যেকোনো আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান অলংকার হলো তার নাগরিকদের বাকস্বাধীনতা বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। তবে, অলংকার তো আর যত্রতত্র পড়ে থাকার জিনিস নয়; এটিকে সযত্নে, রাষ্ট্রীয় সিন্দুকে তুলে রাখতে হয়। ঠিক একইভাবে, ডিজিটাল যুগে বাংলাদেশে সরকারকে সমালোচনা করার জন্য অপূর্ব, সুসংগঠিত এবং জটিল আইনি ও কাঠামোগত গোলকধাঁধা তৈরি করা হয়েছে। এই “সরকারি ম্যানুয়াল” এতই নিখুঁত যে, একজন সাধারণ নাগরিক চাইলেই হুট করে সরকারের কোনো নীতির সমালোচনা করে ফেলতে পারবেন না। এর জন্য তাকে সংবিধানের গোলকধাঁধা, ডিজিটাল নিরাপত্তা বা সাইবার আইনের বেড়াজাল, ঔপনিবেশিক আমলের গুপ্তচরবৃত্তির আইন এবং সবশেষে স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপের এক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।
যেকোনো নাগরিকের মনে হতেই পারে যে, স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে তার যা খুশি বলার অধিকার রয়েছে। এমন ধারণার পেছনে ইন্ধন জোগায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ। এই অনুচ্ছেদের ৩৯ (১) উপধারায় চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে এবং ৩৯ (২) উপধারায় প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। এটি পড়ে যে কেউ আনন্দে উদ্বেলিত হতে পারেন। কিন্তু সংবিধান প্রণেতারা অত্যন্ত দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে এই স্বাধীনতার সঙ্গে একটি জাদুকরী শব্দবন্ধ যুক্ত করে দিয়েছেন, যা হলো “যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ” বা “Reasonable Restrictions”।
সংবিধানের ৩৯ (২) অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই বাকস্বাধীনতা নিরঙ্কুশ নয়। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে, কিংবা আদালত অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা দেয়ার ক্ষেত্রে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ সাপেক্ষে এই স্বাধীনতা উপভোগ করা যাবে। এই “যুক্তিসঙ্গত” শব্দটি মূলত একটি রাবার-ব্যান্ডের মতো, যাকে রাষ্ট্র তার প্রয়োজনমতো টেনে যতদূর ইচ্ছা প্রসারিত করতে পারে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তি যেমন ‘ইন্টারন্যাশনাল কোভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস’ (ওঈঈচজ)-এর ১৯ (৩) অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষেত্রে একটি তিন-স্তরের পরীক্ষা বা ‘থ্রি-পার্ট টেস্ট’-এর কথা বলা হয়েছে। এই মানদণ্ড অনুযায়ী, বিধিনিষেধকে অবশ্যই আইনি কাঠামোর অধীনে হতে হবে, এর একটি বৈধ উদ্দেশ্য থাকতে হবে এবং সেই উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য এটি অপরিহার্য ও আনুপাতিক হতে হবে। কিন্তু দেশীয় প্রেক্ষাপটে এই বিধিনিষেধের প্রয়োগ এতটাই বিস্তৃত যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো সরকারি প্রকল্পের সমালোচনা করা বা ভাঙা রাস্তার ছবি পোস্ট করাকেও রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা বা ‘বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক’ বিনষ্ট করার শামিল হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে। ফলে, সংবিধান একদিকে নাগরিককে কথা বলার অধিকার দেয়, অন্যদিকে সেই অধিকার প্রয়োগের পরিণতি সম্পর্কেও প্রচ্ছন্ন সতর্কতা জারি করে।
