের প্রভাবে এতটুকু সময় অপেক্ষা করার ধৈর্য শেখ কামালের ছিল না।
সত্যি বলতে গেলে, ক্ষমতার এই বদহজম কিছু সময় বাদে অর্ধশতাব্দী ধরেই কমবেশি লক্ষ করা গেছে। ইদানীং বিষয়টি নজরে পড়েছে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি এবং বর্তমান সরকারের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর এবং একই দল থেকে বিএনপিতে যোগ দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁনের সাম্প্রতিক হাবভাব এবং বক্তৃতা-বিবৃতি দেখে। এদের দেখে মনে হচ্ছে সূর্যের চেয়ে বালুর উত্তাপ বেশি। বিশেষ করে, শহীদ শরীফ ওসমান হাদিকে উদ্দেশ্য করে নুরের কিছু মন্তব্য নিয়ে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
ক্ষমতার বদহজমে নুর এখন হাদিকে চিনতে পারছেন না। ফ্যাসিবাদবিরোধী সব শক্তির সহানুভূতি ও সহযোগিতা নিয়ে লাইম লাইটে এসেছিলেন নুর। দক্ষিণবঙ্গের প্রত্যন্ত গ্রামের খুবই সাধারণ পরিবার থেকে ওঠে আসা অত্যন্ত নিরীহ গোছের একটি ছেলে। তার নিজের এবং পরিবারের এই অবয়ব সাধারণ মানুষের সহানুভূতি অধিকহারে কেড়েছিল । অনেকেই তার মধ্যে আগামী দিনের বিকল্প নেতৃত্বের ছবি দেখতে শুরু করেছিলেন।
কিন্তু ভিপি হয়েই তিনি জাত চেনাতে শুরু করলেন। হাসিনার মধ্যে নিজের স্নেহময়ী মায়ের কোমল মুখটি দেখতে পান এবং নিজের আওয়ামী রক্তের কথা ঘোষণা করেন। তার সমর্থকরাও টের পান যে তারা কী ভুলটি করে ফেলেছেন।
নুরের চেয়ে তুলনামূলক অনেক সচ্ছল এবং সম্ভ্রান্ত পরিবার থেকে শরীফ ওসমান হাদি ওঠে এসেছেন। তার বাবা এলাকার নামকরা আলেম ছিলেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং খালেদা জিয়ার কথা দ্বিধাহীন চিত্তে প্রকাশ করে গেছেন, উচ্ছ্বসিত প্রশংসার মধ্যে তার নিজের কোনো মতলব ছিল না, যা বলতেন তা নিজের বিশ্বাস এবং হৃদয়ের গভীর থেকেই বলতেন।
কারণ তিনি স্পষ্ট বুঝেছিলেন যে তার বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানকে বিএনপি অথবা জামায়াতে ইসলামী কেউ সম্যক ধারণ করতে পারবে না। তাই তিনি সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন এবং তদনুযায়ী কাজও করে গেছেন। বিএনপির এক বাঘা প্রার্থী, জামায়াতের বিপুল সাংগঠনিক শক্তি এবং এনসিপির বাঁধভাঙা জোয়ারের বিপরীতেই নিজের একটা স্বাতন্ত্র্য অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হন। কাজেই তিনি যতটুকু এগিয়েছিলেন, তা রাজনীতির মাঠে হা-ডু-ডু খেলেই এগিয়েছিলেন, নুর-রাশেদদের মতো দাঁড়িয়াবান্ধা খেলে সম্মুখে অগ্রসর হননি।
শেখ হাসিনার স্পিরিচুয়াল সন্তান নুর আর রাশেদ এখন ফ্যাসিবাদের আইকনকে প্রতিষ্ঠা করার কাজে লেগে গেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের নামকরণে ফ্যাসিবাদের আইকনকে সরিয়ে শহীদ হাদির নামকরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
একইভাবে শহীদ হাদিকে কবি নজরুলের পাশে সমাহিত করা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। কবি নজরুলের পাশে আরো কয়েকটি কবর আছে। এগুলো নিয়ে নুরদের মনে প্রশ্ন জাগে না।
আরেকটা বিভ্রান্তিকর প্রশ্ন ছড়িয়ে এই আধিপত্যবাদের দোসররা জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।
সাহিত্যের পাতা কিংবা কবিতার লাইন গণনা করে, কিংবা রাজনৈতিক ময়দানে হাজিরা গণনা করে জাতীয় বীরদের কৃতিত্ব ও দেশপ্রেম মাপা হয় না। শহীদ আবরার, শহীদ আবু সাঈদ, শহীদ ওয়াসিম, শহীদ হাদিরা নিজেদের আত্মত্যাগের মাধ্যমেই নিজেদের সর্বোচ্চ দেশপ্রেমের আখ্যানটি লিখে গেছেন।
তিউনিসিয়ার যুবকটি নিজের গায়ে আগুন লাগিয়ে আরব বসন্ত বিপ্লবের সূচনা করে শুধু নিজের দেশে নয়, সমগ্র আরব দুনিয়ার ইতিহাসে নাম লিখিয়েছেন। সেখানে কেউ প্রশ্ন করেন না, জাতির জন্য তিনি আর কী কী কাজ করে গেছেন? আমাদের এই শহীদেরা তাদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই দেশপ্রেমের সর্বোচ্চ নমুনা স্থাপন করে গেছেন।
গুলির সামনে দুই হাত উঁচু করে শহীদ আবু সাঈদ বিশ্বের মুক্তিকামী জনতার জন্য যে আইকনিক ছবি উপহার দিয়ে গেছেন, তা পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছবি। তাছাড়া জাতির আকাশে ধূমকেতুর মতো উদয় হওয়া শহীদ হাদির বক্তৃতা-বিবৃতি আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে জাতির মুক্তিসনদ হিসেবে যুগের পর যুগ প্রেরণা জুগিয়ে যাবে। কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার কবিতায় যে ধূমকেতুর কথা বলে গেছেন, সেই ধূমকেতুই হাদি, সেই ধূমকেতুই আবরার, সেই ধূমকেতুই আবু সাঈদ, …।
ক্ষমতার বদহজম কেন সৃষ্টি হয়
অনেক বিশ্লেষক ও সমাজচিন্তাবিদ ইদানীংকার কয়েকটি স্যাম্পল দেখে এই বদহজমের কারণ নির্ণয়ের চেষ্টা শুরু করেছেন।
‘রাজনীতি’ শব্দটির সমাস ও বিভক্তি নির্ণয় করতে গেলে পাওয়া যায়—রাজার নীতি অথবা নীতির রাজা। একসময় রাজনীতি ছিল রাজা, জমিদার, অভিজাত পরিবার ও বনেদি বংশের সন্তানদের প্রধান বিচরণক্ষেত্র। রাষ্ট্র পরিচালনা, জমিদারি রক্ষা, প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার এবং সমাজের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিকাশ ঘটত।
ব্রিটিশ আমলে উপমহাদেশের রাজনীতিতে জমিদার, তালুকদার, নবাব ও অভিজাত পরিবারের সদস্যদের উল্লেখযোগ্য প্রভাব ছিল। তাদের অনেকেই শিক্ষিত ছিলেন, অর্থসম্পদের মালিক ছিলেন এবং জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডেও ভূমিকা রাখতেন। কেউ কেউ ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনেও অংশ নিয়েছেন। তবে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও উদ্দেশ্য সবার ক্ষেত্রে এক ছিল না।
পাকিস্তান আমলেও জমিদার, ভূস্বামী, ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী পরিবারের সদস্যদের রাজনৈতিক আধিপত্য বহুলাংশে বজায় ছিল। তবে এর পাশাপাশি ছাত্রনেতা, শ্রমিকনেতা, শিক্ষক, আইনজীবী এবং সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা বহু রাজনৈতিক কর্মীও নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হন।