সমালোচনার নিয়মকানুনগুলোকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার ক্ষেত্রে ২০০৬ সালের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইন একটি প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করেছিল। বিশেষ করে এই আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারাটি ছিল সমালোচকদের জন্য এক অমোঘ অস্ত্র। এই ধারায় কোনো মিথ্যা, অশ্লীল বা মানহানিকর তথ্য প্রকাশকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হতো এবং এটি সাংবাদিক ও ভিন্নমত পোষণকারীদের বিরুদ্ধে যথেচ্ছভাবে ব্যবহৃত হতো। যখন ৫৭ ধারা নিয়ে দেশ জুড়ে প্রবল সমালোচনা শুরু হলো, তখন রাষ্ট্র অত্যন্ত সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়ে ২০১৮ সালে প্রণয়ন করলো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (Digital Security Act ev DSA)।
ডিএসএ আইনটি মূলত আইসিটি আইনের ৫৭ ধারার এক বর্ধিত, আধুনিক এবং আরও শক্তিশালী সংস্করণ হিসেবে আবির্ভূত হয়। ডিএসএ ওই বিতর্কিত ধারাটিকে বিলুপ্ত না করে বরং এর আত্মাকে ২১, ২৫, ২৮, ২৯ এবং ৩১ ধারার মধ্যে অত্যন্ত সুচারুভাবে ছড়িয়ে দেয়। এই আইনের সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক দিকটি ছিল এর সংজ্ঞাগত অস্পষ্টতা, যা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে সীমাহীন ক্ষমতা প্রদান করে।
উদাহরণস্বরূপ, আইনের ২১ ধারায় মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় সংগীত বা পতাকার বিরুদ্ধে ‘প্রোপাগান্ডা’ চালানোকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। কিন্তু ‘প্রোপাগান্ডা’ শব্দের কোনো সুনির্দিষ্ট বা আইনি সংজ্ঞা না থাকায়, ঐতিহাসিক যেকোনো গঠনমূলক বিশ্লেষণ বা ভিন্নমতকে সহজেই রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে আখ্যায়িত করার এক চমৎকার সুযোগ তৈরি হয়। একইভাবে, ২৫ ধারায় ‘মিথ্যা’, ‘আক্রমণাত্মক’ বা ‘ভীতিপ্রদর্শক’ তথ্য প্রচার করে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করাকে অপরাধ বলা হয়েছে। বাস্তবে এর প্রায়োগিক অর্থ হলো, সরকারের যেকোনো নীতি বা দুর্নীতির খবর প্রকাশ করা, যা সরকারের জন্য অস্বস্তিকর, তাকেই ‘মিথ্যা’ বা ‘আক্রমণাত্মক’ বলে সাব্যস্ত করা যেতে পারে। এটি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হওয়া একটি ধারা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত হানার বিষয়টি আনা হয়েছে ২৮ ধারায়। ফলে যেকোনো যৌক্তিক বা বৈজ্ঞানিক আলোচনা যা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর কাছে স্পর্শকাতর মনে হতে পারে, তার জন্য নাগরিককে জামিন-অযোগ্য ধারায় গ্রেপ্তার করার পথ সুগম হয়। অন্যদিকে, ২৯ ধারাটি হলো ঔপনিবেশিক দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারার এক আধুনিক ডিজিটাল সংস্করণ, যেখানে ডিজিটাল মাধ্যমে মানহানিকর তথ্য প্রকাশ করা মাত্রই তাকে অপরাধ ধরা হয়। অর্থাৎ, সমালোচনা মানেই মানহানি-এই অলিখিত সমীকরণটি প্রতিষ্ঠিত হয়। আর ৩১ ধারায় বলা হয়েছে, সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি বা জনশৃঙ্খলা বিনষ্ট করে এমন কিছু প্রচার করা অপরাধ। বাস্তবে, যেকোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক আন্দোলনকে জনশৃঙ্খলা বিরোধী আখ্যা দিয়ে আন্দোলনকারীদের দমন করতে এই ধারাটি ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এই ধারাটি প্রায়শই ২৫ এবং ২৯ ধারার সঙ্গে যুক্ত করে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হয়েছে, যা মূলত জনশৃঙ্খলার দোহাই দিয়ে ব্যক্তিগত সমালোচনাকে স্তব্ধ করার কৌশল।
এই আইনের প্রয়োগ কতো গভীরে পৌঁছেছিল, তার প্রমাণ হলো ২০২০ সালে এক ১৫ বছরের কিশোরকে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ‘মানহানিকর’ ফেসবুক পোস্ট দেয়ার জন্য গ্রেপ্তার করে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো। রাষ্ট্র চেয়েছিল সেখানে তার “চরিত্র সংশোধন” হোক। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭ বছর বয়সী এক ছাত্রীকে ওয়েবিনারে মতপ্রকাশের জন্য এবং দিনাজপুরের আরেক দশম শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়।
দেশি ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ডিএসএ-এর বিরুদ্ধে প্রবল সমালোচনার মুখে সরকার ২০২৩ সালে এই আইনটি বাতিল করে সাইবার নিরাপত্তা আইন ( Cyber Security Act ev CSA) প্রণয়ন করে। তবে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল একে “একই আইন, নতুন নাম” বা “Take the D out of DSA and add a C” হিসেবে আখ্যায়িত করে। সিএসএ-তে ডিএসএ-এর দমনমূলক ধারাগুলো প্রায় অবিকৃত রেখেই কেবল কিছু ক্ষেত্রে সাজার মেয়াদ সামান্য কমানো হয় এবং কিছু জামিন-অযোগ্য ধারাকে জামিনযোগ্য করা হয়।
গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ২০২৬ সালের প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা (সংশোধন) আইনে এই নিয়মাবলিকে আরও এক ধাপ উপরে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন সংশোধনীতে ‘গুজব’ (Rumour) এবং ‘ভুল তথ্য’ (isinformation) ছড়ানোর দায়ে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ৪০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। ‘গুজব’-এর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, এমন কোনো অসমর্থিত বা যাচাই না করা তথ্য যা জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক বা অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ, সরকারের কোনো পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তোলা বা সংশয় প্রকাশ করা এখন সরাসরি ১০ বছরের কারাদণ্ডের টিকিট হতে পারে। একইসঙ্গে, মানহানির সাজা বাড়িয়ে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর এবং ২০ লাখ টাকা জরিমানা করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা নারী বা শিশুদের ক্ষেত্রে দ্বিগুণ হবে। এ ছাড়া প্রস্তাবিত সংশোধনীতে মোবাইল কোর্টকে সাইবার হয়রানি, মানহানি বা অপপ্রচার সংক্রান্ত বিচার করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, যা বিচারিক প্রক্রিয়ার অপব্যবহারের শঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
সরকারকে সমালোচনা করার পরিণাম যে কতোটা ভয়াবহ হতে পারে, তার একটি সুস্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায় সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) এবং অন্যান্য গবেষণা সংস্থার পরিসংখ্যানে। এই পরিসংখ্যানগুলো প্রমাণ করে যে, ডিজিটাল আইনগুলো মূলত সাইবার অপরাধ দমনের চেয়ে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে। তৎকালীন আইনমন্ত্রীর দেয়া তথ্যমতে, ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত সারা দেশে ডিএসএ-এর অধীনে মোট ৭,০০১টি মামলা করা হয়েছে। সিজিএস-এর নিজস্ব গবেষণায় দেখা যায়, অক্টোবর ২০১৮ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৩ পর্যন্ত ১,৪৩৬টি মামলায় অন্তত ৪,৫২০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
এই বিপুল সংখ্যক মামলার লক্ষ্যবস্তু কারা ছিলেন, তা বিশ্লেষণ করলে চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে আসে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে প্রায় ২০.৪% ছিলেন সাংবাদিক এবং ২২.৯% ছিলেন রাজনৈতিক নেতাকর্মী। পরবর্তী সময়ে এই হার আরও বেড়ে যায়, যেখানে দেখা যায় যে ডিএসএ-এর শিকার হওয়া ব্যক্তিদের এক-তৃতীয়াংশ সাংবাদিক এবং আরেক-তৃতীয়াংশ রাজনীতিবিদ। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, অধিকাংশ মামলাই ভুক্তভোগীরা নিজেরা করেননি। সিজিএস-এর মতে, প্রায় ৭৮% মামলা করেছেন ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা। এর মানে দাঁড়ায়, কোনো রাজনৈতিক নেতার সমালোচনা করলে সেই নেতা নিজে মামলা না করলেও তার একনিষ্ঠ কর্মীরা শত শত মামলা করে সমালোচককে স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন।