সে সময় রাজনীতি করতে গিয়ে অনেক বিত্তশালী পরিবারের সন্তানকে ব্যক্তিগত সম্পদ, ব্যবসা কিংবা পারিবারিক স্বার্থের ক্ষতি স্বীকার করতে হয়েছে। তাদের কাছে রাজনীতি সবসময় সম্পদ অর্জনের মাধ্যম ছিল না; বরং অনেকের জন্য তা ছিল আদর্শ, আত্মত্যাগ ও জনসেবার পথ।
রাজনীতিতে সাধারণ মানুষের উত্থান : গণতন্ত্রের সাফল্য, নাকি নতুন লুটেরা শ্রেণির জন্ম
গণতন্ত্রের অন্যতম বড় অর্জন হলো, রাজনীতি আর রাজা-জমিদার কিংবা অভিজাত পরিবারের একচেটিয়া অধিকার নয়। একজন কৃষকের সন্তান, শ্রমিকের সন্তান, শিক্ষক, কর্মচারী কিংবা সাধারণ পরিবারের একজন তরুণও জনগণের সমর্থনে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে পারেন।
এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু সেই সৌন্দর্যকে আমরা কতটুকু ধারণ বা উপভোগ করতে পারছি, সেই প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, রাজনীতিকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া এবং রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়নের হাতেখড়িটিও এখান থেকেই হয়েছে। দেওয়ানি আদালতের সেরেস্তাদারের ছেলে সংসদে গিয়েই চেয়ার ও শংকর মাছের চাবুক দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেললেন সংসদের স্পিকারকে।
সমস্যা দেখা দেয় তখন, যখন সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা কেউ জনগণের প্রতিনিধি হওয়ার পর জনগণের সেবক না থেকে নিজেই নতুন অভিজাত শ্রেণির সদস্য হয়ে ওঠেন।
নির্বাচনের আগে তাদের আর্থিক অবস্থা থাকে সাধারণ; কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার কয়েক বছরের মধ্যে তারা বিপুল সম্পদের মালিক বনে যান। কারো কারো হাঁটাচলায় সমীহ বা বিনয়ের পরিবর্তে নতুন ভাব চলে আসে—অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সঞ্চালনায় নতুন ছন্দ বা ঢেউ সৃষ্টি হয়। মুদি দোকানদার বনে যান বিশিষ্ট শিল্পপতি, নিরীহ পরিবারটি হয়ে পড়ে এলাকার জমিদার পরিবার।
স্বাধীনতার পর থেকেই শুরু হওয়া এই প্রবণতায় প্রথম ব্রেক কষেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তিনি ঘোষণা করেন, আমি এ ধরনের রাজনীতিবিদদের জন্য রাজনীতি করা কঠিন করে তুলব। এই কঠোরতা প্রথমেই প্রয়োগ করলেন নিজের ও পরিবারের ওপর। একই উচ্চশিক্ষিত বাবা-মা থেকে জন্ম নেওয়া নিজের ভাইদের দক্ষতা ও যোগ্যতা কোনো অংশেই কম ছিল না। কিন্তু তাদের ক্ষমতার ত্রিসীমানায় ঢুকতে দেননি। প্রেসিডেন্টের ভাইদের নামও কেউ জানতেন না।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমান বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। এর আগে ১ মে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট গঠনের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মতাদর্শের নেতাদের একত্র করেন। ভালো করে লক্ষ করুন, কারা কারা এসেছিলেন নতুন সেই দলটিতে।
এই উদ্যোগে জাগদল, ন্যাপ (ভাসানী), মুসলিম লীগ, ইউনাইটেড পিপলস পার্টি, বাংলাদেশ লেবার পার্টি ও তফসিলি জাতি ফেডারেশনের বিভিন্ন নেতা ও অংশ যুক্ত হন। তাদের মধ্যে ছিলেন বিচারপতি আবদুস সাত্তার (জাগদল), মশিউর রহমান যাদু মিয়া (ন্যাপ), শাহ আজিজুর রহমান (মুসলিম লীগ), কাজী জাফর আহমেদ (ইউনাইটেড পিপলস পার্টি), মাওলানা আব্দুল মতিন (বাংলাদেশ লেবার পার্টি), রসরাজ মণ্ডল (বাংলাদেশ তফসিলি জাতি ফেডারেশন)।
তখনকার রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের বাইরে একমাত্র মুসলিম লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিলেন। ফলে শাহ আজিজুর রহমানের নেতৃত্বে বলতে গেলে মুসলিম লীগের ৯৮ শতাংশ নেতা ও কর্মী নতুন দলটিতে যোগ দেন এবং গ্রাসরুট লেভেলে দলটিকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে সহায়তা করেন। ১৯৭১-এর পর চেতনার বন্যায় সামাজিক নেতৃত্বকাঠামোয় যে ওলট-পালট করা হয়েছিল, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে তা আবার কিছুটা ভারসাম্যে ফিরে আসে। অনেক বনেদি ঘরের সন্তান, যারা ১৯৭১ সালে রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন, তারা আবার নানা স্তরের নেতৃত্বকাঠামোয় জায়গা পান। ব্রাহ্মণ্যবাদী ও আধিপত্যবাদী গোষ্ঠী এবং তাদের দোসররা এ কারণেই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ওপর এত খ্যাপা। এ কারণেই মৃত্যুর চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর পরও জিয়ার কবর গুঁড়িয়ে দিতে চায়। নজরুলের পাশে হাদির কবরও একই কারণে এদের চক্ষুশূলের কারণ হয়েছে। আওয়ামী লীগ যদি আবার কোনো কারণে ফিরতে পারে, তবে প্রথমেই এরা এই তিনটি (খালেদা জিয়ারটিসহ) কবর গুঁড়িয়ে দেবে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যেমন ব্যক্তির আদি খাসলত, চরিত্র ও যোগ্যতা দেখে নেতৃত্বকাঠামো সাজাতে চেয়েছিলেন, তেমনি খালেদা জিয়াও সতর্ক করে গেছেনÑতোমরা বস্তির পোলাপান দিয়ে দল ভরিও না। আধুনিক বিজ্ঞানও ডিএনএর এই প্রভাবকে স্বীকার করে।
কবি নজরুল বলেছেন, মুয়াজ্জিন যে কেউ হতে পারে, তবে ইমাম হন আল্লাহর ইচ্ছায়। হাবশী যুবক বেলাল ইসলামের সম্মানজনক মুয়াজ্জিন পদে অধিষ্ঠিত হতে পারলেও খলিফা মনোনীত হয়েছিলেন আরবের সম্ভ্রান্ত বংশের আবু বকর, ওমর, ওসমান এবং আলী। স্কুলজীবনে কবি নজরুলের এই বাক্যটি নিয়ে ব্যাখ্যা লিখতে হতো। তখন এই বাক্যটির মর্মার্থ ভালো করে বুঝতে পারিনি।
ক্ষমতার দরজা সাধারণ মানুষের জন্য খুলেছে ঠিকই, কিন্তু ক্ষমতার চরিত্র খুব একটা বদলায়নি। যোগ্যতা আছে, কিন্তু চরিত্র নেই—এমন ব্যক্তি দক্ষতার সঙ্গে অন্যায় করতে পারেন। চরিত্র ভালো, কিন্তু প্রয়োজনীয় যোগ্যতা নেই—এমন ব্যক্তি সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও গুরুতর ভুল করতে পারেন। আর পদ আছে, কিন্তু যোগ্যতা ও চরিত্র দুটিই অনুপস্থিত—এমন নেতৃত্ব দেশ ও সমাজকে ধ্বংসের কিনারায় টেনে নিতে পারে।
লেখক: কলামিস্ট