আরেকটি বিভীষিকাময় সত্য হলো বিচারিক পরিণতি। সিজিএস-এর জরিপে দেখা যায়, দায়েরকৃত মামলাগুলোর মধ্যে মাত্র ২% মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তির দিকে গড়িয়েছে বা আদালতে প্রমাণিত হয়েছে। বাকি ৯৮% মামলার ক্ষেত্রে কোনো বিচার হয়নি। এর সহজ অর্থ হলো, এই আইনে আইনি প্রক্রিয়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে এক ধরনের শাস্তি (The process itself is the punishment)।
ক্লোনি ফাউন্ডেশন ফর জাস্টিস (CFJ) এবং সিজিএস-এর যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, ৩৯৬ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া ২২২টি মামলার বিশ্লেষণে এটি স্পষ্ট যে, ডিএসএ সাংবাদিকদের ভয় দেখানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত সাংবাদিকদের মধ্যে ৯০ শতাংশকেই বিচার-পূর্ববর্তী সময়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক সাংবাদিককে গভীর রাতে বা খুব ভোরে সাদা পোশাকের বিশাল পুলিশ বাহিনী (কখনো কখনো ৩০-৪০ জন) দিয়ে এমনভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে যেন তারা শীর্ষস্থানীয় কোনো সন্ত্রাসী। গ্রেপ্তারের সময় তাদের আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেয়া হয়নি এবং পরিবারের সদস্যদেরও অন্ধকারে রাখা হয়েছে।
সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজল ৫৩ দিন গুম থাকার পর তাকে এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনেই গ্রেপ্তার দেখানো হয় এবং তিনি দীর্ঘ ৭ মাস কারাভোগ করেন। কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর এবং লেখক মুশতাক আহমেদকে ২০২০ সালের মে মাসে গ্রেপ্তার করা হয়। মুশতাক আহমেদ দীর্ঘ ১০ মাস কারাবন্দি থাকার পর ২০২১ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি কারাগারেই মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, আইনি কাঠামোর ভেতরে সমালোচনা করার অধিকার কেবল তাত্ত্বিক, বাস্তবে এটি একটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ কাজ।
সমালোচকদের নজরদারিতে রাখার জন্য রাষ্ট্র যে কতোটা যত্নশীল, তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার বা এনটিএমসি (NTMC)। ২০১৩ সালের ৩১শে জুলাই প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থাটির মূল উদ্দেশ্য ছিল সাইবার অপরাধ দমন এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে সহায়তা করা। কিন্তু বাস্তবে এটি পরিণত হয়েছে নাগরিকদের ব্যক্তিগত আলাপচারিতা, ফোনকল এবং ইন্টারনেট মেসেজিং অ্যাপগুলোর (যেমন- ফেসবুক, টুইটার, টেলিগ্রাম, ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপ, স্কাইপ) ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানোর এক ‘অদৃশ্য অভিভাবক’-এ।
রাষ্ট্রীয় কোষাগারের বিশাল অংকের অর্থ ব্যয় করে এই সংস্থার জন্য ইসরাইলি সাইবার ইন্টেলিজেন্স কোম্পানি এনএসও গ্রুপের তৈরি ‘পেগাসাস’ (Pegasus) স্পাইওয়্যার থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক ভেহিকল-মাউন্টেড ডেটা ইন্টারসেপ্টর কেনা হয়েছে। পেগাসাস স্পাইওয়্যারের জাদুকরী ক্ষমতা হলো, এটি একবার কোনো নাগরিকের ফোনে প্রবেশ করতে পারলে, সেই ফোনের মেসেজ, ছবি, ই-মেইল এমনকি মাইক্রোফোন ও ক্যামেরাও গোপনে চালু করে সব তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। এর মাধ্যমে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো খুব সহজেই ‘সরকার-বিরোধী’ পোস্ট, অ্যাকাউন্ট এবং ব্যবহারকারীর সুনির্দিষ্ট অবস্থান শনাক্ত করতে পারে।
অর্থাৎ, কোনো নাগরিক যদি ড্রয়িংরুমে বসেও ফিসফিস করে সরকারের সমালোচনা করেন, রাষ্ট্রযন্ত্র তার সেই ফিসফিসানি শোনার জন্য বিলিয়ন টাকা খরচ করতে প্রস্তুত। ২০১৮ সালে মোবাইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরদারি বাড়াতে সরকার এই সংস্থাকে প্রায় ২৩.৬ বিলিয়ন টাকার সরঞ্জাম কেনার অনুমোদন দেয়। নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের ক্ষেত্রেও এই সংস্থার দুর্বলতা সামনে এসেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এনটিএমসি থেকে নাগরিকদের কল ডেটা রেকর্ড (CDR) এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য চুরির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, যা প্রমাণ করে যে নজরদারির নামে সংগৃহীত বিপুল তথ্যের নিরাপত্তাও রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে ব্যর্থ।
যদিও ২০২৫ সালের প্রস্তাবিত টেলিকমিউনিকেশন অধ্যাদেশে এনটিএমসি বিলুপ্ত করার এবং ইন্টারনেট শাটডাউন নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু ২০২৬ সালেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই নজরদারি সংস্থার কার্যক্রম আরও এক বছর চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রস্তাবিত আইনে বলা হয়েছে যে, কোনো বিচারিক আদেশ ছাড়াই ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ বা ‘জরুরি অবস্থার’ অজুহাতে ফোন কল বা ইন্টারনেট মেসেজ ইন্টারসেপ্ট করা যাবে। ফলে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর এই অদৃশ্য নজরদারির খড়গ এখনো পুরোপুরি বহাল তবিয়তে বিরাজমান।
সরকারকে সমালোচনার বা দুর্নীতির তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে আধুনিক ডিজিটাল আইনের পাশাপাশি কিছু ‘অ্যান্টিক’ বা প্রাচীন আইনও সযত্নে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো বৃটিশ ঔপনিবেশিক আমলে প্রণীত ১৯২৩ সালের অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট (ঙভভরপরধষ ঝবপৎবঃং অপঃ ১৯২৩)। ১৯২৩ সালে বৃটিশরা এই আইনটি তৈরি করেছিল মূলত রাষ্ট্রবিরোধী গুপ্তচরবৃত্তি ঠেকানোর জন্য, যাতে কোনো গোপন সামরিক বা রাষ্ট্রীয় তথ্য শত্রুপক্ষের হাতে না যায় এবং ঔপনিবেশিক শাসন নিষ্কণ্টক থাকে। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে এই আইনটি ব্যবহার করা হয় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে, যারা হয়তো সাধারণ কোনো বেসামরিক মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতির খবর প্রকাশ করতে গেছেন।
এর সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর উদাহরণ হলো ২০২১ সালের মে মাসে দৈনিক প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের গ্রেপ্তার। কোভিড-১৯ মহামারির সময় স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ করে তিনি যখন দেশ জুড়ে পরিচিতি পান, তখন তাকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ভেতরে প্রায় ৫ ঘণ্টা আটকে রেখে হেনস্তা করা হয় এবং পরবর্তীতে এই ১৯২৩ সালের অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের ৩ ও ৫ ধারায় এবং দণ্ডবিধির ৩৭৯ ও ৪১১ ধারায় (চুরি ও চোরাই মাল রাখার অপরাধ) মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতো একটি বেসামরিক দপ্তরে, যেখানে টিকার চুক্তির মতো জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে কাজ হয়, সেখানে একটি ঔপনিবেশিক আমলের সামরিক গুপ্তচরবৃত্তির আইন প্রয়োগ করা একটি নিখুঁত রম্য নাটকের চিত্রনাট্য হতে পারে, যদি না এর পরিণতি এত মর্মান্তিক হতো। সংবিধানে যখন তথ্য অধিকার আইন (Right to Information Act) এবং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ (সুরক্ষা) আইন বা হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা আইন রয়েছে, তখন অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের মতো একটি পুরনো হাতিয়ার দিয়ে সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র সমালোচনা সহ্য না করার ব্যাপারে কতোটা সৃজনশীল। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই আইনের ৩ ও ৫ ধারা সরাসরি সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদের পরিপন্থি।
উপরোক্ত আইন, নজরদারি এবং মামলার ভয়ভীতির সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো ‘স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপ’ বা সেলফ-সেন্সরশিপের ব্যাপক প্রসার। রাষ্ট্রকে আর কষ্ট করে সব সময় সবার মুখ চেপে ধরতে হয় না; নাগরিকরা, বিশেষ করে সাংবাদিক, লেখক ও বুদ্ধিজীবীরা, এখন নিজেরাই নিজেদের মুখ বেঁধে রাখতে শিখে গেছেন। একে এক ধরনের ‘ডিআইওয়াই’ (DIY- Do It Yourself) সেন্সরশিপ বা স্বপ্রণোদিত দেশপ্রেম হিসেবেও আখ্যায়িত করা যেতে পারে।
সাংবাদিকরা এখন যেকোনো সংবাদ লেখার আগে বারবার চিন্তা করেন যে, তাদের ব্যবহৃত কোনো শব্দ ডিএসএ বা সিএসএ-এর ২৫, ২৮ বা ৩১ ধারায় পড়ে যায় কি না। অসলো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় উঠে এসেছে যে, সাংবাদিকরা নিজেদের চাকরি বাঁচাতে এবং পুলিশি হয়রানি বা গুমের হাত থেকে রক্ষা পেতে ‘ডিফেন্সিভ জার্নালিজম’ বা রক্ষণাত্মক সাংবাদিকতার চর্চা করছেন। সাংবাদিকরা এমনভাবে সংবাদ পরিবেশন করেন যাতে সরকারের কোনো প্রভাবশালী মহলের বিরাগভাজন হতে না হয়। এই ভীতির সংস্কৃতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মানুষ এখন সাধারণ আড্ডায় রাজনৈতিক আলোচনা করার আগে চারপাশে তাকিয়ে দেখে নেয়, বা গুরুত্বপূর্ণ আলাপের সময় মোবাইল ফোন দূরে সরিয়ে রাখে পাছে এনটিএমসি তাদের কথা রেকর্ড করে ফেলে।
বাঙালি সংস্কৃতিতে সমালোচনা এবং ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের একটি সুদীর্ঘ ও গৌরবময় ইতিহাস রয়েছে। ঔপনিবেশিক আমল থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত সাহিত্যে ও শিল্পকলায় অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও প্রখরভাবে রাষ্ট্র ও সমাজের সমালোচনা করা হতো। ১৯২০ ও ৩০-এর দশকে ‘শনিবারের চিঠি’ নামক সাহিত্য পত্রিকাটি বাঙালি সাহিত্য ও রাজনীতিতে এক ধরনের তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ ও সমালোচনার সংস্কৃতি চালু করেছিল, যা তৎকালীন রেনেসাঁস এবং রাজনৈতিক বিভাজনগুলোকে তীব্রভাবে কটাক্ষ করতো।
একইভাবে, আবুল মনসুর আহমদের নাম বাংলা সাহিত্যে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্যাটায়ারের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত। তার কালজয়ী রম্য রচনা সংকলন ‘আয়না’ (১৯৩৬-১৯৩৭) এবং ‘ফুড কনফারেন্স’ (১৯৪৪) তৎকালীন সমাজ, ধর্মীয় ভণ্ডামি এবং রাজনৈতিক নেতাদের কপটতাকে যেভাবে ব্যঙ্গের চাদরে মুড়িয়ে উপস্থাপন করেছিল, তা আজও প্রাসঙ্গিক। ঔপনিবেশিক আমলে বসে তিনি যেই সাহসের সঙ্গে সমাজের বাস্তবচিত্র তুলে ধরেছিলেন, বর্তমান স্বাধীন ও ডিজিটাল বাংলাদেশে সেই সাহস দেখানো রীতিমতো দুঃসাহস। ১৯৪৩ সালের মন্বন্তরের সময় চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্যের ‘হাংরি বেঙ্গল’ স্কেচগুলো বৃটিশ নীতির চরম সমালোচনা করেছিল, যা বৃটিশ সরকার নিষিদ্ধ করলেও তা মানুষের মধ্যে তীব্র প্রভাব ফেলেছিল। কিংবা আমাদের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন।
কিন্তু সময়ের পরিক্রমায়, বিশেষ করে গত দেড় দশকে, সংবাদপত্রের পাতা থেকে রাজনৈতিক কার্টুনের জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হতে থাকে। ডিএসএ-এর খড়গ এবং সেলফ-সেন্সরশিপের চাপে সংবাদপত্রগুলো প্রধানমন্ত্রীর বা প্রভাবশালী নেতাদের ব্যঙ্গচিত্র ছাপানো প্রায় বন্ধই করে দেয়।
এই সমস্ত কঠোর আইন, নজরদারি এবং সেলফ-সেন্সরশিপের সমন্বিত ফলাফল অত্যন্ত চমৎকারভাবে প্রতিফলিত হয়েছে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (Reporters Sans Frontb©res ev RSF) কর্তৃক প্রকাশিত বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে (World Press Freedom Index)। এই সূচকে বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে নিচের দিকে নামার ক্ষেত্রে অভাবনীয় ‘সাফল্য’ প্রদর্শন করেছে, যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কঙ্কালসার অবস্থাকে তুলে ধরে।
২০১৭ এবং ২০১৮ সালে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৬তম, যা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল হলেও সূচকের নিম্নার্ধেই ছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের পর থেকেই এই ধারাবাহিক পতনের শুরু হয়। ২০১৯ সালে এটি নেমে দাঁড়ায় ১৫০তম স্থানে। ২০২১ সালে কোভিড-১৯ মহামারির সময় সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন ও গ্রেপ্তারের প্রভাবে এটি আরও দুই ধাপ নেমে ১৫২তম স্থানে পৌঁছায়।
সবচেয়ে বড় পতন ঘটে ২০২২ সালে, যখন বাংলাদেশ এক লাফে ১০ ধাপ পিছিয়ে ১৬২তম স্থানে পতিত হয় এবং দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন অবস্থানে পৌঁছায়। ২০২৩ সালে এই পতন অব্যাহত থাকে এবং অবস্থান হয় ১৬৩তম, যেখানে আরএসএফ-এর মতে সাংবাদিকতায় ‘খুবই গুরুতর’ (very serious) অবস্থার দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০২৪ সালে নতুন সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট (ঈঝঅ) প্রবর্তনের পরও এই সূচকে আরও দুই ধাপ অবনতি ঘটে এবং বাংলাদেশ ১৬৫তম স্থানে নেমে যায়।
অবশ্য, ২০২৫ সালে জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে সাময়িকভাবে ১৬ধাপ উন্নতি হয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৯তম-তে পৌঁছায়। কিন্তু এই উন্নতির স্থায়িত্ব ছিল খুবই ক্ষণস্থায়ী। ২০২৬ সালের সূচকে পুনরায় তিন ধাপ পতন ঘটে এবং বাংলাদেশ ১৫২তম স্থানে নেমে যায়। আরএসএফ-এর প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাজনৈতিক প্রভাব, পুলিশি সহিংসতা এবং বিচারিক হয়রানির কারণে বাংলাদেশের সাংবাদিকদের জন্য এক ভীতিকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
সরকারের সমালোচনার নিয়ম-কানুনগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার সর্বশেষ সংযোজন হলো ২০২৬ সালের সাইবার নিরাপত্তা (সংশোধন) আইনের খসড়া। এই খসড়া নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) যে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, টিআইবি’র মতে, এই খসড়ায় সাইবার অপরাধ, সাইবার নিরাপত্তা এবং মতপ্রকাশের অধিকার-এই তিনটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়কে একই আইনের ছাতার নিচে আনা হয়েছে, যার ফলে আইনটির অপব্যবহারের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে।
খসড়া আইনের ৪৬(২) ধারায় ২৩ নম্বর ধারাটিকে জামিন-অযোগ্য হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে, যেখানে ‘বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক’ এবং ‘বিদেশি কোনো রাষ্ট্র বা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সুবিধার জন্য’ কাজ করার মতো অত্যন্ত অস্পষ্ট বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। টিআইবি আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, এই অস্পষ্টতার সুযোগে ক্ষমতাশালীরা সহজেই ভিন্নমত দমন করতে পারবে এবং এটি বাকবাধীনতার জন্য একটি সরাসরি হুমকি।
সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়টি হলো একটি ‘ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি কাউন্সিল’ গঠনের প্রস্তাব। ২৮ সদস্যবিশিষ্ট এই কাউন্সিলে প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারের বিভিন্ন আমলা ও প্রতিনিধিরা থাকবেন, কিন্তু বেসরকারি খাত থেকে তথ্যপ্রযুক্তি বা মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ থাকবেন মাত্র দু’জন। আরও মজার ব্যাপার হলো, এই দু’জন বিশেষজ্ঞও খোদ সরকার কর্তৃক মনোনীত হবেন। অর্থাৎ, নাগরিকদের সাইবার নিরাপত্তা এবং মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষার দায়িত্ব এমন একটি কাউন্সিলের হাতে ন্যস্ত হতে যাচ্ছে, যা পুরোপুরি সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতন ঘটে। হাজার হাজার মানুষের রক্ত এবং আত্মত্যাগের বিনিময়ে এই পরিবর্তন আসে, যার অন্যতম প্রধান দাবি ছিল মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার নিশ্চিত করা। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর অনেক মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা হয়, সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট বাতিলের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয় এবং সাইবার প্রটেকশন অর্ডিন্যান্স আনা হয়। কিন্তু আইনের মারপ্যাঁচ এতই জটিল যে, পুরনো মদ নতুন বোতলে ফিরে আসার একটি অলিখিত ঐতিহ্য আমাদের দেশে রয়েই গেছে।
আর্টিকেল ১৯, সিভিকাস এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও সাংবাদিক ও ভিন্নমত পোষণকারীদের ওপর আইনি হয়রানি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সরকারকে সমালোচনার সরকারি নিয়ম-কানুনগুলো অত্যন্ত সুপরিকল্পিত, নিশ্ছিদ্র এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এক অনন্য নজির। ঔপনিবেশিক আমলের ১৯২৩ সালের অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট থেকে শুরু করে একবিংশ শতাব্দীর অত্যাধুনিক ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৬ সালের সংশোধনী এবং পেগাসাসের মতো বিলিয়ন ডলারের নজরদারি প্রযুক্তির সমন্বয়ে এমন এক ইকোসিস্টেম তৈরি করা হয়েছে, যেখানে স্বাধীন মতপ্রকাশ এক ধরনের ‘এক্সট্রিম স্পোর্টস’ বা চরম ঝুঁকিপূর্ণ খেলায় পরিণত হয়েছে।
সরকার পরিবর্তন হলেও এই কাঠামোগত দমনপীড়নের চরিত্র খুব একটা বদলায় না; কেবল আইনের নাম আর ভুক্তভোগীদের পরিচয় বদলায়। কখনো সেটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, কখনো সাইবার নিরাপত্তা আইন, আবার কখনো সাইবার নিরাপত্তা সংশোধন আইন নামে আবিভূত হয়। অতএব, একজন আদর্শ ও সুবোধ নাগরিকের দায়িত্ব হলো, এই সমস্ত নিয়ম-কানুনগুলো মুখস্থ রাখা এবং সর্বদা হাসিমুখে মেনে চলা। কারণ, নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রে প্রশ্ন তোলার চেয়ে মাথা নেড়ে সম্মতি জানানোই হলো সবচেয়ে বড় দেশপ্রেম এবং নিরাপদ জীবনযাপনের একমাত্র চাবিকাঠি।
-আবু জুবায়ের
লেখক, কবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক